সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত
লাদাখের নাম শুনলেই সাধারণত চোখের সামনে ভেস ওঠে ধূসর, রুক্ষ পাহাড়, লম্বা সোজা রাস্তা আর পাশে পাশে ছুটে চলা পাহাড়ি ভূমিরূপ। কিন্তু পনেরো দিনের লাদাখ ভ্রমণ আমাকে জানিয়েছে লাদাখের অনুপম সৌন্দর্য আসলে লুকিয়ে আছে এর মানচিত্রের শেষ সীমানায়—যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের ব্যস্ততা থামে, আর শুরু হয় প্রকৃতির এক আদিম নিস্তরঙ্গ নীরবতা। ঠিক এমনই এক গন্তব্য লাদাখি গ্রাম ‘মেরাক’।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪,২৭০ ফুট উঁচুতে, ভারত-চীন সীমান্তের একদম কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট গ্রামটি যেন আধুনিক পৃথিবীর সীমানার বাইরে এক রূপকথার দেশ। প্যাংগং হ্রদের কোলজুড়ে অবস্থিত মেরাক ভ্রমণ আমার ভ্রমণের খাতায় এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে লেখা থাকবে।
লেহ শহর থেকে মেরাকের দূরত্ব প্রায় ১৯০ কিলোমিটার। কিন্তু মাইলের হিসেবে এই পথকে মাপা ভুল হবে। লেহ থেকে যাত্রা শুরু করে বরফে ঢাকা ১৭,৫ ৯০ ফুট উঁচুর ‘চাং লা’ (Chang La) পাস পার হওয়াটাই প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। পাতলা বাতাস আর হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডাকে জয় করে যখন আমাদের গাড়ি নিচের উপত্যকায় নামতে শুরু করল, প্রকৃতির দৃশ্যপট যেন আচমকাই বদলে গেল।
প্যাংগং হ্রদের পরিচিত পর্যটন এলাকা স্পাংমিক (Spangmik) ছাড়ানোর পর পাকা রাস্তার সমাপ্তি ঘটল। শুরু হলো পাথর, বালি আর ধূসর উপত্যকার আসল ‘অফ-রোড’ ড্রাইভ। বামপাশে সুবিশাল প্যাংগংয়ের জলরাশি আর ডানপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর পর্বতমালা—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী এক চিলতে কাঁচা পথ ধরে অবশেষে যখন মেরাকে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো সময় যেন এখানে স্থবির হয়ে আছে।
একজন ভ্রামণিক হিসেবে আমার মূল লক্ষ্য থাকে কোনো অঞ্চলের রূপের পেছনের জীবনটাকে দেখা। মেরাক গ্রামে ঢুকলেই বোঝা যায়, কেন একে লাদাখের অন্যতম শান্ত জনপদ বলা হয়। স্পাংমিকের বাণিজ্যিক কোলাহল বা আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া এখানে পৌঁছায়নি।
প্যাংগংয়ের রূপ পরিবর্তন:
মেরাক থেকে প্যাংগংয়ের দৃশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে হ্রদের জলের রঙটা বদলাতে শুরু করল—সকালের পান্না-সবুজ থেকে দুপুরের গাঢ় নীল, আর বিকেলের ছায়ায় রূপালী এক আভা। চারপাশে সেই “ধূম্র” পাহাড় যার বিরাট ছায়া কখনো লেকের জলরাশিতে টুক করে মুখ দেখে নেয়। আর ছলছলে জলের লেকটা।
হ্রদটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা চীনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভারত-চীন সীমান্ত নির্ধারণকারী 'লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল' (LAC) বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা এই হ্রদের ওপর দিয়েই অতিক্রম করেছে। হ্রদটির একটি নির্দিষ্ট অংশের ওপর ভারত ও চীন উভয় দেশই নিজেদের দাবি জানিয়ে আসছে, যা মূল ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের একটি অংশ। এই সীমান্ত বিরোধের জের ধরে ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ এবং ২০২০-২০২১ সালের ভারত-চীন সংঘর্ষের সময় এই অঞ্চলটি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
ঐতিহাসিকভাবে, 'প্যাংগং তসো' (Pangong Tso) নামটি কেবল লাদাখে অবস্থিত পাঁচটি উপ-হ্রদের সবচেয়ে পশ্চিমাংশের জন্য প্রযোজ্য ছিল। তিব্বতি অংশে, 'নিয়াক তসো' (Nyak Tso বা "মধ্য হ্রদ") নামে পরিচিত হ্রদের দুটি অপেক্ষাকৃত বড় অংশ ছোট দুটি জমজ 'রুম তসো' (Rum Tso) হ্রদকে দুই দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। তিব্বতি ভাষায় এই পুরো হ্রদগোষ্ঠীকে প্রায়শই 'তসোমো নাংলা রিংপো' (Tsomo Nganglha Ringpo) নামে অভিহিত করা হয়।
প্রায় আধঘণ্টা লেকের পাড়ে কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম মান গ্রাম ছাড়িয়ে আরও ভেতরে অবস্থিত এক নিভৃত ও আদিম সীমান্ত গ্রাম মেরাকে। এটি ভারত-চীন সীমান্তের খুব কাছে এবং তারকামণ্ডলী দেখার (stargazing) জন্য বিখ্যাত।
হিমালয়ের কোলে থমকে থাকা অদ্ভূত আদিম জীবন যেখানে মানুষের মুখে সবসময় হাসি আর লড়াইয়ের মানসিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে বারবার।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪,২৭০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত মেরাক (Merak) কেবল এক নিভৃত সীমান্ত গ্রাম নয়, এটি প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার এক অসামান্য উদাহরণ। আন্তর্জাতিক সীমানা (LAC) এবং প্যাংগং হ্রদের কোল ঘেঁষে থাকা এই গ্রামটিতে হাতে গোনা মাত্র ৫০-৬০টি পরিবারের বসবাস। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার যান্ত্রিক ছোঁয়া থেকে বহুদূরে অবস্থিত এই গ্রামের মানুষের জীবনধারা যেমন সরল, তেমনই কঠোর।
মেরাকের বাসিন্দারা মূলত 'চাংপা' (Changpa) বা উচ্চভূমির যাযাবর লাদাখি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। কৃষিভিত্তিক জীবিকা এখানে প্রায় অসম্ভব। তাই পশুপালনই এদের জীবনের মূল ভিত্তি। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পশম 'পশমিনা (Pashmina) প্রদানকারী বিশেষ জাতের ছাগল এবং ইয়াক (Yak) পালন করে এরা জীবিকা নির্বাহ করে। কনকনে শীতে যখন তাপমাত্রা মাইনাস ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, তখন পশুদের খাবারের খোঁজে এরা উঁচু পার্বত্য প্রান্তর ঘুরে বেড়ায়। তীব্র ঠান্ডা থেকে বাঁচতে পুরুষ ও নারী উভয়েই ছাগল বা ভেড়ার চামড়া ও উলের তৈরি লম্বা পোশাক (যাকে স্থানীয় ভাষায় 'গোঞ্চা' বা Goncha বলা হয়) পরিধান করেন।
মেরাকের প্রতিটি বাড়ি নিজস্ব স্থাপত্যে তৈরি, যা পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঠান্ডা ও তীব্র বাতাস থেকে বাঁচতে ঘরগুলো তৈরিতে কাদা-মাটি, পাথর ও স্থানীয় কাঠ ব্যবহার করা হয়। ঘরের ভেতরটা কাঠের তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গরম থাকে। গ্রামে মূল বিদ্যুৎ গ্রিড নেই। দিনের বেলা সোলার প্যানেলে চার্জ করে রাতে মাত্র ৩-৪ ঘণ্টার জন্য (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত) সৌরবিদ্যুতের আলো জ্বালানো হয়।
শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে নেমে গেলে জলের সব উৎস জমে বরফ হয়ে যায়। তখন বরফ গলিয়ে রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জল সংগ্রহ করতে হয়।
তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম মেরাকের মানুষের মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি। প্রতিটি বাড়ির ছাদে এবং গ্রামের প্রবেশদ্বারে পতপত করে উড়তে দেখা যায় রঙ-বেরঙের 'প্রেয়ার ফ্ল্যাগ' (Prayer Flags)। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, এই পতাকার বাতাস বিশ্বজুড়ে শান্তি ছড়ায় এবং গ্রামকে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে।
অতিরিক্ত ঠান্ডায় শরীর গরম রাখতে তারা বিশেষ ধরনের 'বাটার টি' বা গুড় গুড় চা (Gur Gur Chai) পান করেন। খাবারের তালিকায় প্রধানত থাকে ছাতু (Tsampa), ইয়াকের দুধ থেকে তৈরি মাখন ও পনির এবং নুডলসের থুকপা (Thukpa) ও স্কিউ (Skyu)।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও মেরাকের মানুষের মুখে সব সময় লেগে থাকে এক অমায়িক, সতেজ হাসি। পৌঁছানোমাত্র হোমস্টের কর্তা পরম শ্রদ্ধায় 'জুলে' (Julley - লাদাখি অভিবাদন) বলতে বলতে এগিয়ে এলেন। কোনো বিলাসবহুল আয়োজন না থাকলেও তাদের হোমস্টেগুলোতে থাকা অতিথিদের প্রতি যত্নশীলতা এবং নিজেদের সামান্য খাবার ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা যেকোনো মানুষকে মুগ্ধ করবেই। আপ্যায়ন করলেন বাটার টি আর ইয়াকের দুধের জমানো টুকরো দিয়ে। তারপর ফ্রেশ হয়ে গ্রামের রাস্তায় একটু হাঁটতে বেরোলাম।
একটা অদ্ভুত রুক্ষতা চারিদিকে। তা সে হাওয়াই বলো আর গ্রামের রাস্তাই বলো। সবুজের চিহ্ন নেই। বিক্ষিপ্ত ভাবে ঘাসে ঢাকা জমি রয়েছে আর আগাছা, পাথরের দেওয়াল, ন্যাড়া ন্যাড়া পাহাড় আর ফোকর জাতীয় জানালা দেওয়া বাড়ি ঘর।
নক্ষত্রলোকের নিচে এক রাত:
জীবনে বহু জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু মেরাকের রাতের আকাশ আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল, মাথার ওপর ফুটে উঠল এক অবিশ্বাস্য ক্যানভাস। কোনো শহরের আলো বা বায়ুদূষণ না থাকায় আকাশ এতটাই স্বচ্ছ যে, খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল 'মিল্কিওয়ে' বা ছায়াপথ। হিমশীতল হাওয়ার মধ্যে হ্রদের জলের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর কোটি তারার মেলা—এ যেন এক অন্য জগতের অনুভূতি।
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ গাইড:
একজন ভ্রমণ সহায়ক হিসেবে মেরাক ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবসম্মত ও জরুরি তথ্য তুলে ধরা আমার দায়িত্ব বলে মনে করি:
১. সীমান্ত পারমিট (ILP): সীমান্তের খুব কাছে হওয়ায় মেরাক ভ্রমণের জন্য ইনার লাইন পারমিট (Inner Line Permit) বাধ্যতামূলক। লেহ শহরের ডিসি অফিস বা নিবন্ধিত এজেন্সির মাধ্যমে এই অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হয়।
২. থাকা ও খাওয়া (Homestay Culture): এখানে কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। একমাত্র ভরসা স্থানীয় লাদাখি পরিবারের 'হোমস্টে'। স্থানীয় কাঁচা কাঠের তৈরি উষ্ণ ঘর, সাথে বাড়ির তৈরি গরম 'বাটার টি' (Gur Gur Chai) আর ‘থুকপা’—এই আতিথেয়তা যেকোনো বিলাসবহুল হোটেলকে হার মানায়।
৩. উচ্চতাজনিত সাবধানতা (AMS): ১৪ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে অক্সিজেনের ঘনত্ব বেশ কম। তাই সরাসরি মেরাকে না গিয়ে লেহতে অন্তত দুই দিন শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার (Acclimatization) সময় দেওয়া উচিত।
মেরাক কেবল কোনো একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি শহুরে কোলাহল, কৃত্রিমতা আর যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এক নিভৃত আশ্রয়। ক্যানভাসের মতো সাজানো এই শান্ত গ্রামটিতে বসে বিশাল হ্রদের দিকে তাকালে মনে হয় প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর। অ্যাডভেঞ্চার আর মানসিক শান্তির খোঁজে যারা ছুটে বেড়ান, তাদের জন্য মেরাক এক অনবদ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
0 Comments