বিশ্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২০ই সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দিবস। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কি এবং বাস্তব জীবনে এটির গুরুত্ব কি? আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
পরিচ্ছন্ন পৃথিবীর অঙ্গীকার, পরিচ্ছন্নতা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি সুস্থ জীবন, সুন্দর পরিবেশ এবং সচেতন সমাজের অন্যতম ভিত্তি। একটি পরিষ্কার রাস্তা, পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়, আবর্জনামুক্ত পাড়া কিংবা নির্মল জলাশয় আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন স্বস্তিদায়ক করে, তেমনি রোগবালাই ও পরিবেশদূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপলব্ধিকে মানুষের মধ্যে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতা-সচেতনতা কর্মসূচি পালিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিবস মানুষকে নিজের ঘর থেকে শুরু করে বৃহত্তর সমাজ ও পৃথিবীকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্তমান পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, অতিরিক্ত ভোগ এবং প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার বর্জ্য সমস্যাকে ক্রমেই জটিল করে তুলেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আবর্জনা তৈরি হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ বা পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় রাস্তা, নর্দমা, নদী ও জলাশয়ে জমা হচ্ছে। প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে মাটি ও জল দূষিত করে। বৃষ্টির সময় নর্দমা ও নালা আবর্জনায় আটকে গেলে জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হয়। ফলে, পরিচ্ছন্নতা এখন শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে জীবাণু ও রোগবাহী পোকামাকড়ের বিস্তার সহজ হয়। জমে থাকা নোংরা জল মশার বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। দূষিত জল ও অপরিষ্কার খাদ্য নানা রোগের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে পরিষ্কার বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মস্থল ও জনপরিসর মানুষের সুস্থতা এবং মানসিক স্বস্তি বাড়ায়। তাই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা জরুরি।
তবে, পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব শুধু পৌরসভা, সরকার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রত্যেক নাগরিকেরও নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা, ভেজা ও শুকনো বর্জ্য আলাদা রাখা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং সম্ভব হলে জিনিস পুনর্ব্যবহার করা,এসব সাধারণ অভ্যাসের মাধ্যমে প্রত্যেকে পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠনে অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান। শিক্ষার্থীরা যদি নিজের শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখে এবং অন্যদেরও সচেতন করে, তাহলে তার প্রভাব পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিচ্ছন্নতা নিয়ে পোস্টার তৈরি, আলোচনা, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং স্থানীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মতো উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করতে পারে। পরিচ্ছন্ন পৃথিবী গড়তে প্রযুক্তি ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করা দরকার। কাগজ, ধাতু, কাচ ও কিছু ধরনের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা যায়। রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করা সম্ভব। এভাবে বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপও হ্রাস করা যায়। একই সঙ্গে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
পরিচ্ছন্নতা অভিযান যেন, শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দিন ঝাড়ু দেওয়া বা কয়েক ঘণ্টার প্রচার চালানোর চেয়ে প্রতিদিনের ছোট, ছোট অভ্যাস অনেক বেশি কার্যকর। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি বাড়ির বাইরে আবর্জনা না ফেলা, জনসাধারণের সম্পত্তি নোংরা না করা এবং অন্যের পরিচ্ছন্নতার প্রচেষ্টাকে সম্মান করা,এসবই প্রকৃত নাগরিক দায়িত্বের পরিচয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান করেন। তাঁদের কাজকে সম্মান করা এবং বর্জ্য নির্দিষ্ট নিয়মে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। একই সঙ্গে তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও সমাজের দায়িত্ব। বিশ্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিবস তাই কেবল ময়লা পরিষ্কার করার আহ্বান নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেরও বার্তা। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আমাদের প্রত্যেকের অধিকার, আবার সেটিকে রক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। আজ আমরা যদি একটি প্লাস্টিকের বোতল রাস্তায় না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলি, একটি গাছের চারপাশ পরিষ্কার রাখি, কিংবা অন্য একজনকে আবর্জনা না ফেলার জন্য সচেতন করি, তাহলেই বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। একটি পরিচ্ছন্ন পৃথিবী কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে। তাই এই দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক “শুধু আজ নয়, প্রতিদিন, শুধু নিজের ঘর নয়, চারপাশও পরিষ্কার রাখব।” আমাদের ছোট, ছোট সচেতন পদক্ষেপই একদিন একটি সুস্থ, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পৃথিবীর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
🍂
0 Comments