ঈগল পাখির কান্না
ফিলিপাইন (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
(ফিলিপাইনে ‘ইগোরোট’ নামে উপজাতির বাস আছে। তাদেরই একটা লোককথা এটি। গল্পটা একটু কষ্টের। তাই, গল্পটাকে ছোটদের উপযোগী করে, সাজিয়ে দেওয়া হোল।)
এক গ্রামে দুই ভাই থাকত। আর থাকত তাদের সৎ মা। বাবা বণিকদের জাহাজে কাজ করে। দূর দূর দেশে চলে যায় সমুদ্রে ভেসে। মায়ের হেফাজতে রেখে গিয়েছে ছেলেদুটোকে। তাদের মা রোজ তাদের বনে পাঠাত কাঠ আনতে। সকালে যাওয়ার সময় সামান্য খাবার দিত তাদের। সে খাবারগুলো আবার যেমন খুব খারাপ, পরিমাণেও খুব কম।
উলটে তাদের ম আরও বলত —"কাল তোমরা যে কাঠ এনেছিলে, সেটা খুব খারাপ ছিল। তাই আজ তোমাদের বেশি খেতে দেব না।"
ছেলে দুটো মাকে খুশি করার জন্য খুব চেষ্টা করত। ভালো কাঠ আনলেও, মা বকাবকি করত। কোন দিন হয়ত বড় আর শুকনো নলখাগড়া আনল। সেদিন বলত —"এগুলো আমার উনুনের জন্য ভালো না। অনেক ছাই হয় এতে।"
ছেলে দুটো যতই চেষ্টা করুক, মা কিছুতেই খুশি হতো না। সারাদিন খেটে আর কম খেয়ে খেয়ে, ছেলে দুটো খুব রোগা হয়ে গেল। এক সকালে মা তাদের একটু কুকুরের মাংস খেতে দিল। ছেলে দুটোর খুব মন খারাপ হলো।
সেদিনও তারা বনে গিয়েছে। বনে পৌঁছে বড় ভাই ছোটকে বলল— "তুই এখানে দাঁড়া। আমি গাছে উঠে ডাল কাটছি।"
ছেলেটা গাছে উঠল। ওপর থেকে ডাকল, "ভাই, এই নে কিছু কাঠ।"
কিন্তু নীচে এসে যা পড়ল, সেটা আর কিছু নয়। ছেলেটার হাতের হাড়গুলো। ছোট ভাই চিৎকার করে বলল, "ওহ, দাদা! এটা তো তোর হাত!"
আবার ওপর থেকে আওয়াজ এলো, "ভাই, এই নে আরও কাঠ।"
এবার অন্য হাতের হাড় পড়ল নীচে। তারপর সে আবার ডাকল। একটা পায়ের হাড় পড়ল। তারপর আরেকটা পায়ের হাড়। এভাবে তার শরীরের সব হাড় মাটিতে পড়ে গেল। তখন ওপর থেকে ছেলেটা বলল, "এগুলো বাড়ি নিয়ে যা। আর ওই মহিলাকে বল, এই নাও তোমার কাঠ। তুমি তো কাঠ চাওনি। আমাদের হাড়ই চেয়েছিলে।"
ছোট ভাইয়ের খুব মন খারাপ হলো। ভয়ও হলো খুব। সে একা হয়ে গেল। পাহাড় থেকে একা কীভাবে নামবে, ভেবে পাচ্ছে না। অন্যদিন দুই ভাই থাকে। আজ সে একেবারে একা। এইসব ভাবছে, আর হাড়গুলো একসাথে জড়ো করে বেঁধে নিচ্ছে।
এমন সময় গাছের ওপর থেকে এক সাপ-ঈগল (খুব বড় মাপের ঈগল পাখি। সাপ ধরে খায়। এজন্য এদের সাপ-ঈগল বা Serpent Eagle বলা হয়।) ছোটকে ডেকে বলল —"ভাই, ভয় কীসের? আমি তোর সাথে যাব।"
ছোটর বুঝতে দেরি হোল না, তার দাদা ঈগল পাখি হয়ে গিয়েছে। ছেলেটা হাড়ের বোঝাটা কাঁধে নিল। আর সে যখন পাহাড় থেকে নামছে, তার দাদা, যে এখন সাপ-ঈগল হয়ে গেছে, তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলল।
বাড়ি পৌঁছে ছোটছেলে বোঝাটা নামিয়ে মাকে বলল —"এই নাও তোমার কাঠ।"
মা সেটা দেখে আঁতকে উঠেছে। খুব ভয় পেয়ে, ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। তখন সাপ-ঈগল তার মাথার ওপর গোল-গোল করে চক্কর কেটা উড়তে লাগল। আর, সেই সাথে ডাকতে লাগল —"কিউকোক! কিউকোক! কিউকোক! তোমার খাবার আমার আর দরকার নেই।"
0 Comments