রতন কুমার গিরি
সপ্তদশ শতাব্দীর ফ্রান্স। রেনে দেকার্ত তখন তরুণ, সদ্য শেষ করেছেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ — লা ফ্লেশের জেসুইট কলেজ থেকে যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, গণিত সবকিছুতেই তিনি পারদর্শী। অথচ এই বিপুল শিক্ষার শেষে তাঁর মনে জন্ম নিল এক গভীর অতৃপ্তি। তিনি উপলব্ধি করলেন, তাঁকে যা কিছু শেখানো হয়েছে, তার প্রায় সবকিছুকেই প্রশ্ন করা সম্ভব। কোনো কিছুই ছিল না এমন দৃঢ়, এমন নিশ্চিত, যার ওপর দাঁড়িয়ে বাকি সব জ্ঞানের প্রাসাদ নির্মাণ করা যায়।
এই অতৃপ্তি থেকেই জন্ম নিল দর্শনের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এক পরিকল্পনা। দেকার্ত ঠিক করলেন, তিনি জ্ঞানের প্রতিটা স্তর ভেঙে ভেঙে একদম নিচে নেমে যাবেন — যতক্ষণ না তিনি খুঁজে পান এমন একটা ভিত্তি, যাকে আর কোনোভাবেই সন্দেহ করা সম্ভব নয়। আর সেই অবিচল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি নতুন করে গড়ে তুলবেন জ্ঞানের গোটা কাঠামো।
এই লক্ষ্যে দেকার্ত যে পদ্ধতি অবলম্বন করলেন, তার নাম "পদ্ধতিগত সংশয়" — এমন এক কৌশল, যেখানে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিটা বিশ্বাসকে চরম সংশয়ের মুখোমুখি দাঁড় করালেন, একটা একটা করে। প্রথমে তিনি প্রশ্ন তুললেন ইন্দ্রিয়ের ওপর — চোখ, কান, স্পর্শ, এসব কি সবসময় নির্ভরযোগ্য? দূর থেকে দেখলে একটা চৌকো মিনারকেও গোল মনে হতে পারে, একটা সোজা লাঠিও পানিতে ডোবালে বাঁকা দেখায়। যদি ইন্দ্রিয় একবার প্রতারণা করতে পারে, তাহলে তাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা কি বিচক্ষণতা?
তারপর এলো তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত যুক্তিগুলোর একটা — স্বপ্নের যুক্তি। এই মুহূর্তে আপনি যা অনুভব করছেন — এই লেখা পড়া, চারপাশের জগৎ — এসবই কি বাস্তব, নাকি আপনি আসলে ঘুমিয়ে আছেন, স্বপ্নের মধ্যে ডুবে আছেন? স্বপ্নের ভেতরে থাকা অবস্থায় আমরা কখনোই নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি না যে এটা স্বপ্ন। তাহলে জাগ্রত অবস্থাতেই বা কীভাবে নিশ্চিত হবো, এটা বাস্তব, স্বপ্ন নয়? এই একটা যুক্তিই আমাদের ইন্দ্রিয়নির্ভর সমস্ত অভিজ্ঞতাকে টলিয়ে দেয়।
তবে দেকার্ত লক্ষ্য করলেন, গণিতের সত্য এই সংশয় থেকে যেন অক্ষত থেকে যায় — স্বপ্নে থাকলেও দুই আর দুই যোগ করলে চার-ই হয়, বাস্তবেও তাই। মনে হতে পারে, এখানেই বুঝি নিশ্চয়তার ভিত্তি মিলে গেল। কিন্তু দেকার্ত থামলেন না। তিনি নিয়ে এলেন তাঁর সবচেয়ে চরম, সবচেয়ে অস্বস্তিকর যুক্তি — যদি এমন হয়, কোনো এক প্রতারক শক্তি (যাকে তিনি কল্পনা করেন "দুষ্ট প্রতিভা" বা এভিল ডিমন হিসেবে) ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের চিন্তা করার পদ্ধতিটাকেই ত্রুটিপূর্ণ করে রেখেছে? তাহলে এমনকি গণিতের মতো নিটোল সত্যও হয়ে উঠতে পারে একটা সুনিপুণ প্রতারণা।
🍂
এই পর্যায়ে মনে হতে পারে, দেকার্ত সবকিছু হারিয়ে ফেললেন — বহির্জগৎ, ঈশ্বর, এমনকি গণিতও যদি সন্দেহের মুখে পড়ে, তাহলে আর কী অবশিষ্ট থাকে? ঠিক এই সর্বনিম্ন বিন্দুতে দেকার্ত আবিষ্কার করলেন এক আশ্চর্য সত্য। তিনি লক্ষ্য করলেন, তিনি এই মুহূর্তে যা করছেন — সন্দেহ করা — সেই কাজটার জন্যও তো কাউকে না কাউকে অস্তিত্বশীল থাকতে হবে। আমি যদি সন্দেহই করি যে আমি আছি কি না, তাহলে সেই সন্দেহ করার কাজটা তো কেউ একজন করছে — আর সেই "কেউ একজন"টাই আমি।
এখানেই লুকিয়ে দেকার্তের যুক্তির প্রকৃত মৌলিকতা। বাকি সব বিশ্বাস পদ্ধতিগত সংশয়ের আঘাতে ভেঙে পড়ে, কিন্তু এই একটা বিশ্বাস — "আমি চিন্তা করছি, তাই আমি অস্তিত্বশীল" — ঠিক সেই একই সংশয়ের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়ে যায়। যত জোরালোভাবেই কেউ এই বিশ্বাসকে অস্বীকার করার চেষ্টা করুক, সেই অস্বীকার করার কাজটাই প্রমাণ করে দেয় যে অস্বীকারকারী অস্তিত্বশীল। সংশয়কে তার নিজের অস্ত্র দিয়েই পরাস্ত করার এই কৌশলটাকে দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল বৌদ্ধিক কীর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ল্যাটিন ভাষায় এই সত্যকে তিনি প্রকাশ করলেন এক অমর বাক্যে — "কগিতো এর্গো সুম" — "আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি।"
দেকার্তের এই যুক্তি আজও দর্শনের পাঠ্যক্রমে অপরিহার্য, কিন্তু এটাকে প্রশ্নাতীত মনে করাটাও ভুল হবে। পরবর্তীকালে বহু দার্শনিক এই যুক্তির গভীরে প্রশ্ন তুলেছেন। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে একটা তীক্ষ্ণ আপত্তি তোলেন — "আমি চিন্তা করি" বলাটা নিজেই একটা অনুমান, কারণ এটা ধরে নেয় একটা স্থায়ী "আমি" আছে, যে চিন্তা করছে। নিৎশের মতে, সবচেয়ে সৎ দাবিটা হতো শুধু "চিন্তা ঘটছে" — কে চিন্তা করছে, সেটা এখনো প্রমাণিত নয়। একইভাবে দার্শনিকরা "কার্টেসিয়ান সার্কেল" নামের একটা সমস্যাও চিহ্নিত করেছেন — দেকার্ত পরবর্তীতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে যুক্তি ব্যবহার করেন, অথচ সেই যুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে তাঁর দরকার পড়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব, যা এক ধরনের চক্রাকার যুক্তির ফাঁদ তৈরি করে।
আশ্চর্যের বিষয়, দেকার্তের চারশো বছরের পুরনো এই চিন্তা আজকের যুগে অভূতপূর্ব প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেয়েছে। তাঁর "দুষ্ট প্রতিভা"-র কল্পনা আজকের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে "সিমুলেশন হাইপোথিসিস" বা অনুকরণ-প্রকল্প তত্ত্বে — আমরা কি আসলে কোনো উন্নত সভ্যতার তৈরি এক বিশাল কম্পিউটার সিমুলেশনের ভেতরে বাস করছি? দার্শনিক নিক বস্ট্রম এই প্রশ্নকে গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ করেছেন আধুনিক দর্শনে, আর জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই একই ধারণা ফুটে উঠেছে "দ্য ম্যাট্রিক্স"-এর মতো চলচ্চিত্রে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে, যখন মেশিন মানুষের মতো কথা বলতে শিখছে, তখন দেকার্তের সেই পুরনো প্রশ্নটা নতুন রূপে ফিরে আসছে — চিন্তা করাটাই যদি অস্তিত্বের প্রমাণ হয়, তাহলে যে যন্ত্র চিন্তার অনুকরণ করতে পারে, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা কী বলব?
দেকার্তের যাত্রাটা আসলে একটা শিক্ষা দেয়, যা তাঁর নির্দিষ্ট উত্তরের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ — সত্যিকারের নিশ্চয়তা খুঁজে পেতে হলে, কখনো কখনো সবকিছু ভেঙে ফেলার সাহস দেখাতে হয়, এমনকি নিজের সবচেয়ে প্রিয় বিশ্বাসগুলোকেও। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এমন একটা সত্য, যাকে কোনো সংশয়ই স্পর্শ করতে পারে না — চিন্তা করার কাজটাই নিজের অস্তিত্বের সবচেয়ে অকাট্য প্রমাণ। চারশো বছর পরেও, প্রতিটা মুহূর্তে যখন আমরা প্রশ্ন করি, সন্দেহ করি, ভাবি — আমরা অজান্তেই দেকার্তের সেই আবিষ্কারকেই নতুন করে প্রমাণ করে চলেছি।
0 Comments