দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১৭ই সেপ্টেম্বর, বিশ্ব রোগির নিরাপত্তা দিবস। বিশ্ব নিরাপত্তা কি এবং এই দিবসের গুরুত্ব কি, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
নিরাপদ চিকিৎসা, সুস্থ সমাজ তৈরীর জন্য
প্রতিবছর ১৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগীর নিরাপত্তা দিবস পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৯ সালে এই দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো রোগী যেন অসাবধানতা, ভুল প্রক্রিয়া, যোগাযোগের ঘাটতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাজনিত ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। অসুস্থ হলে মানুষ চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আস্থা রাখেন। একজন রোগী যখন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকেন, তখন তাঁর নিরাপত্তা শুধু চিকিৎসকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হাসপাতালের প্রতিটি কর্মী, সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যথার্থতা এবং রোগী ও পরিবারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ। তাই রোগীর নিরাপত্তা আসলে একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির পরও চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। ভুল ওষুধ বা ভুল মাত্রা, রোগীর পরিচয় নিশ্চিত না করা, চিকিৎসার তথ্যের সঠিক আদান-প্রদান না হওয়া, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি কিংবা অস্ত্রোপচারের আগে যথাযথ যাচাই না করা, এসব কারণে রোগীর ক্ষতি হতে পারে। এই ধরনের ঝুঁকি কমানোর জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা-প্রোটোকল এবং তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর নিরাপত্তার প্রথম শর্ত হলো সঠিক যোগাযোগ। রোগী কী সমস্যায় ভুগছেন, কোন ওষুধ গ্রহণ করছেন, কোনো ওষুধে অ্যালার্জি আছে কি না, এসব তথ্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন। একইভাবে রোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও চিকিৎসা সম্পর্কে সহজ ভাষায় প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো উচিত। রোগী যেন নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন এবং কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা জানাতে পারেন, এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের নাম, মাত্রা, সময় এবং ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে ভুল হলে রোগীর ক্ষতি হতে পারে,তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ পরিবর্তন বা বন্ধ না করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্ধারিত নিরাপত্তা-পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে ওষুধ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপকে আরও সুশৃঙ্খল করা প্রয়োজন। সংক্রমণ প্রতিরোধও রোগীর নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাত পরিষ্কার রাখা, চিকিৎসা সরঞ্জাম যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট সতর্কতাও অনেক সময় বড় ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে পারে।
🍂
রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ডিজিটাল স্বাস্থ্য-রেকর্ড, ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশন, রোগীর তথ্যের সঠিক সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চিকিৎসাজনিত ভুল কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
এই দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ভুল হলে তা লুকিয়ে না রেখে কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। রোগীর নিরাপত্তা এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করার আহ্বান জানায়, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা ভয় ছাড়াই ঝুঁকি বা ভুলের কথা জানাতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠান সেই তথ্যকে শাস্তির পরিবর্তে উন্নতির সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে। রোগীরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। নিজের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে জানানো, চিকিৎসকের নির্দেশনা বোঝার চেষ্টা করা, অ্যালার্জি বা পূর্বের চিকিৎসার কথা জানানো এবং প্রয়োজনে প্রশ্ন করা এসব রোগীর নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করে। পরিবারের সদস্যরাও রোগীর পাশে থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে করিয়ে দিতে এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্দেশনা বুঝতে সহায়তা করতে পারেন। বিশ্ব রোগীর নিরাপত্তা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি নিরাপদ ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। চিকিৎসার উদ্দেশ্য শুধু রোগ নিরাময় নয়, নিরাপদভাবে রোগীর সুস্থতা নিশ্চিত করা। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, রোগী ও পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
0 Comments