বাবার জন্য
বিজয়লক্ষ্মী মুখার্জী
“ দোলের দিন, আজ নাইবা বেরোলি “।
“ তাড়াতাড়িই ফিরবো ”!
ট্যাক্সি চালাতে চালাতে মিঠু ভাবছিলো, এইজন্যই মা বারণ করছিল , না বেরোলে ওকে এত ঝামেলায় পড়তে হত না। হাতঘড়িতে রাত বারোটা কুড়ি ,স্পীড বাড়ায় মিঠু।
দুপুর তিনটে নাগাদ ট্যাক্সি বার করেছিল ও , উপায়ই বা কি ? এখনও সার্ভিসিঙের টাকা পাবে কমল কাকু । মিঠুর মুখটা কঠিন হয় , ট্যাক্সিটা বাবার । দুবছর আগে, বাবার হঠাৎ হার্ট এ্যাটাক হলো মাঝরাতে ,বাড়িতে গাড়ি বসানো, মিঠুরা এ’পাড়ায় তখন নতুন । একমাত্র পরিচিত কমল কাকুরা পুরী গেছেন। এ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় নি, প্রতিবেশিদের দরজা ধাক্কা দিয়েছিল, আত্মীয়দের ফোন করেছিল, কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। বাবাকে হাসপাতালে নিতে পারেনি, রাতেই সব শেষ। মা আছড়ে পড়ে কেঁদেছিলো, কিন্তু মিঠু একফোঁটা কাঁদেনি। তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে । সাহায্য করার ভয়ে আত্মীয়রা মাড়াতো না ওদের বাড়ি। মিঠু বুঝেছিল, বিপদের সময়ে কেউ কারও নয়। বাবার ওপর খুব অভিমান মিঠুর, ওদের একা করে চলে গেছেন, সেদিন থেকে ও আর একটুও কাঁদে না।
🍂
বাবার বন্ধু কমল কাকুর কাছেই ড্রাইভিং শিখেছে । মায়ের আপত্তি ছিলো মেয়ের ট্যাক্সি চালানোয়। মিঠু শোনেনি। যারা তখন আলোচনা করেছিল এখন তারাই দরকারে ডেকে পাঠায়। মিঠু জানে, মা চিন্তায় ঘরবার করছে , এদিকে তাড়াহুড়োতে আজ মোবাইলটাও বাড়িতে ফেলে এসেছে ।
হাজরা মোড়ের এ্যাক্সিডেন্টটার জন্যই, নাহলে ও এতক্ষণে বাড়ি ঢুকে যেত ! ছেলেটা ড্রাঙ্ক ছিল, বাইক স্কিড করে, ছিটকে পড়েছিল রাস্তার ওপর। মিঠু তখন পাশের রাস্তায় , ইউ টার্ন নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল স্পটে । ছেলেটাকে হাসপাতালে দিয়ে বাড়ি ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে গেল। বাবার বয়সী পুলিশ অফিসার,ওর নাম, ঠিকানা, ফোন নং লিখে নিয়ে ওকে ছেড়ে দিয়েছেন, নাহলে আরো দেরি হতো।
মা দরজাতেই দাঁড়িয়েছিলেন , মুখ গম্ভীর, মিঠু কাঁচুমাচু মুখে বলে,
“ একটু দেরি হয়ে গেল মা “।
"খাবি আয়, " ,
মিঠু জানে মাও খায়নি,
" বাড়ো, আসছি, " হাতমুখ ধুতে ধুতেই টেবিলে পড়ে থাকা ওর মোবাইলটা বেজে ওঠে,
“ হ্যালো”!
ওপাশে ভারি গলা , বয়স্ক পুলিশ অফিসারটির,
" বাড়ি পৌঁছে গেছো ? আমি জানিয়ে দিয়েছিলাম "!
0 Comments