সুপ্রতীম মান্না ('শিক্ষারত্ন'প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, রাজ্য প্রশিক্ষক, হাউর, পূর্ব মেদিনীপুর)
ভাস্করব্রত পতি
শিক্ষা কেবল শ্রেণীকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে বইয়ের পাতা মুখস্থ করানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক, বৌদ্ধিক, সামাজিক এবং নৈতিক বিকাশ ঘটানোর এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রধান শিক্ষক সুপ্রতীম মান্নার কথায়, শিক্ষক হিসেবে আমার লক্ষ্যই হলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করা। আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিনব শিক্ষাদান পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও আনন্দময় করে তোলা। বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত রূপান্তর ঘটানো এবং সমগ্র সমাজকে শিক্ষার এই মহাযজ্ঞে যুক্ত করা।
ছাত্রস্বার্থে, শিক্ষার্থীস্বার্থে তাঁর অনমনীয় ভাবনা এবং কর্মসূচি পালনের দৃষ্টান্ত এতদঞ্চলে সত্যিই প্রণিধানযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর কাজের মূল্যায়ন করেছে। তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁর কাজের মর্যাদা দিয়েছে। তাই ঘোষপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুপ্রতীম মান্নাকে দেওয়া হয়েছে 'শিক্ষারত্ন পুরস্কার' (২০২৫)। তাঁর কাজ, তাঁর ডেডিকেশন, তাঁর তিতীক্ষা তাঁকে অনুকরণীয় করেছে শিক্ষককূলের কাছে। শিক্ষাজগতে তাঁর ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি। সত্যিকারের মেদিনীপুরের মানুষ রতন হিসেবে মনে রাখবে জেলাবাসী।
ছাত্র ছাত্রীদের সাথে প্রধান শিক্ষক
১৯৭৯ এর ১৯ শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রশান্ত কুমার মান্না এবং মা কমলা মান্না দুজনেই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে পারিবারিকভাবে শিক্ষাজগতের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাঙ্গনে জড়িয়ে থাকতে থাকতে মনপ্রাণ সঁপে দিতে পেরেছেন শিক্ষার আলোয় বিকশিত করার নিবিড় ঘেরাটোপে।
ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী ও বি এড ডিগ্রি অর্জন করে বিদ্যালয় শিক্ষকতায় যুক্ত হন। ২০১৪ এর ১ লা আগস্ট থেকে ঘোষপুর হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে আসীন। একসময় যে স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন শিক্ষক শিক্ষিকাদের স্নেহবর্ষণ ভোগ করতেন, আজ সেই ছোটবেলার স্কুলে নিজেই প্রধান শিক্ষক হয়ে বর্তমান ছাত্র ছাত্রীদের স্নেহ বিতরণে কার্পণ্য করছেন না মোটেও। বরং আরও বেশিমাত্রায় মেশার চেষ্টা করছেন ছেলে মেয়েদের সঙ্গে। যা একজন যথার্থ শিক্ষকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বিদ্যালয় এখন তাঁর নিজের পরিবারের সমতুল্য হয়ে উঠেছে।
শিক্ষারত্ন সম্মাননা গ্রহণ করছেন
২০০২ সালের ২৬ শে জুন একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ। প্রথমে মল্লিকচক অমর স্মৃতি বিদ্যাপীঠে সহকারী শিক্ষক হিসেবে ৫ বছর ২ মাস শিক্ষকতার পর জঁফলা আদর্শ বিদ্যায়তনে সহকারী শিক্ষক পদ ৬ বছর ১০ মাস শিক্ষকতা করেছেন। এরপর গত ২০১৪ এর ১ লা আগস্ট থেকে তিনি পাঁশকুড়া-১ ব্লকের হাউরের ঘোষপুর উচ্চ বিদ্যালয় (উচ্চ মাধ্যমিক)-এর প্রধান শিক্ষক পদে আসীন। এখানে এসেই বিদ্যালয়ের ভোল বদলে দেওয়ার চেষ্টার অন্ত নেই। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নিজের স্কুলকে আরও প্রাণীত করার কাজে তিনি সফল শিক্ষারত্ন।
গতানুগতিক শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য, সহজ সরল, বোধগম্য এবং আনন্দময় করতে বিদ্যালয়ে সকলকে নিয়ে বহু উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যা ছাত্র ছাত্রীদের কাছে অন্যতম পাওয়া। বিদ্যালয়ে প্রজেক্টর ও কম্পিউটারের সাহায্যে অডিও ভিস্যুয়াল ক্লাসের আয়োজন করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ এবং আগ্রহ বৃদ্ধি করে ও একঘেয়েমি দূর করে। আয়োজন করেছেন ডিজিটাল কন্টেন্ট ও স্মার্ট বোর্ডের ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জটিল বিষয়সমূহ সহজে বুঝতে সাহায্য করার আধুনিক প্রযুক্তি।
শুধু বাজার থেকে কেনা শিখন সামগ্রী নয়, বরং কম খরচে শিক্ষাসহায়ক উপকরণ তৈরি করে শিক্ষাদান বেশি সহায়ক হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের কাছে। সেই ধারনা থেকে তিনি গ্রামীণ এলাকার প্রাকৃতিক উপাদান যেমন—পাতা, ফুল, ফল এবং বাতিল সামগ্রী (যেমন কাগজের রোল, কার্টুন) ব্যবহার করে তথা Low Cost Teaching Material ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবভিত্তিক পাঠদান করানোর ব্যবস্থা করেছেন।
Joyful Learning Techniques বা আনন্দময় শিক্ষার কৌশলের মাধ্যমেই ছাত্র ছাত্রীদের প্রকৃত শিক্ষন কর্মসূচি তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। নিরস, শুষ্ক বিষয়গুলোকে গল্পের আকারে সাজিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার টেকনিকের পাশাপাশি নাটক, আবৃত্তি, সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টার অন্ত নেই তাঁর। এ কাজে তিনি সফল। এছাড়াও শিক্ষার বিষয়গুলোকে খেলার ছলে উপস্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষক সুপ্রতীম মান্নার উদ্যোগে স্থানীয় হাউর, ঘোষপুর সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অ্যাকশন রিসার্চ পরিচালনা করা হয়েছে। যার ফলে এই মুহূর্তে স্কুলছুট ছাত্র ছাত্রীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ড্রপ আউট কমানোর এই কৌশল এবং অ্যাকশন রিসার্চ (Action Research) এখানকার বিরাট বড় সাফল্য। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র ছাত্রীদের সাফল্য ও বেশ ঈর্ষনীয়।
সাধারণ বিদ্যালয় পরিচালনার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা বিভাগের একাধিক ডিজিটাল প্রশাসনিক উদ্যোগে স্টেকহোল্ডার ও রাজ্য রিসোর্স পার্সন (State Resource Person) হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম। একাজে তাঁর কর্মদক্ষতা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে গিয়ে রাজ্যব্যাপী তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাবিভাগের অধীনস্থ বিভিন্ন পোর্টাল ও সিস্টেমের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব চোখে পড়ার মতো। মূলতঃ শিক্ষক শিক্ষিকাদের e-Pension, i-OSMS এবং বাংলার শিক্ষা পোর্টালের কাজের ক্ষেত্রে তিনি সর্বাঙ্গসুন্দর। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবং অশিক্ষক কর্মচারীদের মাসিক বেতন প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে i-OSMS তথা Integrated Online Salary Management System এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনলাইন পেনশন আবেদন, পেনশন গণিকরণ ও দ্রুত পেনশন নিষ্পত্তির জন্য এই e-Pension পোর্টাল ব্যবহৃত হয়। এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের অনলাইন ভর্তি, ডিজিটাল পাঠ্যপুস্তক, রেজাল্ট ট্র্যাকিং এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক তথ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলার শিক্ষা পোর্টাল (Banglar Shiksha Portal) বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ী এলাকাতেও (GTA) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই প্রশিক্ষন সেশন পরিচালনা করেছেন সুপ্রতীম মান্না।
বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ প্রদান ও গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজ করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে। সরকারি উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা সদর দপ্তরে প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষিকা এবং শিক্ষা আধিকারিকদের জন্য ১৫০ টিরও বেশি ট্রেনিং সেশন পরিচালনা করেছেন নিজের দক্ষতায়। কলকাতার সল্টলেকে নেতাজী সুভাষ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (ATI) গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে যুক্ত। নবনিযুক্ত বিদ্যালয় পরিদর্শক (SI) এবং পশ্চিমবঙ্গ হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের (WBA&AS) আধিকারিকদের e-Pension ও iOSMS-এর উপরও সফলভাবে ইনডাকশন ও পোস্ট স্পেসিফিক ট্রেনিং প্রদানের কাজেও তাঁরই ডাক পড়ে।
ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে শিক্ষামূলক ভ্রমণে দীঘায়
ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি (NEP ২০২০) এর রূপরেখা অনুযায়ী বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য FLN নিশ্চিত করতে বিশেষ নজর দিয়েছেন। এই কাজের ক্ষেত্রেফোনিক প্রোগ্রাম ও রিডিং ওয়ার্কশপ তথা বর্ণমালা ও শব্দ উচ্চারণের সঠিক দক্ষতা বৃদ্ধি, Differentiated Instruction তথা প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত শেখার গতি ও চাহিদা অনুযায়ী আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ বিষয়ে যথাযথ নজর দেওয়ার কাজে তিনি সচেষ্ট।
এহেন মানুষটি অবলীলায় মিশতে পারেন সকলের সাথে। তাই রাস্তায় কচিকাঁচার দল তাঁকে জড়িয়ে ধরে আবদার করে চকোলেট খাওয়ানোর জন্য। ফুচকা খাওয়ানোর জন্য। আসলে সকলের সাথে আত্মিক সম্পর্ক জুড়েই কার্যসিদ্ধি সম্ভব। ভালো গানও করেন। ফলে ছাত্র ছাত্রীরাও উৎসাহিত হয় স্যারকে দেখে। সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন একজন শিক্ষকের এ ধরনের Public Relation দক্ষতাই পারে সফলতা আনতে। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে। তিনি তা পেরেছেন।
0 Comments