অণুগল্প
ছন্দপতনশ্রীময়ী চক্রবর্তী
ভারতবিখ্যাত এক সঙ্গীতশিল্পীর সাক্ষাৎকার সরাসরি দেখানো হবে রাজ্যের প্রথম সারির সংবাদপত্রের ইউটিউব মাধ্যমে।আজকাল সমাজমাধ্যমে তারকাদের উপস্থিতি প্রবলভাবে পরিলক্ষিত –পঞ্চাশোর্ধ্ব এই বঙ্গললনা কাজের বাইরে নিজেকে সযত্নে রেখেছিলেন অন্তরালে।অনুরাগীদের উত্তেজনার পারদ তাই তুঙ্গে। তিনবছর ধরে আমার প্রাত্যহিক রুটিন ইংরেজি, রিজনিং ,অঙ্ক, সাধারণ জ্ঞান আর কম্পিউটারের বেসিকের মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নোত্তর ক্ষিপ্রতা আর নৈপুণ্যের সাথে করে যাওয়া। প্রিলিমিনারি,মেইন,কিছু সময় সাথে ইন্টারভিউ- সব হার্ডল পেরিয়ে একটি সরকারি চাকরি চাই।এক বছর আগে শূন্য দশমিক এক নম্বরের জন্য একটি ব্যাঙ্কে প্রোবেশনারি অফিসার হতে পারলাম না।দু’মাস আগে চূড়ান্ত উদ্বেগের মধ্যে কেরানির চাকরির প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সিলি মিসটেক করলাম।এমন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে যার দরবারি কানাড়া মনে বিছিয়ে দেয় শীতলপাটি, যার প্লেব্যাকের জাদুমাখানো কথা শুনে প্রতারক প্রেমিকের জন্যও জাগে মায়া, তাঁর মুখে শুনব তাঁরই কথা! চাকরির প্রস্তুতির জন্য স্ব-আরোপিত নিয়ম আজ ভ্যানিশ।তিনি এলেন ময়ূরকন্ঠী রং-এর জামদানি শাড়ি পরে।
কানে বড় বেশি রকমের লম্বা দুল,বাম হাতে ট্যাটু।কথোপকথন শুরু হল।সংগীতজীবনের প্রথম গুরু প্রথিতযশা শিল্পী বাবা-মা।পড়াশোনায় ভাল ছিলেন না বলে বাড়িতে আক্ষেপ ছিল না। কৈশোরকালেই বিদেশে একক অনুষ্ঠানের সুযোগ পান,তারপর শুধুই সাফল্য।এরপর এল দেশ বিদেশে অনলাইন,অফলাইন মিলিয়ে নিজের গান শেখানোর স্কুলের কুড়িটি শাখার কথা।সেসবের খুঁটিনাটির দায়িত্বে মাস মাইনে দেওয়া লোক আছে, তিনি শুধু গান শিখিয়েই খালাস। অতগুলো শাখার শিক্ষার্থীদের কেউই নামজাদা গায়ক-গায়িকা নয়।তিনি তো হাতে ধরে কাউকে স্টেজে উঠিয়ে দিতে পারেন না, তার জন্য চাই নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সততা। সবাই তো পড়াশোনা, চাকরি পাওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত।নিজের একমাত্র পুত্রসন্তানটি মাঝেমধ্যে বায়না করে স্টেজে পারফর্ম করে ফেলে আর সমাজমাধ্যম সেসব ছবিতে ভরিয়ে দেয়। ওসব হালকাভাবেই নেন।এই পথে কত বাঁক, ঐ অফিসের কেরানি বা অফিসারের গতানুগতিক চাকরি নাকি! সঙ্গে সঙ্গে চওড়া হেসে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বললেন – “নো অফেন্স টু চাকরিজীবী।” আমার মাথাটা অদ্ভুতভাবে দপদপ করছে। মোবাইলটা বন্ধ করে ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজের কুড়ি মিনিটে চল্লিশটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটা মক পেপার শুরু করলাম।
0 Comments