রঘুপুর ফোর্ট: বিস্মৃত অতীত
সৌমী আচার্য্য
জালোরিপাস হয়ে বহু ভ্রমণার্থী নারকাণ্ডা বা তীর্থানভ্যালীতে প্রবেশ করেন। কিছুটা সময় জালোরিমাতা মাতা মন্দিরেও অনেকে কাটিয়ে যান। কিন্তু এখান থেকে দুটি অসাধারণ হাইকিং পয়েন্ট রয়েছে যেখানে অনেকেই যান না। মন্দিরের বাঁদিকের রাস্তাটি গিয়েছে সারোলসার লেকের দিকে আর ডানদিকের রাস্তাটি একটু নীচের দিকে এগিয়ে ডানহাতে অরণ্যের ভিতর দিয়ে এগিয়েছে রঘুপুর ফোর্টের পথে। অনেক সময় ভুল তথ্য ভ্রমণার্থীদের এই পথে যেতে অনুৎসাহিত করে। কারা যেতে পারবেন কাদের দুবার ভাবতে হবে সবটাই বলব আগে বলি সেই পথের কথা। তীর্থানভ্যালীর জীবি থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছিলাম জালোরিপাসের উদ্দেশ্যে। প্রায় তেরো কিলোমিটার রাস্তা। গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশানাল পার্কের অন্তর্ভুক্ত এই পথ অনিন্দ্য সুন্দর। অসংখ্য পাখীর ঝাঁক তাদের কলতান, দেওদারের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম প্রায় বারো হাজার ফিট উচ্চতায়। দেখলাম এ পথে বাঙালি কম বরং পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লীর তরুণ তরুণীদের ভীড় বেশ বেশি। তারা দল বেঁধে ঘুরতে এসেছে। পথচলতি কোনো তণ্বী হাক্লান্ত মুখে বসে পড়েছে গাছের মাটির বাইরে প্রকটিত উঁচু শিকড়ে, সঙ্গীটি তাকে বোঝাতে ব্যস্ত যে, উপরে গেলে তিনশো ষাট ডিগ্রিতে ধওলাধর পর্বতের অপূর্ব সৌন্দর্য এক অপরূপ শোভা নিয়ে অপেক্ষা করছে। অনিচ্ছায় উঠে পড়ে সেও। বেশ খানিকটা চলার পর পাহাড়ের প্রায় উঁচুতে পৌঁছে রঘুপুর ফোর্টের ধ্বংসাবশেষের অল্পবিস্তর দেখা মেলে।
এই জায়গাটিতে বেশ কিছু টেন্ট রয়েছে। অনেকেই থেকে যাবেন এখানে রাতটুকু। টেন্টওয়ালা কম্বল, বিছানা, বালিশ রোদে দিতে ব্যস্ত। কয়েকটি গরু ও ভেড়া চড়ে বেরাচ্ছে। এখানে বড় বড় বাঁশে দোলনা টাঙানো হয়েছে। ওই সুউচ্চ পাহাড়ে, আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দোলনা চড়তে বেশ লাগল। ছোটোছোটো দোকানগুলিতে চা, কফি, ডিমের ওমলেট পাওয়া যাচ্ছে। ডিমের ওমলেট, কফি অর্ডার দিয়ে সবুজ গালিচায় বসে পড়লাম আমরা। মন এক অনির্বচনীয় আনন্দে পরিপূর্ণ। কাছেদূরে ইতস্ততঃ যাত্রীদল। তবে বলে রাখি প্ররোচিত হয়ে বা অতি উৎসাহে পথ ভুল করলে দীর্ঘ চড়াই চড়তে হবে। পা ছড়িয়ে বসে দূরে আকাশের গায়ে অপেক্ষমাণ বরফাবৃত শৃঙ্গরাজি ফিসফিস করে যেন বলে, কোথাও যেওনা। এখানেই থাকো। খাওয়া শেষে আরও দুশো মিটার উঁচুতে যেতে হবে। ওখানেই রয়েছে আমাদের কাঙ্খিত রঘুপুর ফোর্ট। দেখা হল মাঝপথ থেকে ফিরে যাবার জেদ ধরা মেয়েটির সঙ্গে। হাসিমুখে ছবি তুলতে ব্যস্ত। চোখাচোখি হতেই জিজ্ঞাসা করলাম কেমন লাগছে? হিন্দি পাঞ্জাবি মিশিয়ে ধন্যবাদ দিল। বলল, ভাগ্যিস আপনারাও সাহস দিয়েছিলেন, তাই এত সুন্দর জায়গা দেখতে পেলাম। পথ চলতে চলতে এমন সহজ কথপোকথন অক্সিজেনের মতো মনে হয়।
🍂
এবড়ো খেবড়ো পথ, এবার উঁচু। ডান দিকে সামান্য উঁচু পাঁচিল। কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে। পাঁচিল পেরিয়ে আমরা রঘুপুর ফোর্টে পদার্পন করলাম। ১৭খ্রীষ্টাব্দে মাণ্ডি অথবা কুলুর রাজা এই দুর্গ সুরক্ষার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। আসলে জালোরিপাস ব্যবসা ও প্রতিরক্ষা উভয় কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে সময়। জালোরিপাস মূল পয়েন্ট থেকে ফোর্টের দূরত্ব তিন কিলোমিটার মাত্র। ফোর্টটি প্রায় বারোহাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। ফোর্টে প্রবেশ করলাম বললাম বটে কিন্তু আদতে সে সবটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। বাঁদিকে পর পর অনেকগুলি ঘর, সৈনিকদের থাকার ঘর ছিল সম্ভবতঃ এখন পশুদের পরিত্যক্ত মল ও আবর্জনায় আকীর্ণ। এর ঠিক সম্মুখে একটি মন্দির, এখনও অক্ষত। মন্দিরে প্রবেশের আগে ডান হাতে কুয়ো মতো দেখতে পেলাম। পরপর দুটি। মন্দিরটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। যেন এখনই শোনা যাবে ঘন্টা ধ্বনি যেন এখনই পুরোহিত মন্ত্র বলে উঠবেন। এই মন্দিরটি শৃঙ্গাঋষির। গোটা কুলু উপত্যকায় যার রাজত্ব বলে অনুমান করা হয়। এই শৃঙ্গাঋষির অভিশাপে রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যু হয় তক্ষকের কামড়ে। তেজি এই ঋষির মন্দির হিমাচলের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে। বুঝলাম কুলু বা মান্ডি রাজ যিনিই এই ফোর্ট তৈরী করুন তিনিও শৃঙ্গাঋষির ভক্ত ছিলেন। অনেকখানি অঞ্চল জুড়ে পাথরের পাঁচিলের ধ্বংসাবশেষ যেন ফিসফিস করে নিজের গৌরব কাহিনী ব্যক্ত করে চলেছে।
আকাশে ঘনকালো মেঘ। ধৌলাধরের সীমারেখা মুছে গিয়েছে ছাইরঙে। এবার ফিরতে হবে। রঘুপুর ফোর্ট ভারতের হায়েস্ট অলটিচিউড ফোর্ট। চারিদিকে প্রচুর রডোড্রেনড্রন গাছ। মার্চ এপ্রিলে জীবি উপত্যকা যখন ফুলে ভরে ওঠে তখন ভারী চমৎকার দেখায়। এপ্রিল থেকে জুন এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রঘুপুর ফোর্ট আসার দারুণ সময়। শীতে এখানে প্রচুর বরফপাত হয় তখন এইপথ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
এবার বলি এই পথ কতটা ভয়ংকর? বা হাঁটতে কতটা কষ্ট। দেখুন আমরা সমতলের মানুষ উঁচুনীচু এবড়ো খেবড়ো পথ আমাদের কাছে একটু সমস্যার কিন্তু এই পথ সাংঘাতিক এমনটা বলার কোনো কারণ নেই। গাছে ঘেরা সুন্দর পথ। মাঝেমাঝে একটু চড়াই আছে ঠিকই তবে বিশ্রাম নিয়ে ধীরে ধীরে এগোলে খুব কষ্ট হবে না। সেক্ষেত্রে জালোরিপাস যত সকালে পৌঁছে যত তাড়াতাড়ি হাইকিংটি শুরু করা যায় ততই ভালো। আমাদের চলার পথে অনেক ছোটো বাচ্চা সঙ্গী ছিল। তারা বেশ তরতরিয়ে হাঁটছিল। যদিও প্রবল হাঁটু বা কোমড় ব্যথা যাদের তারা এই পথে না গেলেই ভালো। কারণ এবড়ো খেবড়ো চড়াই পথে এই সব শারীরিক কষ্ট থাকলে চলা দুরূহ। আবার যদি দলবেঁধে অনেকে যাওয়া যায় এবং টেন্টে একটি রাত থাকা যায় তবে সে অভিজ্ঞতা সারাজীবনের জন্য সেরা সম্পদ হয়ে থাকবে। ভালো করে পরিকল্পনা করে যদি পূর্ণিমায় যাওয়া যায় তবে আরও ভালো। রঘুপুর ফোর্টে বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা জালোরিপাস ফিরে এলাম। যেতে যে সময় লেগেছিল তার প্রায় অর্দ্ধেক সময়ে নীচে নেমে এলাম। জালোরি মাতা মন্দিরের পাশেই বহু মহিলারা পসরা নিয়ে বসেছেন। রঙিন সব দোকান। সোয়েটার, চাদর, মাফলার, টুপি। চমৎকার রঙ ও কারুকাজ। হাসিখুশি মানুষগুলো সহজেই কত গল্প জুড়ে দিলেন আমার সঙ্গে। পাশেই ঠেলা গাড়িতে বিক্রি হচ্ছে রাজমা চাওলা একশো টাকায়। পেট ভরে রাজমা চাওল খেয়ে রওনা দিলাম নারকাণ্ডার উদ্দেশ্যে। তখন ঘড়িতে প্রায় দেড়টা। রঘুপুর ফোর্ট ধীরে ধীরে কুয়াশার অন্ধকারে ডুবে যাবে এরপর।
কী ভাবে যাবেন: হাওড়া কালকা নেতাজি এক্সপ্রেসে কালকা। সেখান থেকে সিমলা হয়েও জালোরি যেতে পারেন। তীর্থানভ্যালী ও জীবি হয়েও জালোরি যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন: জালোরিপাস জীবি থেকে সবচেয়ে কাছে তবে নারকাণ্ড থেকেও অনায়াসে জালোরিপাস ঘোরা যায়। উভয় জায়গাতেই বিভিন্ন দামের প্রচুর হোটেল রয়েছে।
2 Comments
খুউব ভালো লাগলো ছবির মতো দেখতে পেলাম যেন।
ReplyDeleteআন্তরিক ধন্যবাদ
ReplyDelete