জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৮ই সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস।সমান কাজের জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান বেতন পাওয়া প্রত্যেক কর্মীর ন্যায্য অধিকার। সমান বেতন কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে মর্যাদা, ন্যায় ও সমতার পরিবেশ তৈরি করে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে সমান কাজের সমান মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সমান কাজের সমান মর্যাদার জন্য প্রতিবছর ১৮ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস পালিত হয়। কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষসহ সকল মানুষের জন্য সমান বা ন্যায্য পারিশ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বেতন বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। একজন মানুষ তাঁর কাজ, দক্ষতা, যোগ্যতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয় নয়, বরং মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
🍂

 কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের একটি পরিচিত রূপ হলো, লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্য। একই ধরনের কাজ, সমপর্যায়ের দায়িত্ব ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোথাও, কোথাও নারী কর্মীরা পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পান। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীরা অপেক্ষাকৃত কম বেতনের পেশা বা পদে বেশি সংখ্যায় থাকেন। এর পেছনে শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের পার্থক্য, পেশাগত ক্ষেত্রে প্রচলিত সামাজিক ধারণা, কর্মজীবনে বিরতির প্রভাব, পরিচর্যার দায়িত্বের অসম বণ্টন এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক প্রথার মতো নানা কারণ কাজ করতে পারে।
তবে সমান বেতনের প্রশ্নটি কেবল নারী-পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শ্রমিক, কর্মচারী বা পেশাজীবীর পারিশ্রমিক নির্ধারণে তাঁর কাজের প্রকৃতি, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জাতি, লিঙ্গ, সামাজিক পরিচয়, প্রতিবন্ধকতা বা অন্য কোনো অপ্রাসঙ্গিক কারণে পারিশ্রমিকে অন্যায় বৈষম্য তৈরি হলে তা কর্মক্ষেত্রের ন্যায়সংগত পরিবেশকে দুর্বল করে।
সমান বেতন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রথমত, ন্যায্য পারিশ্রমিক মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়ায়। একজন কর্মী তাঁর শ্রমের উপযুক্ত মূল্য পেলে নিজের ও পরিবারের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও নিরাপদ পরিকল্পনা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সমান বেতন কর্মক্ষেত্রে আস্থা ও মর্যাদার পরিবেশ তৈরি করে। কর্মীরা যখন মনে করেন যে, তাঁদের অবদান ন্যায্যভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, তখন কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা ও উৎপাদনশীলতার পরিবেশও শক্তিশালী হতে পারে। তৃতীয়ত, বেতন বৈষম্য কমানো বৃহত্তর অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের একটি বড় অংশ যদি তার শ্রমের পূর্ণ ও ন্যায্য মূল্য না পায়, তাহলে সেই সমাজ তার মানবসম্পদের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারে না। বিপরীতে, যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে সুযোগ ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত হলে আরও বেশি মানুষ শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মজীবনে এগিয়ে আসার উৎসাহ পান। এই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানে কোন পদে কী ধরনের কাজের জন্য কতটা পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়, কীভাবে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি করা হয়, এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতি থাকলে বৈষম্যের সুযোগ কমে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও ন্যায্য মানদণ্ড প্রয়োগ করাও জরুরি। একই সঙ্গে কর্মীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং বৈষম্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সমান বেতন প্রতিষ্ঠায় সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। সরকারকে শ্রম আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হয়। নিয়োগকর্তাদের দায়িত্ব হলো ন্যায্য বেতন কাঠামো তৈরি করা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য প্রতিরোধ করা। কর্মীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আর সমাজের দায়িত্ব হলো, এমন ধারণা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটানো, যেখানে নির্দিষ্ট কাজকে শুধু নারী বা পুরুষের কাজ হিসেবে দেখা হয়। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে এই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে, সঙ্গে নারী ও পুরুষের সমানভাবে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং ন্যায্য পারিশ্রমিকের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র, গৃহভিত্তিক কাজ, কৃষি, পরিচর্যা ও অন্যান্য কম দৃশ্যমান শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।
আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন নয়, এটি আমাদের কর্মজীবন ও সমাজব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। প্রশ্নটি হওয়া উচিত, একজন মানুষ নারী না পুরুষ, কোন সামাজিক পরিচয়ের, কিংবা কোথা থেকে এসেছেন তা নয়, বরং তিনি কী কাজ করছেন, তাঁর দায়িত্ব কতটা, তাঁর যোগ্যতা কী এবং সেই কাজের ন্যায্য মূল্য কত।
সমান কাজের জন্য সমান ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা মানে শুধুমাত্র বেতনের অঙ্ক সমান করা নয়, এর অর্থ হলো, প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে সম্মান করা, বৈষম্যের বাঁধা দূর করা এবং এমন একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করা যেখানে যোগ্যতা ও শ্রমই মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হবে। আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস আমাদের সেই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানায়।

Post a Comment

0 Comments