জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প-- ২৯৭/ভেতরে একটু জায়গা হবে, সামান্য একটু?/আরব (এশিয়া)/চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প-- ২৯৭

ভেতরে একটু জায়গা হবে, সামান্য একটু?

আরব (এশিয়া)

চিন্ময় দাশ


এক আরব বণিক তার উটটি নিয়ে মরুভূমির বুক চিরে হেঁটে যাচ্ছিল। উটটির পিঠে জল, খাবার এবং একটি তাবু চাপানো। মরুভূমির তাপমাত্রা সাধারণত দিনের বেলা খুব গরম এবং রাতে খুব ঠান্ডা থাকে। আরব দেশের মানুষেরা মরুভূমিতে সকাল এবং সন্ধ্যায় ভ্রমণ করে। তারা বিকেলে বিশ্রাম নেয়। কারণ, তখন বাতাস প্রচণ্ড গরম থাকে। এবং রাত নেমে এলে, খুব ঠান্ডা পড়ে যায়। তখনও তারা আবার বিশ্রাম নেয়। 

দূপুরে চমৎকার একটা ঘুমের পর, বণিক এবং তার উট আবার মরুভূমির বুক চিরে তাদের পথ চলা শুরু করেছে। সূর্যাস্ত এবং অন্ধকার নেমে আসার পরেও তারা তাদের হাঁটা চালিয়ে গেল।

যখন প্রায় মাঝরাত, চারপাশ খুব ঠান্ডা হতে শুরু করল। বণিক সেই ঠান্ডা সহ্য করতে পারছিল না। যাত্রা থামিয়ে, উটের পিঠ থেকে তাবু তৈরির লাঠি এবং কাপড় নামাল। তাঁবু খাটিয়ে ঘুমানোর জন্য তৈরি হয়েছে বণিক। যখনই চোখ দুটি বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই উটটি বাইরে থেকে ডেকে বলল, "মালিক, ও মালিক! বাইরে খুব ঠান্ডা বাড়ছে। আমি কি আমার নাকটা তাবুর ভেতরে একটু ঢোকাতে পারি? দয়া করুন আমাকে।" 

বণিক ছিল খুব দয়ালু মানুষ। সে বলল, "ওহ, হ্যাঁ। অবশ্যই পারো।" 

উট তার নাকটি তাবুর ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। আরব ঘুমাতে শুরু করল। খানিক নাদে উটটি আবার ডেকে বলল, "মালিক, আমি কি আমার ঘাড়টাও একটু ভেতরে আনতে পারি?" 

আরব বিড়বিড় করে বলল, "হ্যাঁ, হ্যাঁ।" 

আরও কিছুটা সময় পার হলো। উটটি নাক ডাকতে থাকা আরবের কাছে এগিয়ে এসে বলল, "মালিক, আমি আমার কুঁজটাও ভেতরে নিয়ে আসব। দয়া করে আমাকে সেই অনুমতি দিন।"

🍂

 বণিকের ততক্ষণে গভীর ঘুমে নাক ডাকছে। সে ঘুমের ঘোরেই বলল, "হুমম, হুমম।" 

উটটি হাসল এবং সানন্দে তার কুঁজটি তাবুর ভেতরে নিয়ে এল। আড়ে-বহরে তাঁবুটি ছিল ছোট। এখন উটের যেখানে গলা, তার কাছেই আরব ঘুমাচ্ছে। সে কারণে,  তাঁবুটা এখন বেশ ঠাসাঠাসি হয়ে গেল।

এক সময় ভোর হল। বণিকের ঘুম ভেঙে গেল ভয়াণক ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে। চোখ খুলেই আকাশের তারা দেখতে পেল মানুষটা। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখল, তাঁবুর একেবারে বাইরেই শুয়ে আছে সে। চিৎকার করে বলল, "আমি কি গত রাতে আমার তাবুর ভেতরে ঘুমাচ্ছিলাম না?" 

এবার তার চোখ পড়ল তাঁবুটির ওপর। তাঁবুর ভেতর মাথা গলিয়ে দেখল। সেখানে উটটিকে শান্তিতে ঘুমাতে দেখে, একেবারে হতবাক হয়ে গেল! উটের লেজটুকুই শুধু তাবুর বাইরে ছিল, বাকি পুরো শরীর তাঁবুর ভেতরে। আরামে ঘুমোচ্ছে সে!

বল্লম ছিল হাতে। খোঁচা মেরে উটটিকে জাগিয়ে তুলল বণিক। বলল, "তুমি এভাবেই আমার দয়াশীলতার প্রতিদান দিলে?"

উট তার সবকটি দাঁত বের করে, প্রথমে এক মস্ত বড় হাসি হেসে নিল। ধীরে সুস্থে জবাব দিল, "আমি যখনই আমার শরীরের কোনো অংশ তাবুর ভেতরে আনার কথা জিজ্ঞেস করেছি, আপনি প্রতিবারই 'হ্যাঁ' বলেছেন। কিছুক্ষণ পর, দেখলাম আপনি গভীরভাবে ঘুমাচ্ছেন। তাই, অকারণ প্রশ্ন করে আপনাকে আর বিরক্ত করতে চাইনি। আমি নিজেই আমার পেছনের অংশটুকু তাঁবুর ভেতরে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিই।" 

এ কথার কী জবাব দেবে বণিক? নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল, "এই কারণেই লোকে বলে যে, কারও প্রতি অতিরিক্ত দয়ালু হওয়া ঠিক নয়। যদি তা করি, তবে আমাদের যা কিছু আছে, আমরা সব হারাব। আজ আমি আমার শিক্ষা পেয়ে গেছি।"

যাত্রা শুরু করেছে আবার দুজনে। বণিক বলল, "মনে রেখো, আজ আবারও রাত নামবে। ঠাণ্ডা হবে মাঝরাতে। আজ আর হ্যাঁ বলব না তোমাকে। কেবল আজ নয়, ভবিষ্যতেও কোন দিন বলব না।“

এ কথার কী আর জবাব দেবে উট? নীরবে মোট বয়ে পথ চলতে লাগল।

Post a Comment

0 Comments