মইনুদ্দিন সরদার
কলমে কী লেখা হচ্ছে, তার চেয়ে আজকাল অনেকের কাছে বড় হয়ে উঠেছে—কে লিখছে? প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence, সংক্ষেপে AI, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে প্রবেশ করেছে। তথ্য খোঁজা, ভাষা সংশোধন, অনুবাদ, ছবি তৈরি, পড়াশোনায় সহায়তা—অনেক কাজই আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। লেখালেখির জগতও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি AI আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও এনে দিয়েছে—কোনো লেখা সুন্দর, পরিপাটি বা সাবলীল হলেই কি সেটিকে AI-এর লেখা বলে ধরে নেওয়া যায়?
AI নিঃসন্দেহে মানুষের কাজকে অনেক সহজ করেছে। একজন লেখক কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে পারেন, বানান বা ব্যাকরণ যাচাই করতে পারেন, একটি বাক্যের গঠন নিয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী কঠিন বিষয় সহজভাবে বুঝতে সাহায্য পেতে পারে। ভাষার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অনুবাদের মাধ্যমে এক ভাষার লেখা অন্য ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ AI-কে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি মানুষের বিকল্প না হয়ে মানুষের সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু সমস্যার শুরু হয় তখনই, যখন AI-এর উপস্থিতিকে ঘিরে তৈরি হয় অতিরিক্ত সন্দেহ। এখন কোনো লেখা একটু সুন্দর হলে, ভাষা একটু পরিণত হলে কিংবা ভাবনাটা একটু গোছানো হলেই কেউ কেউ বলে বসেন—“এটা নিশ্চয়ই AI দিয়ে লেখা।” যেন ভালো লেখা মানুষের হাতে আর জন্মাতেই পারে না। যেন একটি সুন্দর বাক্যের পেছনে লেখকের দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, অনুশীলন, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই।
🍂
এই ধারণার মধ্যে একটি বড় ভুল আছে। AI-এর সাহায্য নেওয়া এবং AI দিয়ে সম্পূর্ণ লেখা তৈরি করা এক কথা নয়। একজন লেখক নিজের ভাবনা, নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের বক্তব্য ও নিজের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে একটি লেখা তৈরি করে পরে বানান সংশোধন বা ভাষা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারেন। তাতে লেখাটির মূল অনুভব ও বক্তব্য তাঁর নিজেরই থাকে। আবার কেউ যদি নিজের কোনো চিন্তা বা সৃষ্টিশীল শ্রম ছাড়াই সম্পূর্ণ লেখা তৈরি করিয়ে নিজের নামে প্রকাশ করেন, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই দুই পরিস্থিতিকে এক করে দেখা ন্যায়সংগত নয়।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—শুধু লেখা পড়ে সবসময় নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সেটি AI দিয়ে লেখা হয়েছে কি না। মানুষের লেখার ভাষা সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়। একজন লেখক যত বেশি পড়েন, লেখেন, সংশোধন করেন, ততই তাঁর শব্দচয়ন ও বাক্যগঠন উন্নত হতে পারে। তাই কোনো লেখার ভাষা সুন্দর হলেই সেটিকে AI-এর সৃষ্টি বলে সন্দেহ করা একজন লেখকের প্রতি অন্যায় হতে পারে।
একজন লেখকের কাছে লেখা কেবল কয়েকটি শব্দের সারি নয়। একটি কবিতার পেছনে থাকতে পারে বহুদিনের জমে থাকা অনুভূতি। একটি গল্পের পেছনে থাকতে পারে দেখা কোনো মানুষের জীবন, শোনা কোনো ঘটনা কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা। একটি নিবন্ধের পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘ সময়ের চিন্তা, পড়াশোনা ও প্রশ্ন। পাঠক যখন শুধু ভাষার সৌন্দর্য দেখে লেখাটিকে AI-এর বলে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন অনেক সময় তিনি লেখাটির ভেতরে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতাটাকেই অস্বীকার করেন।
তাই লেখকের প্রতি পাঠকেরও একটি দায়িত্ব আছে। কোনো লেখা পড়ে সন্দেহ জাগতেই পারে, প্রশ্নও করা যেতে পারে। কিন্তু সন্দেহকে যেন সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগে পরিণত না করা হয়। লেখার বিষয়বস্তু কী, লেখকের বক্তব্য কতটা গভীর, অনুভূতিটা কতটা সত্য, চিন্তাটা কতটা মৌলিক—এসবও বিচার করা দরকার। একজন লেখককে বিচার করার আগে তাঁর লেখাটিকে বোঝার চেষ্টা করাই একজন সচেতন পাঠকের পরিচয়।
লেখালেখির জগতে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বিষয়টি আরও অন্যভাবে অনুভব করেছি। একটি লেখা তৈরি করা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা সবসময় ততটা সহজ নয়। একটি শব্দ পছন্দ করতে, একটি বাক্য ঠিক করতে, একটি ভাবনাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে কখনও কখনও অনেক সময় চলে যায়। লেখা শেষ করার পরও বারবার পড়ে কাটাকাটি করতে হয়। কোথাও শব্দ বদলাতে হয়, কোথাও বাক্য সরিয়ে দিতে হয়। সেই দীর্ঘ পরিশ্রমের পর কোনো পাঠক যদি শুধু লেখা সুন্দর হওয়ার কারণে বলে দেন, “এটা নিশ্চয়ই AI দিয়ে লেখা,” তখন একজন লেখকের মনে প্রশ্ন জাগে—তবে কি তার পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই?
আমার কাছে AI তাই শত্রু নয়, আবার লেখকের বিকল্পও নয়। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের জীবনের দেখা-শোনা, অনুভব করা, ভুল করা, কষ্ট পাওয়া, ভালোবাসা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতার গুরুত্ব আলাদা। AI হয়তো শব্দ সাজাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের জীবনের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাকে সে মানুষের মতো করে বাঁচতে পারে না।
সময় বদলাবে, প্রযুক্তিও আরও বদলাবে। লেখকেরাও হয়তো নতুন নতুন প্রযুক্তির সাহায্য নেবেন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও আমাদের বিচারবোধটুকু যেন হারিয়ে না যায়। কোনো লেখা পড়ে প্রথম প্রশ্নটা শুধু “এটা কে লিখেছে?” না হয়ে, “এখানে কী বলা হয়েছে, কেন বলা হয়েছে এবং কতটা সত্যভাবে বলা হয়েছে?”—এই প্রশ্নটিও হওয়া দরকার।
কারণ শেষ পর্যন্ত লেখার মূল্য শুধু তার শব্দে নয়; তার ভেতরে থাকা চিন্তা, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সত্যকে স্পর্শ করার ক্ষমতায়।
0 Comments