জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র : শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি /পর্ব ৩০/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ৩০

প্রীতম সেনগুপ্ত 


স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন -- ‘দিবারাত্র কাজ কর।’এই প্রসঙ্গে তিনি গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথাটি উদ্ধৃত করেছেন। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ---‘দেখ, আমি জগতে ঈশ্বর, আমার কোন কর্তব্য নাই। প্রত্যেক কর্তব্যই বন্ধন। কিন্তু আমি কর্মের জন্যই কর্ম করি। যদি ক্ষণমাত্রও আমি কর্ম হইতে বিরত হই, (সবকিছু বিশৃঙ্খল হইবে)। ( গীতা,৩/২২-২৩) তাই স্বামীজি বলছেন --- “অতএব কেবল কাজ করিয়া যাও, কিন্তু কর্তব্যবোধে নয়।’ তিনি আরো বলছেন --- ‘এই সংসার যেন একটি খেলা। তোমরা তাঁহার (ভগবানের) খেলার সাথী। কোন দুঃখ, কোন দুর্গতির কথা না ভাবিয়া কাজ করিয়া যাও। কদর্য বস্তিতে এবং সুসজ্জিত বৈঠকখানায় ভগবানেরই লীলা দেখ। লোককে উন্নত করিবার জন্য কাজ কর। (তাহরা যে পাপী বা হীন, তাহা নয়; কৃষ্ণ এরূপ বলেন না।) ... ঈশ্বরের সন্তানসন্ততি যে তোমার প্রভুরই সন্তান। (আর সন্তান তো পিতারই ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি) তুমি তো তাঁহার সেবক।... জীবন্ত ঈশ্বরের সেবা কর! ঈশ্বর তোমার নিকটে অন্ধ, খঞ্জ, দরিদ্র, দুর্বল বা পাপীর মূর্তিতে আসেন। তোমার জন্য উপাসনার কী চমৎকার সুযোগ! যে মুহূর্তে তুমি চিন্তা কর যে তুমি ‘সাহায্য’ করিতেছ, তখনই সমস্ত আদর্শটি নষ্ট করিয়া নিজেকে অবনত করিয়া ফেলিয়াছ। এইটি জানিয়া কাজ কর। প্রশ্ন করিবে, ‘তার পর?’ তোমাকে আর হৃদয়ভেদী ভয়ানক দুঃখে পড়িত হইবে না।... তখন কর্ম আর বন্ধন হইবে না। কর্ম খেলা হইয়া যাইবে, আনন্দে পরিণত হইবে। কর্ম কর।  অনাসক্ত হও। ইহাই সম্পূর্ণ কর্মরহস্য। যদি আসক্ত হও, দুঃখ আসিবে।

🍂

জীবনে আমরা যাহাই করিতে যাই, তাহার সঙ্গে নিজেদের এক করিয়া ফেলি। এই লোকটি কটু কথা বলিল, আমার মনে ক্রোধের সঞ্চার হইল। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ক্রোধের সঙ্গে আমি এক হইয়া  গেলাম --তারপরেই আসে দুঃখ। নিজেকে ভগবানের সঙ্গে যুক্ত কর, আর কিছুর সঙ্গে নয়; কারণ আর সবকিছুই অসত্য। অনিত্য অসত্যের প্রতি আসক্তিই দুঃখ আনে। একমাত্র সৎস্বরূপই সত্য; তিনিই একমাত্র জীবন, তাঁহাতে বিষয়-বিষয়ী (object and subject) বোধ নাই। 

কিন্তু নিষ্কাম ভালবাসায় তোমাকে আঘাত পাইতে হইবে না। যাহা কিছু কর, ক্ষতি নাই। বিবাহ করিতে পার, সন্তানের জনক হইতে পার ...  তোমার যাহা খুশি করিতে পার--- কিছুই তোমাকে দুঃখ দিবে না; ‘অহং’-বুদ্ধিতে কিছু করিও না। কর্তব্যের জন্যই কর্তব্য কর; কর্মের জন্যই কর্ম কর। তাহাতে তোমার কি?  তুমি নির্লিপ্তভাবে পাশে দাঁড়াইয়া থাক।

যখন আমরা ঐরূপ অনাসক্তি লাভ করি, তখনই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অদ্ভুত রহস্য আমাদের হৃদয়ঙ্গম হয়। তখনই বুঝিতে পারি --- একই সঙ্গে কি তীব্র কর্মচাঞ্চল্য ও জন্য চরম শান্তি! প্রতিক্ষণে কি কর্ম আবার কি বিশ্রাম! ইহাই সংসারের রহস্য ---একই সত্তায় কর্তৃত্ব ও অকর্তৃত্ব, একই আধারে অনন্ত এবং সান্ত।  তখনই আমরা রহস্যটি আবিষ্কার করিব। ‘যিনি তীব্র কর্মব্যস্ততার মধ্যে অপার শান্তি এবং অসীম শান্তির মধ্যে চরম কর্মচাঞ্চল্য লাভ করেন, তিনিই যোগী হইয়াছেন।’ (গীতা, ৪/১৮) কেবল তিনিই প্রকৃত কর্মী আর কেহই নয়। আমরা একটু কাজ করিয়াই ভাঙিয়া পড়ি। ইহার কারণ কি? যেহেতু আমরা কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়াইয়া ফেলি। যদি আমরা আসক্ত না হই, তাহা হইলে কাজের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পূর্ণ বিশ্রাম লাভ করিতে পারি ...। 

এইরূপ অনাসক্তিতে পৌঁছান কত কঠিন! সেইজন্য (কৃষ্ণ ) আমাদিগকে অপেক্ষাকৃত সহজ পথ ও উপায়গুলির নির্দেশ দিতেছেন। ( পুরুষ বা নারী ) প্রত্যেকের পক্ষে সহজতম রাস্তা হইতেছে ফলের আকাঙ্ক্ষায়  উদ্বিগ্ন না হইয়া কর্ম করা। বাসনাই বন্ধন সৃষ্টি করে আমরা যদি কর্মের ফল চাই, তবে শুভই হউক আর অশুভই হউক, উহার ফল ভোগ করিতেই হইবে। কিন্তু যদি আমরা আমাদের নিজেদের জন্য কর্ম না করিয়া ঈশ্বরের মহিমার জন্যই করি তাহা হইলে ফল নিজের ভাবনা নিজেই ভাবিবে। ...সৈনিক ফলের আশা না করিয়া যুদ্ধ করে। সে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিয়া যায়। যদি পরাজয় হয় --- তাহা সেনাপতির, সৈনিকের নয়। প্রীতির জন্যই আমরা কর্তব্য করিব --- সেনাপতির প্রীতির জন্য, ঈশ্বরের প্রীতির জন্য।” ( গীতা-প্রসঙ্গ, স্বামী বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়)

গীতা নির্ভর নিষ্কাম কর্মযোগের এমন প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা মুমুক্ষু মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগায়, মুক্তির পথ দেখিয়ে দেয়। বস্তুতপক্ষে গীতায় সনাতন ধর্মের এমন একটি শাশ্বত পথনির্দেশনা রয়েছে যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে নিষ্কাম কর্মযোগের আলোয় আলোকিত করে।   

Post a Comment

0 Comments