জ্বলদর্চি

কার্তিক সাহু (প্রধান শিক্ষক, চিত্রশিল্পী, কোলাঘাট) ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২৫

কার্তিক সাহু (প্রধান শিক্ষক, চিত্রশিল্পী, কোলাঘাট) 

ভাস্করব্রত পতি
বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের জন্য কিউ আর কোডে অ্যাটেন্ডেন্স নেওয়ার কাজ করছেন কার্তিক সাহু

জাতীয় সড়ক কিংবা রাজ্য সড়ক যেদিক দিয়েই যাওয়া হোক না কেন, রাণীচক বেনীমাধব প্রাথমিক বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ভেতরে। প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে অবস্থান। তা সত্ত্বেও নিজের হাতে বিদ্যালয়ের যাবতীয় ভোল বদলে দিতে পেরেছেন। এলাকার মানুষের প্রশংসা কুড়িয়ে চলেছেন ধারাবাহিকভাবে। তিনি চেয়েছেন এলাকার উন্নয়ন। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। আর তাই প্রথমেই নজর দেন বিদ্যালয়ের যাবতীয় পরিকাঠামোর উন্নয়নে। এতেই মানোন্নয়ন ঘটবে স্নেহের ছাত্র ছাত্রীদের। তাই এলাকার সকল মানুষজনকে সামিল করে বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতি সাধনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন নিজের হৃদয়ের বাষ্পচাপ অনুভব এবং অনুধাবনের মাধ্যমে। 
রাণীচক বেনিমাধব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত ফুড ফেস্টিভ্যাল

তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক সদ্য 'বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬' প্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক কার্তিক সাহু। শিক্ষকতা করেন প্রত্যন্ত গ্রামের এই রাণীচক বেনীমাধব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখানে তিনি 'চাকরি' করেননা। এখানে তিনি নিজের 'সামাজিক দায়িত্ব' পালন করেন। কর্তব্যবোধের যথার্থ রূপায়ণ করেন। মনে 'সাধ' অনেক। কিন্তু 'সাধ্য' সীমিত। সেই সাধ ও সাধ্যের মধ্যেকার দোলাচলতা তাঁর কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কখনও। তিনি অবিচল থেকেছেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অবিচ্ছেদ্যভাবে  সম্পাদনা করছেন তাঁর শিক্ষক জীবন। 
হাতের কাজ

সেই ২০০২ এর ১৩ ই ফেব্রুয়ারি থেকে এখানেই শুরু তাঁর নিবিড় কর্মজীবন। কচিকাঁচাদের সাথে আত্মিক আলিঙ্গন। শিক্ষকতা পেশার সাথে গভীর মেলবন্ধন। অবশেষে এখানেই গত ২০২৩ এর ১০ ই অক্টোবর থেকে পাকাপাকিভাবে প্রধানশিক্ষক পদে আসীন হয়েছেন। ২০২৬ এর ৫ ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালন অনুষ্ঠানের মঞ্চে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন সেরা শিক্ষকের সম্মাননা। যদিও 'বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান' বাবদ প্রাপ্ত এই পুরস্কারের অর্থ বিদ্যালয়ের উন্নয়নেই খরচ করবেন তিনি। 

১৯৭৭ এর ১৫ ই মে পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট থানার দেড়িয়াচক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কার্তিক সাহু। বাবা গোষ্ঠবিহারী সাহুও ছিলেন পেশায় একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর মা রঙ্গদেবী সাহু ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। শিক্ষক পরিবারের সন্তান হয়ে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন ভবিষ্যৎ জীবনের চলার পথ হিসেবে। আর তাই মনের কোনে জমে থাকা সবুজ রঙের ভাবনার সাথে নিত্যনতুন পরিকল্পনা মিশিয়ে নিজের বিদ্যালয়কে তৈরি করেছেন স্বপ্নের বিদ্যালয় হিসেবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সম্মানিত করে তাঁর কৃতিত্বকে উচ্চস্থানে স্থাপিত করল বলা চলে। 

এই বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক স্মার্ট ক্লাস। অডিও সিস্টেম চালু করেছেন পাঠদান কর্মসূচিকে আরও গতিশীল করার জন্য। স্মার্ট ক্লাসের মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রীদের বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠদান করান বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারা। বর্তমান সময়ে যে শুধু নাকে মুখে বই গুঁজে পাঠদান প্রক্রিয়া আর চলছে না, সেই 'মেটামরফোসিস'টা ধরতে পেরেছে সরকার। শিক্ষা দপ্তর। পড়ার বইয়ের পাশাপাশি দৃশ্য শ্রাব্য মাধ্যমেও পাঠদানের যৌক্তিকতা আজ সর্বজনস্বীকৃত। শিক্ষা দপ্তরের দেখানো সেই পথ বেয়ে প্রধান শিক্ষক কার্তিক সাহুও তার যথার্থ বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন ছাত্র ছাত্রীদের স্বার্থে। 

বিদ্যালয়ের মধ্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলির জন্য তাঁকে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিয়েছে বলা চলে। স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য 'কিউ আর কোড অ্যাটেন্ডেন্স সিস্টেম' এতদঞ্চলে তো বটেই, সমগ্র জেলাতেও বিরল। প্রতি মাসে ছাত্র ছাত্রীদের জন্মদিন পালন করা হয় বিদ্যালয়ের মধ্যেই। মাথায় জন্মদিনের টুপি পরে, 'Happy Birthday' ফেস্টুন টাঙিয়ে এক অভিনব পরিবেশে জন্মদিন পালন। বাড়ির মধ্যে বাবা মা আত্মীয় স্বজনদের 'ফিলিংস' মেলে বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে। 

বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার মায়েদের নিয়ে 'গল্প পাঠের আসর' বসান নিয়মিত। ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বিদ্যালয়ের অন্দরেই আয়োজন করা হয় খাদ্য উৎসব (Food Festival)। বিদ্যালয়ের কৃতি প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বই দিবস পালন করা এক অন্য ধরনের পরিকল্পনা। আসলে বইমুখো করতে চেয়েছেন সকলকে। বিদ্যালয়ের মধ্যেই গঠন করা হয়েছে একটি সাংস্কৃতিক দল। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গঠিত এই সাংস্কৃতিক দলের অনুষ্ঠানের চাহিদা তুঙ্গে বিদ্যালয় পরিসরের বাইরেও। এ এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ এবং নিদর্শন। 
কার্তিক সাহু

যখন করোনা পিরিয়ড চলছিল, তখন শিশুদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি বেড়ে গিয়েছিল খুব। একদিকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার ঝামেলা নেই। আর ঘরের বাইরে পা দেওয়ার ঝক্কিও ছিল না তখন। ফলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি বেড়ে গিয়েছিল খুব। এমতবস্থায় শিশু কিশোরদের থেকে মোবাইল আসক্তি দূর করতে দেড় শতাধিক পরিবারের শিশুদের হাতে রঙিন গল্পের বই ও শিশুদের উপযোগী খাদ্য বিতরণ করেছেন নিজের উদ্যোগে। নিজেই এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছেন বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে। স্বাস্থ্য রক্ষায় বিদ্যালয়ের মধ্যে পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা গঠন করেছেন। আর ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞান সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জল অপচয়, খাদ্য অপচয়, প্লাস্টিক থার্মোকল দূষণ ও তার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিদ্যালয় এলাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচারাভিযান চালান একজন যথার্থ সামাজিক কর্মী হিসেবে। সেইসাথে নির্মল পরিবেশের বার্তা নিয়ে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ করা ও গাছের চারা বিতরণের কর্মসূচি লেগেই থাকে বিদ্যালয়ে। বন্যা দুর্গতের পাশেও থেকেছেন নিয়মিত।
বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬ প্রাপ্ত ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া সাথে

উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা 'ওভারল্যাণ্ড' কাগজে নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হত। সেই শুরু। আজও বহু অগ্রগন্য দৈনিক কাগজের পাতায় সমাজকল্যাণমূলক লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় তাঁর। কার্তিক সাহুর সম্পাদনাতে প্রকাশিত হয় 'সেঁজুতি'; 'মুকুর' এবং 'উত্তরণ' পত্রিকা। 'কর্মশীল গবেষণা'পত্র প্রকাশ করেছেন। আকাশবাণী 'কলকাতা-ক', 'বিবিধ ভারতী' ও 'এফ-এম' এর নিয়মিত পত্রলেখক। রেডিও থেকে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে থিম সং রচনা করেছেন। সেগুলির মধ্যে 'আমার গ্রাম, আমার প্রাণ', 'এই মাটি এই বাতাস', 'উচ্ছল উজ্জ্বল শতবর্ষ' ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর এই শিক্ষকের হাতের আল্পনার কাজ তো চোখের এবং মনের আরাম। একাধারে শিক্ষক, অন্যদিকে একজন বিশ্রামহীন সাংস্কৃতিক কর্মী হয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন বিদ্যালয়ে ও বিদ্যালয়ের বাইরে। 

চিত্রশিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন মেদিনীপুরের এই মানুষ রতনটি। সুন্দর হস্তাক্ষর আর সুচারু অঙ্কন দক্ষতা তাঁর অনন্য কৃতিত্ব। অপূর্ব হাতের লেখার জন্য ভূতপূর্ব রাজ্যপাল পোপালকৃষ্ণ গান্ধী প্রশংসাসূচক পত্র দিয়েছিলেন কার্তিক সাহুকে। সর্বশিক্ষা অভিযানের ব্যবস্থাপনায় কর্মশীল গবেষণায় শুভেচ্ছাপত্রও পেয়েছেন তৎকালীন রাজ্যপাল এম কে নারায়ননের কাছ থেকে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম কোচিং স্টাফ দয়ানন্দ গরানিও প্রশংসা করেছেন কার্তিক সাহুর কাজের। 

তিনি মানেন, সুস্থ সমাজ গঠন ও শিশুদের দৈহিক, মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে নানান ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের গুরুত্ব। এগুলিই পারে যথার্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে। তাই তিনি এসব নিয়মিত করে চলেছেন পাঠদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্পাদক হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি জিইয়ে রেখেছেন তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনা সমৃদ্ধ মননকে, তাঁর দিগন্ত বিস্তৃত প্রসারিত হৃদয়কে এবং তাঁর অন্তরের অন্তস্থল থেকে উৎসারিত শিক্ষার পললভূমিকে। এই কাজ তিনি সফল শিক্ষক।
বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬ গ্রহণ করছেন কার্তিক সাহু। রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন।

উৎসব অনুষ্ঠানে থিম নির্ভর মন্ডপ নির্মাণ করেছেন বেশ কয়েকটি। তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত রবীন্দ্রনাথের 'সহজপাঠ', 'আদিবাসীদের অঙ্গন, 'দ্বিশতবর্ষে বিদ্যাসাগর, ভাষা শহিদ দিবসে 'ভাষা ভালবাসা', সুকুমার রায়ের প্রয়াণ শতবর্ষে 'আবোল তাবোল, স্বাধীনতা আন্দোলনের ৭৫ বছরে 'কারার ঐ লৌহ কপাট', শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম সার্ধশতবর্ষে 'সমাজশিল্পী শরৎচন্দ্র' ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম শতবর্ষে 'কত চিঠি লেখে লোকে' শীর্ষক মন্ডপসজ্জা এলাকায় প্রশংসিত হয়েছে বারবার। কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য বিচারক সমাপ্তি চ্যাটার্জী তাঁর মন্ডপ দেখে কলকাতায় তাঁর চেম্বারে ডেকে পুরস্কৃত করেন। যা তাঁর কাছে এক অনাস্বাদিত অনুভূতি। 

কলকাতার বেশকিছু যাত্রাদলের যাত্রার নাম ক্যালিগ্রাফি করেছেন নিজস্ব উদ্ভাবনী দক্ষতায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোগো ডিজাইন করেছেন আঙুলের কারসাজিতে। এগুলো করতে ভালোবাসেন। এগুলো সহজাত প্রবৃত্তি। বিদ্যালয়ে এবং বিদ্যালয়ের বাইরে -- তাঁর এই সৃজনশীল ভাবনার ছাপ চমকিত করে। তিনি তাঁর নিজের কর্মগুনে হয়ে উঠেছেন অনন্য। হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা। একজন শিক্ষকের কাজই তো তাই। তাতে তিনি সফল।
🍂

Post a Comment

0 Comments