জ্বলদর্চি

কবিতাগুচ্ছ ॥ অসিতরঞ্জন ঘোষ



 গুচ্ছ কবিতা ॥ অসিতরঞ্জন ঘোষ

স্কুল পালিয়ে

পষ্ট কথা বলছি তোমায়, আমার নেই কষ্ট তেমন। 
ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আমি, পড়াতে নেই কোনও মন।
দিনের বেলায় ঘুড়ি ওড়াই,
নদীর চরে দৌড়ে বেড়াই,
আকাশ দেখি অবাক হয়ে, কত প্রশ্ন যখন তখন। ।

ভাঁটার জলে এ গ্রাম ও গ্রাম, চলাচলে নেই বাধা।
এপার ওপার সব একাকার, বেড়াই ঘুরে যথাতথা।
সবাই মিলে নদীর জলে, 
দাপাদাপি সময় ভুলে,
মাছ ধরি আর হুড়োহুড়ি, দেদার খুশির গান সাধা।

ঢং ঢং ঢং ঘন্টা বাজে, আত্কে ওঠে বুকখানা।
স্কুলের শুরু সময়মত, আজ যাওয়া আর হল না।
মনটা আমার নদীর জলে,
ভাঁটার শেষে জোয়ার এলে,
দাশুমাঝির নৌকা চড়ে, দেখব দূরের গ্রামখানা।

নদীর কোলে হেলেপড়া বটের ছায়ায় বসে দেখি,
জমি জলে হাজার সূর্য, পাতার ফাঁকে দেয় উঁকি।
নাম না জানা পাখির ছানা,
ছোট্ট ডানায় উড়তে মানা।
কাঠ ঠোকরা বানায় বাসা, শুকনো ডালে ঠোঁট রাখি।

জোয়ার জলে যাচ্ছে ভরে, পাড়ের যত খানা নালা।
খড়ের আঁটি বোঝাই নৌকা, চলল ধীরে সেইবেলা।
রোদের তেজ বাড়ছে ক্রমে,
পাখপাখালি বনের খামে,
দোয়েল দুজন সুখীমনে, গাছের ডালে খাচ্ছে দোলা।

মাঝমাঝেই  ঢং ঢং ঢং, চমকে ওঠে আমার মন।
অঙ্কের স্যার ফিরবে এবার,  তিরস্কারে বৃন্দাবন!
ছুট ছুট ছুট, খেলার মাঠে, 
লুকিয়ে গোলার মাটির খাটে,
হঠাৎ কেউ কানটি  টেনে, বলল: টো টো সারাক্ষণ!

খেলায় খোলায় মজা যেমন, স্কুলগুলোতে নেই কেন?
বই পড়ে সব জানতে হবে, কে করল নিয়ম হেন?
কত কিছুই দেখার আছে,
বিশ্বজোড়া মায়ের কাছে,
আনন্দ ঐ নামতা পড়ায়, এমন তেতো খাই না যেন!

সূর্য ওঠে সূর্য ডোবে, নদীর জলে চাঁদ হাসে।
জোয়ার ভাটা নদীর বুকে, বর্ষাকালে বাণ আসে।
সবুজ ধানের পাক ধরে,
সবুজ টিয়ার ঝাঁক ওড়ে,
নীল আকাশে মেঘের দেশে, রামধনুর গান ভাসে।

নিশীথ রাতে আকাশ ঘুমায়, সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে।
হাজার কুচির সূর্যে বোনা  বিশাল চাদর মুড়িয়ে।
শন শন বাতাস তখন 
লুকোচুরি ইচ্ছে মতন,
ঢেউয়ে ঢেউয়ে স্বপ্নে ভাসি, বিজয়কেতন উড়িয়ে।।

মাথা আমার ভোঁ ভোঁ করে, পড়াশোনার নাম শুনে।
রোজ রোজ স্কুলে যাওয়া, রীতি এটা, কোন গুনে?
মন যে নারাজ করি টা কি?
ষষ্ঠ শ্রেণি, যথেষ্ট না কি?
আকাশ বাতাস নদীর জলেই, কাটুক জীবন,  এই মনে।।


এবারের ভোট

ভোট হল এই বছরে, বিশ্বসেরা ভোট। 
সব দলেরই ইচ্ছে বড়, কাটাবে সঙ্কট।
করবে সেবা আপামরের,  ভুলে দলাদলি।
রাখবে তারা মাথায় করে, এমনতরো বুলি।

সাধারণের স্বল্প আশা, শান্তি সুখে বাঁচা।
আশি বছর কেটে গেছে, পাল্টায়নি  ধাঁচা।
কেউ রাখেনি কথা তাদের, কেউ ভরেনি ঝুলি।
ভোটের আগে সব দলেরই প্রতিশ্রুতির বুলি।

এমনি করেই চালায় চলে, সেবাদলের সেবা।
ভোটের পরে ভোট আসে, জনগন কে বা?
শিক্ষা স্বাস্থ্য অনুন্নত,  কারখানাতে তালা।
গ্রাম রয়েছে গাঁয়ে পড়ে,শহর বলে শালা!

ঝড় জলে জীবন চলে, বিজলী পানী নাই।
ভোটের পরে ভোট,  প্রতিশ্রুতির সানাই। 
তবু আপামর ভোট দেয়, বছর বছর ধরে।
শ্রদ্ধা ভক্তি যাই বলুন,গনতন্ত্রের অধিকারে!

তারপর বড় হুঙ্কার,  নাগরিক কি তুমি?
প্রমাণ পত্র যথেষ্ট চাই, 'এ তোমার জন্মভূমি?
মরার ওপর খাঁড়ার ঘা, পকেট গড়ের  মাঠ। 
কাজ নেই পয়সা নেই,  মরা শুকনো কাঠ।

তবু, 
ভোট পরবে লাইনে দাঁড়ায়, একটুও না ভেবে।
জিতলে এবার সুখ শান্তির বাতাস বুঝি পাবে!
কিই বা হল বছর বছর, আশাভঙ্গের সোপান!
এ বছরও তেমনি যাবে, নাকি ফাঁকা সব স্লোগান!

মরছে চাষা ক্ষেত খামারে, শ্রমিক অন্যদেশে।
মাতব্বরীর অস্থিরতা! দলমত নির্বিশেষে।
করছে না কেউ কারুর জন্য, মিথ্যে আশার বাণী।
ভোটের পুঁজি গ্যাঁটে গোঁজেন, নেতা মহান যিনি।


রাতের পথ

পথ আছে পড়ে, লোক নেই তাতে।
এরকম-ই হয় প্রত্যেক রাতে।
দিনে গমগম, রাতেতে নিঝুম। 
পথ থাকে একা, লোক দেয় ঘুম। ।

নিঝুম নিশুতি রাতে, পাখিদের ডাক,
পথকে ভাবায় বুঝি, করে কি অবাক!
তারপর সেই এক, নীরব নিশ্চুপ। 
নিয়ন বাতির ক্লান্ত শ্বাসে রাত উন্মুখ।

রাতভর পোকা ওড়ে, বাতি ঘিরে নাচে,
আঁধার বাড়ে যত, রাত তত বাঁচে।
আনত শান্ত হয়ে, কুকুর কোনও এক,
ধীরপদে  ঘোরে, দ্যাখে রাতের বিবেক!

আঁধার আলোয় মেশা, শিরিষের ডালে,
লক্ষ্মী পেঁচক আসে, নিশুতির তালে। 
কেউ নেই কোত্থাও, পথও শুয়ে থাকে।
রাত শেষে ভোর এসে, ডাকে একে একে।।

🍂


স্বাধীনতার সুখ

জল থই থই,  জল থই থই,  স্বাধীন দেশে বাস। 
দুদিন ধরে খাইনি বাপু, চড়ছে ঘরে হাঁস। ।
পাশের বাড়ির চাল ওড়ে,
দেয়াল চাপায় পর্শী মরে,
স্বাধীন দেশে ধুঁকছে বাবু, গরীবগুলার শ্বাস!!!

রাস্তা ডোবা খানা ডোবা, নদীর ভাঙা বাধ।
চাষের জমি গেল কই, নেই কোনও সংবাদ। 
কান্নার রোল গেছে থেমে,
ভাবলে শরীর উঠছে ঘেমে,
স্বাধীন দেশে আমরা সবাই মানুষ না উন্মাদ?

আশি বছর কেটে গেল, বন্যা থামল না
আশি বছর কেটে গেল, পাকা বাড়ি  না।
মাটির দেয়াল টিনের চাল, 
পরম্পরায় নাজেহাল, 
নেই  রাস্তা শিক্ষা স্বাস্থ্য,  স্বাধীনতা কল্পনা?

আশি বছর কি দীর্ঘ নয়, একটা বাড়ি দিতে?
একটা ভাল রাস্তা, একটু খাবার স্বস্তিতে...
শক্ত একটা নদীর বাধ,
সবার জন্য কাজ অবাধ
শিক্ষা স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, দেশের পরম হিতে।।

মুখ্যু চাষি গরীব চাষি, চাষের ফসল জলে।
ফি-বছর বাড়া ভাতে ছাই, দুঃখ যাবে মলে।
স্বাধীনতার মানে বাবু,
চাই না বুঝতে, অবুঝ কাবু,
আপনারা পালন করুন,  মালা পড়ুন গলে!!!


Post a Comment

0 Comments