বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২১শে সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস।
আলঝেইমার্স কি, দৈনন্দিন জীবনে এই মানসিক রোগের জন্য মানুষকে কত রকমের সমস্যায় পড়তে হয় এবং এর যত্ন কিভাবে নেওয়া হয়, আসুন সব কিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
স্মৃতির যত্নে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত সকলের। প্রতিবছর ২১শে সেপ্টেম্বর বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস পালিত হয়। স্মৃতি, পরিচয় ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তোলাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। আলঝেইমার্স শুধু একটি রোগের নাম নয়, এটি একজন মানুষ এবং তাঁর পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে নানা সামাজিক, মানসিক ও বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে আলঝেইমার্স রোগ ডিমেনশিয়ার একটি সাধারণ কারণ। এতে ধীরে, ধীরে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি, বিচার-বিবেচনা এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শুরুতে একজন মানুষ হয়তো সাম্প্রতিক কথাবার্তা ভুলে যেতে পারেন, একই প্রশ্ন বারবার করতে পারেন, পরিচিত জায়গায় পথ চিনতে অসুবিধা হতে পারে কিংবা দৈনন্দিন কাজের কিছু ধাপ ভুলে যেতে পারেন। সময়ের সঙ্গে, সঙ্গে সমস্যাগুলো আরও বাড়তে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ বয়সজনিত ভুলে যাওয়া আর আলঝেইমার্স এক বিষয় নয়। তাই বারবার বা ক্রমশ বাড়তে থাকা স্মৃতির সমস্যাকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এই রোগের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি হলো, আক্রান্ত মানুষটি ধীরে, ধীরে নিজের পরিচিত পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ হারাতে পারেন। যে মানুষটি একসময় পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন, সন্তানদের যত্ন করতেন কিংবা কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন, তিনিই হয়তো একদিন নিজের পরিচিত মানুষ বা জায়গার নাম মনে করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। এই পরিবর্তন পরিবারকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বিরক্ত বা হতাশ হয়ে পড়েন। অথচ এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, সম্মান ও ভালোবাসা।
🍂
আলঝেইমার্স আক্রান্ত ব্যক্তিকে বারবার ভুল ধরিয়ে দেওয়া বা “আপনি এটা কেন মনে রাখতে পারছেন না?” এ ধরনের প্রশ্ন করা তাঁর অস্বস্তি বাড়াতে পারে, বরং শান্তভাবে কথা বলা, সহজ ভাষায় বিষয় বোঝানো, পরিচিত পরিবেশ বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন কাজের একটি নিয়মিত রুটিন তৈরি করা সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের যত্নদাতাদের নিজেদের বিশ্রাম ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। কারণ দীর্ঘদিন ধরে একজন অসুস্থ মানুষের যত্ন নেওয়া শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর হতে পারে। আলঝেইমার্স সম্পর্কে আমাদের সমাজে সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেকেই স্মৃতিভ্রংশকে শুধুই “বয়সের স্বাভাবিক ব্যাপার” বলে মনে করেন। আবার কেউ, কেউ ভুল ধারণা বা সামাজিক লজ্জার কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, এর ফলে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন, সহায়তা ও পরিকল্পনা পেতে দেরি হতে পারে। তাই এই রোগ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা এবং ভুল ধারণাগুলো দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলঝেইমার্সের সব কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হলেও এটি কেবল বৃদ্ধ মানুষের রোগ নয়। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য জৈবিক বা স্বাস্থ্যগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যাগুলোর যথাযথ চিকিৎসা, এসব সামগ্রিকভাবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে এগুলোকে আলঝেইমার্স প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস তাই শুধু একটি রোগ সম্পর্কে তথ্য জানানোর দিন নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের স্মৃতি কমে গেলেও তাঁর মর্যাদা কমে যায় না। একজন মানুষ তাঁর স্মৃতির চেয়েও অনেক বেশি কিছু। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং অবদানকে সম্মান করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। একজন আলঝেইমার্স আক্রান্ত মানুষ হয়তো কোনো পরিচিত মুখের নাম মনে করতে পারছেন না, কিন্তু তাঁর সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলা, হাত ধরে পাশে থাকা কিংবা তাঁর পুরোনো গল্প মন দিয়ে শোনা, এসবই তাঁর কাছে নিরাপত্তা ও আপনজনের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। কখনও, কখনও চিকিৎসার পাশাপাশি এই মানবিক যত্নই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সহায়তা। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হতে পারে, আলঝেইমার্স নিয়ে ভয় বা লজ্জা নয়, সচেতনতা ও সহমর্মিতা ছড়িয়ে দেওয়া। পরিবারের কোনো সদস্যের স্মৃতির পরিবর্তন চোখে পড়লে তাকে অবহেলা না করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিকে সম্মান করা এবং যত্নদাতাদের পাশে দাঁড়ানো,এই ছোট, ছোট পদক্ষেপই একটি মানবিক সমাজ গড়তে পারে।
স্মৃতি আমাদের জীবনের মূল্যবান অংশ, কিন্তু কোনো মানুষের স্মৃতি দুর্বল হয়ে গেলেই তাঁর জীবন অর্থহীন হয়ে যায় না। বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা তাই হতে পারে, স্মৃতি হারিয়ে গেলেও মানুষকে হারিয়ে ফেলব না। ভালোবাসা, সম্মান ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে আমরা আলঝেইমার্স আক্রান্ত মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের পথচলাকে কিছুটা হলেও সহজ করতে পারি।
0 Comments