সেগুন-শালের অরণ্যগাথা
পর্ব ৩
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়
রাত্রিকালীন অরণ্য ও ভারতের প্রথম ‘ডার্ক স্কাই পার্ক’
"সেখানে মানুষ কেউ যায় নাকো—দেখা যায় বাঘিনীর ডোরা
বেতের বনের ফাঁকে,—জারুল গাছের তলে রৌদ্র পোহায়
রূপসী মৃগীর মুখে দেখা যায়,—শাদা ভাঁটপুষ্পের তোড়া
আলোকলতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণ ফুল বাসকের গায়;
তবুও সেখানে আমি নিয়ে যাব এক দিন পাট্কিলে ঘোড়া,
যার রূপ জন্মে জন্মে কাঁদায়েছে আমি তারে খুঁজিব সেথায়”।
অরণ্যে কাটানো দিনরাত্রি যাপনে জীবনানন্দ এভাবেই ধরা দেয়। সেই যেখানে মানুষ যায়না, যেখানে ডোরাকাটা বাঘিনীর ডেরা, সেখানে আজ মানুষের অবারিত দ্বার। বনাঞ্চলের নৃপতির সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে বহুবার । সেই গল্পই বলছি এবার। ল্যাঙ্গুরের সেই তীক্ষ্ণ অ্যালার্ম কলে আমরা সচেতন হলাম। এ সময় কোন শব্দ করা মানা। আশেপাশেই আছে সে। ক্যমেরা বাগিয়ে সকলে তখন অধীর অপেক্ষায়। ভাগ্যদেব প্রসন্ন থাকলে দর্শন নিশ্চিত মিলবে। কিছুক্ষণের অপেক্ষা, ঝোপঝাড় ঠেলে বেরিয়ে এল মহাল-মহীপ। এই সেই রয়্যল বেঙ্গল টাইগার! মন্ত্রমুগ্ধ। এমন মহিমান্বিত তার উপস্থিতি, রাজকীয় তার পদচারনা, এক অদ্ভুত ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার জন্ম দেয়। খোলা জিপসির পাশ দিয়ে সদর্পে হেঁটে সামনের জলাশয়ে নেমে গেল। সম্বিত ফিরল আমাদের। পিপাসা মিটলে ফিরে গেল ডেরায়। কিন্তু আমাদের পিপাসা মেটার নয়। চললাম জিপসি নিয়ে তার পিছন পিছন। একসময় চোখের আড়াল হল।
বাঘের নেশা এক তীব্র নেশা। যতই দেখি, আশ মেটেনা। দেখার রেশ যখন কাটল, ততক্ষণে বনভূমির ওপর বিকেলের সোনালী আলো ফিকে হয়ে এসেছে।
দেখা মিললো কিংফিশার, ছাতারে, বসন্তবৌরি, দোয়েল, হাঁড়িচাঁচা, মাছমুরালি। ছুটলাম নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। গাছের মগডালে বসে সাপ বা ছোট সরীসৃপের খোঁজ করে এরকম ক্রেস্টেড সার্পেন্ট ঈগলেরও দেখা মিললো। সীতাঘাট , বোধনাল্লা হ্রদ এবং আলীকাট্টা তৃণভূমি এখানকার পাখী দেখার সেরা স্থান। পেনচে প্রায় ২৮৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। মাছরাঙা, হর্নবিল, ময়নামতি, পেঁচা এবং শীতকালে আসা পরিযায়ী পাখিদের মিলিত কলরব বনাঞ্চলের স্তব্ধতাকে বারাবারে আঘাত করে।
এই আলীকাট্টা ও ছিন্দীমাট্টা এলাকার মতো উন্মুক্ত তৃণভূমিগুলো মূলত লম্বা ঘাসের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। অতর্কিত আক্রমণের জন্য এই লম্বা ঘাসজমি সহায়ক। বাঘের ডোরাকাটা দাগ এই লম্বা ঘাসের রঙের সাথে সহজেই মিশে যায়, যাকে বলে Camouflage। তবে বন বিভাগ অনেক সময় তৃণভূমি পুনরুত্থানের জন্য এই শুকনো ঘাস পুড়িয়ে দেয়।
🍂
এখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও ভারতীয় চিতাবাঘ বা লেপার্ড, শিয়াল, স্লথ বিয়ার (ভাল্লুক), গৌর (ভারতীয় বাইসন), সম্বর হরিণ এবং চিতল হরিণ প্রচুর সংখ্যায় দেখা যায়। মাঝেমধ্যে এখানে বিরল ব্ল্যাক প্যান্থার বা কালো চিতাবাঘেরও দেখা মেলে। বেশ কয়েকবছর আগে এখানেই একবার সেই বিরল প্রাণী দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের।
নিয়ম মেনে সূর্য ডোবার আগেই জিপসি গাড়িগুলোকে ফিরে আসতে হয় জঙ্গলের সীমানার বাইরে। জঙ্গল তখন একা। তবে কোলাহল থেমে গেলেই কি অরণ্য নিস্পন্দ হয়ে যায়? বরং মানুষের তৈরি নিয়ম যেখানে শেষ হয়, প্রকৃতির নিজস্ব রাজত্ব ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। আর সেই নিশাচর অরণ্যের এক অবিশ্বাস্য রূপের সাক্ষী হতে আমাদের যেতে হয়েছিল পেন্চের মহারাষ্ট্র অংশ— যা আজ ভারতের প্রথম এবং এশিয়ার পঞ্চম অফিশিয়াল ‘ইন্টারন্যাশনাল ডার্ক স্কাই পার্ক’ (International Dark Sky Park)।
জঙ্গল আমাদের চোখে সবুজ বনানী, বন্যপ্রাণী আর সাফারি। কিন্তু পেন্চ আমাদের শেখায়, একটা মহারণ্যের
আকাশও কতটা মূল্যবান। কৃত্রিম আলোর দূষণে আমরা রাতের আকাশ ধূসর দেখি। কিন্তু পেন্চের এই ‘ওয়াঘোলি’ বাফার অঞ্চল অন্ধকারকে পরম যত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে। বন দপ্তরের কড়া নির্দেশেই এখানে জোরালো আলো জ্বলে না, রিসোর্টগুলোর আলোও মাটির দিকে মুখ করা। ফলে, অন্ধকার এখানে ঘন। চোখের সামনেও কোনকিছু স্পষ্ট দেখা যায় না।
সন্ধের পর যখন আমরা বাফার অঞ্চলের উন্মুক্ত প্রান্তরে এসে দাঁড়ালাম, মাথার ওপরের আকাশ মুহূর্তেই বাকরুদ্ধ করলো। কে যেন অজস্র মণিমানিক্য ছিটিয়ে দিয়েছে আকাশের গায়ে। জরোয়ায় মোড়া এক মহাজাগতিক চাদর! খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যায় ছায়াপথ। টেলিস্কোপের লেন্সে চোখ রাখলে ধরা দেবে দূর নক্ষত্রপুঞ্জের নিখুঁত জ্যামিতি।
কিন্তু এই মহাজাগতিক সৌন্দর্যের ঠিক নিচেই জেগে আছে এক আদিম শ্বাপদসংকুল নিষ্ঠুর পৃথিবী। ঘন অন্ধকারে বনের দিক থেকে ভেসে আসছে অন্য এক জীবনের শব্দ। কখনো কোনো নিশাচর পাখির তীক্ষ্ণ ডাক, আবার কখনো শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কোনো বন্য দানবের হেঁটে যাওয়ার খসখস শব্দ। গাইড সঠিক বলেছেন। দিনের বেলা যে বাঘকে আমরা খুঁজতে যাই, রাতে সে আমাদের খোঁজে।
তবে এই বনভূমি আপাতদৃষ্টিতে যতটা নিঃসঙ্গ, আদতে ততটা নয়। আশপাশে ছড়িয়ে আছে কয়েকটা গ্রাম। যেমন পচধর। প্রায় ১১০টি আদিবাসী কুমোর পরিবারের বাস এখানে। বংশপরম্পরায়, আধুনিক কোন মেশিন ছাড়াই সম্পূর্ণ খালি হাতে মাটির চমৎকার পুতুল, পাত্র ও তৈজসপত্র তৈরি করে এরা। নীল-সাদা মাটির বাড়ির এই গ্রামটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এছাড়াও আছে খাম্বা। গোণ্ড আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। পরিবেশ-বান্ধব ইকো-রিসোর্ট রয়েছে এমন দুটি গ্রামের নাম কোহকা এবং আভারঘানি। পর্যটন অন্যতম প্রধান জীবিকা। মণ্ডই উৎসব, হোলি এবং দিওয়ালির সময় এরা 'কর্মা' ও 'শৈলা' নৃত্য পরিবেশন করেন। রাতের বেলা মাদলের আওয়াজে পুরো গ্রাম মুখরিত হয়ে ওঠে।
জীবন এখানে উত্তেজনাময়। লোকালয়ে বন্য প্রাণী প্রায়শই চলে আসে খাবারের খোঁজে। নিয়ে যায় পোষ্য। জঙ্গলের কিছু নিয়ম আছে। মানুষ ও বন্য প্রকৃতির সাথে এক ধরণের চমৎকার বোঝাপড়া আছে। সে নিয়মের ব্যত্যয় হলেই বিপদ। মাঝে মাঝে তাই গ্রাম্য মনুষ্যপ্রাণও খোয়া যায়।
"শহরের কংক্রিটের খাঁচা থেকে মুক্তি পেতে মন ছুটে যায় এমন এক অরণ্যে, যেখানে সকাল আসে শিশির ঝরানো ঘাসে আর পাখির গানে”- বুদ্ধদেব গুহ। আবার সেই তাঁর কথাই মনে এল।
দিনের বেলার পেন্চ যদি হয় কিপলিং-এর গল্পের চঞ্চল ‘মোগলি’, রাতের পেন্চ তবে এক ধেয়ানী ঋষি। মাথার ওপর অনন্ত নক্ষত্রবীথি বুকে নিয়ে জেগে থাকা এই আদিম অরণ্য মানুষকে এক পরম শিক্ষা দেয়— প্রকৃতির কাছে আমরা অতি ক্ষুদ্র। পেন্চের এই মহাজাগতিক বিষ্ময় বুকে নিয়ে এবার আমাদের রওনা হতে হবে আরও দক্ষিণে, যেখানে অপেক্ষা করছে এক রুক্ষ, তপ্ত এবং আরও হিংস্র এক বাঘ-মহাল... যার নাম তাডোবা-আন্ধারি। (ক্রমশ...)
2 Comments
আবার এক অসামান্য অভিজ্ঞতার ধারাবিবরণী l
ReplyDeleteনিয়মিত পড়ছেন জেনে উৎসাহ পাচ্ছি লেখার। 🙏
Delete