জ্বলদর্চি

নারী শক্তির আদিরূপ দেবী বিন্ধ্যবাসিনী/পুষ্প সাঁতরা


নারী শক্তির আদিরূপ দেবী বিন্ধ্যবাসিনী
                               
পুষ্প সাঁতরা

অরণ্যচারিনী সাধারন রমনী তাঁর নাম মায়া। এই মায়ারূপী রমনী কে? এই রমনীই  শক্তির আদিরূপ দেবী বিন্ধ্যবাসিনী  ।কংসের দরবার সভা-- সেখানে এক রমনীকে ধরে  আনা হয়েছে।তাকে দেখতে কালো রঙে মোড়া মজবুত  শরীর , তাতে উজ্জ্বল আভা, মহা শক্তিমান তাঁকে সৃষ্টিকরেছেন এক নিখুঁত নারী হিসাবে; ঈশ্বর কি  আর না ভেবে সৃষ্টি করেছেন! শরীর যেন পাহাড় কেটে তৈরী, তার চোখে বিদ্যুৎ ।রাজা কংস অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন ,এই তো সেই রমনী! তাঁরই বোনের মেয়ে যোগমায়া! একজন গূঢ়পুরুষ পাশে 
এসে বললেন,'এই মেয়েটি শুনেছি  অস্ত্রবিদ্যায় অসাধারণ পারদর্শী ,তীর, ধনুক, বর্শা ,গদা, খড়্গ, পাশ,বজ্র,আর চক্র এই আটরকম শস্ত্র ,এমন নিপুন ভাবে চালায়যেন তাঁর আটটি হাত লাগান রয়েছে।কানে কানে গুপ্তচরটি আরও জানায় -- এই যোগমায়া মথুরা রাজ্যের শেষ সীমানায় গ্রামে জঙ্গলে, যে সব অনার্য জাতি বাস করে, তাদের সঙ্গেই বেশী ঘুরে বেড়ায়।ওর সঙ্গে থাকে দেবদ্রোহীরা --- তাদের একজনের নাম সহস্রাক্ষ ,একেবারে পরিচিত রাজদ্রোহী
গুপ্ত চরদের প্রধান ।সিংহবাহু উঠে দাঁড়িয়ে বলল,'সহস্রাক্ষ কে ধরেছি,কিন্ত আপনার আত্মীয় বসুদেব ও দেবকীর কন্যা, যোগমায়ার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হল ,সে সকলের সামনে আপনার বিরুদ্ধেই কথা বলছে। আপনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে,
সবচেয়ে বড় কথা,তীর আর ভল্ল চালিয়ে একাই চারটি সৈন্য হত্যা করেছে। রাজা কংস শুনে রাগে গর্জন করে ওঠে'--এ রাজদ্রোহীর কোন ক্ষমা নেই! আমার আত্মীয় হলেও কোন ক্ষমা পাবে না। ওর কোন মুক্তি নেই। মৃত্যু অবধারিত আমি ওকে নিজ হাতে হত্যা করব '। এ কথা শুনে যোগমায়া এবার দুরন্ত রাগে চিৎকার করে বলে ওঠে 'এই কংস এক নরকের কীট শুনুন সভাসদগন 'কত নারীর সম্ভ্রম লুট করেছে,কত নিরীহ সন্তান কে হত্যা করেছে' সভায় সবাই এ কথা  শুনে তো অবাক! কংস দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, '---  সব মিথ্যে ! সব বিরোধীরা তো মিথ্যে কথাই বলে।'ওদের নিয়ে যাও বধ্য ভূমিতে---। আমি নিজের হাতে মৃত্যু দন্ড দেবো।'
কংসরাজার বধ্যভূমিতে চারদিকে পাথরের দেওয়াল।সবাইকে বধ্য ভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে--এবার কি উপায়ে বেরোবে,যোগমায়া! উপায় খোঁজে।কোমর ও বক্ষ বন্ধনীতে লুকিয়ে এনেছিল তীক্ষ্ণ ছুরি।মায়ার সঙ্গীরা  প্রস্তুত ছিলই; রাজা কংস মায়ার কাছে এসে 
হাত বাড়ালেন,মায়া তৎক্ষনাৎ কংসকে পাক খাইয়ে বেদিতে ছিটকে ফেলে দিলেন।বধ্য ভূমির দেওয়ালে উঠে দেবীর মত বলে ওঠে--  ' নিষ্ঠুর কংস তোমারে বধিবে যে ,বিজনে বাড়িছে সে! সিংহবাহু তোমার মুক্তি নেই!হঠাৎ তীক্ষ্ণ ছুরি এসে কংসের বুকে বিঁধল,তারপর মায়া 
হলেন অদৃশ্য! কংসের হাত থেকে বাঁচাতে ,কৃষ্ণ কে আনা হয়েছিল বৃন্দাবনে আর কারাগারে দেবকীর কোলে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছিল যোগমায়াকে।এ ঘটনা নন্দ জানে, কিন্তু যশোদা জানেন না।তাই নন্দ মহারাজ মায়াকে তাঁর বাড়িতে দেখে বললেন -'তুই চলে যা-- তোকে মেরে ফেলবে  কংস-'মায়া আবেগে ভালবাসায় 
কৃষ্ণ কে জড়িয়ে বলে,ভাই নিজেকে রক্ষা করিস!' এবার কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিন্ধ্য পর্বতে চলে এসে,সেখানে  অনার্য,শবর, পুলিন্দ  ভীল প্রভৃতি এরা খুব  দুর্ধর্ষ, এদের সঙ্গে নিয়েই  একটা দল গড়ে তুললেন।এখানে এসে মায়া নিজেকে মুক্ত মনে করে,নিজের আধিপত্য বিস্তার করে। মায়াকে সবাই দেবীর মত ভক্তি করে। মায়ার নতুন নামকরণ হয় বিন্ধ্য পর্বতের কন্যা বিন্ধ্যবাসিনী।এ ভাবেই মা বিন্ধ্যবাসিনী 
দেবীর উদ্ভব।বিন্ধ্যাচলের এক অনার্য নারী সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে অত্যাচারিত মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ,শাসকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল।এই রমনীকে সবাই মা বলে ডাকতে শুরু করে।অনুভূতির তীব্রতার সঙ্গে এই রমনীর পূর্ণ মহিমা না মিশলে মা ডাকটি খাঁটি হতে পারে না।এই দেবীর নাম কালিকা পুরাণে বর্নিত আছে।আবার কেউ বলেন চন্ডঘন্টা নামক যোগিনীই বিন্ধ্যবাসিনী নামে খ্যাত। 
🍂
এ কাহিনি মারকেন্ডেয় পুরাণেও বর্ণিত আছে।
আসলে বিন্ধ্যবাসিনী অনার্য দেবী! মারকে- ন্ডেয় পুরাণে দেবী বিন্ধ্যবাসিনী  বলেছেন ,'শুম্ভ- নিশুম্ভ দৈত্যরা  আবার জন্মাবে ,আমি তখন বিন্ধ্য বাসিনী নাম নিয়ে যশোদার গর্ভে জন্মাব এবং ওদের ধ্বংস করব।এ এক আশ্চর্য ঘটনা! এক অনার্য প্রতিবাদী, শক্তিধর অসামান্য রক্তমাংসের রমনী হয়ে দেবী পূজা  পাচ্ছেন কি করে? বড় বিস্ময়! অরণ্যবাসিনী দেবী যোগমায়া বাংলার কৃষক ও গোপ সমাজের কাছে একদা নিজের ভয়ংকরত্ব বিসর্জন দিয়ে স্নিগ্ধা ,ঘনরসময়ী এক কৃষি দেবীতে রূপান্তরিত হন।হিন্দু পুরাণে  দেবী দুর্গার বিশেষ রূপ! উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলায় গঙ্গা নদীর তীরে বিন্ধ্য বাসিনীর মন্দির এবং ত্রিকোন তীর্থ ভূমি।
দর্শনে মহাপূন্য হয়,এ বিশ্বাস!এই দেবীর পুজা পশ্চিম বাংলায় অনুষ্ঠিত হয়।মেদিনীপুর, হাওড়া,নদীয়া তে।গ্রাম বাংলায় বরোজ পুজাতেও এই বিন্ধ্য বাসিনী দেবীর পুজা করা হয়।জয় মা বিন্ধ্য বাসিনী!

Post a Comment

0 Comments