জ্বলদর্চি

অমানবিক কূটনীতির খেলা/ অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

অমানবিক কূটনীতির খেলা

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় 

নারীশক্তির আরাধনায় সমগ্র ভারতে যখন উৎসবের আয়োজন প্রায় চরম পর্যায় চলে গেছে সেই সময় ভারতে এলেন আফগানিস্তানের তালিবানি বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। কে না জানে তালিবান নারীশক্তি সহ্য করতে পারে না। সেই বিদেশমন্ত্রী তাঁর দেশের দূতাবাসে সাংবাদিকদের ডাকলেন, প্রশ্নোত্তরের আসর বসালেন কিন্তু ব্রাত্য রয়ে গেল মহিলা সাংবাদিকরা, তাঁরা আমন্ত্রণই পেলেন না। জেগে উঠল ভারতের নারীশক্তি। সংবাদমাধ্যম থেকে সমাজমাধ্যম হৈ হৈ করে উঠল, ভারতে বসে তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রীর নারীর অমর্যাদার প্রতিবাদ সরবে ঘোষিত হল দেশ বিদেশে। সমালোচনার ঝড়ে মুত্তাকি পরের দিন আগ্রায় তাজমহল দর্শনের পরিকল্পনা বাতিল করে আবার সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর দূতাবাসে, এবার বিশেষ করে মহিলা সাংবাদিকদের। মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, যে কট্টর তালিবানি সরকার ইসলামিক ধর্মকে দোহাই মেনে কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়েদের রাস্তায় একা বেরনো নিষেধ করে, স্কুল-কলেজে পড়া অথবা চাকরি করার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে রেখেছে তারা শুধুমাত্র মিডিয়ার প্রচারে তাদের ধর্মীয় প্রথাকে সরিয়ে এতটা হার স্বীকার করল সে কি শুধু কূটনৈতিক দায়বদ্ধতায় না কি তাদের এই কট্টরতার পেছনে যে যুক্তি কাজ করছে তারই সামান্যতম বহিঃপ্রকাশ ঘটল ভারতে এসে। 

উষ্ণায়ন যুগ শুরু হওয়ার পর এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে মানুষের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। সভ্যতার বিকাশ ঘটে নানা দিকে। যাযাবর শ্রেণির জনজাতিরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বসতি গড়ে তোলে। জঙ্গল থেকে শস্যদানা তুলে এনে তা দিয়ে খবার বানানোর সময় বসতির আশেপাশে পড়ে অঙ্কুর গজিয়ে গাছ হয়। সেই গাছে শস্য হয়। শুরু হয় চাষের প্রথম পাঠ। মূলত পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া, মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে অর্থাৎ ইরান-ইরাক এলাকায়। এরপর শুরু হয় সংগঠিত চাষ। ইতিমধ্যে সুমেরীয়-সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে স্থাপত্যের নির্মাণ। দুর্গম রুক্ষ মরুপর্বত হিন্দুকুশ অঞ্চলে নদীর সংখ্যা কম থাকায় সবুজের দেখা মেলে কম। তাই যাযাবর জনজাতিরা সেখানে পৌঁছায় অনেক পরে। হিন্দুকুশের প্রাচীন জনজাতি বাসিন্দাদের আসাকেনোই বলা হত, মূলত অশ্বারোহী এবং ঘোড়া পালনকারী। সেখান থেকেই আফগান। সমাজে তখন জরথ্রুষ্ট ধর্ম প্রচলন শুরু হয়ে গেছে। তাদেরই এক শাখাকে এই অঞ্চলে পাঠানো হয়। হিন্দুকুশের হিমবাহ গলে কাবুল নদীর আশপাশে কৃষিক্ষেত্র গড়ে ওঠে। তবে প্রধান খাদ্য ছিল পশুর মাংস, আগুনে ঝলসে। আজও সেই খাবারের প্রচলন, সঙ্গে মোটা নানরুটি। 
🍂
পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার একটি জনজাতি গোষ্ঠী আরব। প্রাচ্যে তিনটে ভূখণ্ড পৃথিবীতে যশলাভ করে, আরব, ভারতবর্ষ এবং মঙ্গোলভূমি। এর মধ্যে আরবভূমিতে দুটো ধর্মের অভ্যুদয় হয়, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম। দুটোই প্রাচীনতম জরথ্রুষ্ট বা ইহুদি ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারও বিকাশ আরবভূমি জেরুজালেমে। ভারতে প্রাক-বৈদিক চিরন্তন ধর্ম যা আফ্রিকার এনকাই ধর্মের সাথে মেলে। এরপর বৈদিক সনাতন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উৎপত্তি ও বিকাশ। ধর্ম এখানে সংস্কৃতি ও বৈদগ্ধ্যের ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত। এখানে যে প্রসঙ্গে ধর্মের কথা এল তা হচ্ছে আরব ও ভারতবর্ষের মধ্যবর্তী বল্খ (সংস্কৃতে বল্‌হিক) অঞ্চল যেটা আফগানিস্তানের মধ্যে। এখানে জরথ্রুস্ত্র আপন ধর্ম প্রচার করেন ও ইরানি আর্য বাহা গুশ্তাস্মকে এই নবধর্মে দীক্ষিত করেন। ফলে আদতে ভারতবর্ষ পশ্চিমে আরব ও বল্খ এবং পূর্বে মঙ্গোলদের মধ্যবর্তী। ভারতের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব থেকে পশ্চিমে, বল্‌খ ভূখণ্ডের আফগানিস্তানেও। এরপর আরবে জন্ম নিল মুসলমান ধর্ম। সম-সংস্কৃতি ধরে ইহুদি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল, বিস্তারিত হল বৌদ্ধধর্মে আদৃত আফগানিস্তান সমেত পূর্বের দেশগুলোতেও। 

আফগানিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর রাজা আমানুল্লা খান রাজত্ব করেন। এরপর সোভিয়েত রাশিয়া দখলে নেয় এবং পরে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলার শেষে তালিবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। 

সিকি শতাব্দী আগে প্রথম তালিবান আফগানিস্তানের শাসনভার হাতে নেওয়ার পর থেকেই সমাজে একাধিক ইসলামিক ফতোয়া চালু করে। তালিবান শাসকের কার্যকলাপ তাদের সন্ত্রাসী, নারীবিদ্বেষী, সমাজবিরোধী, সভ্যতাবিরোধী বলে পরিচিত করেছে। ইসলাম ধর্ম মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে বলে শুরু করে মূর্তি ভাঙার কাজ। তারই পরিণাম বামিয়ানে ইউনেস্কো ঐতিহ্য স্বীকৃত ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের বুদ্ধমূর্তিগুলো ডাইনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া। তারা মহিলাদের উপর ধর্মের নামে নানারকম নিষেধাজ্ঞা জারি করে। হিজাব পরে রাস্তায় বেরনো বাধ্যতামূলক। স্কুল কলেজে পড়াশোনা করতে যাওয়া, চাকরি করা ইত্যাদিতে বাধা ছিল না। তখনও আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে আমেরিকা সহ একাধিক দেশের রাস্তা তৈরি, নগরোন্নয়ন, পর্যটন শিল্প সমেত নানাবিধ উন্নয়ন প্রকল্প চালু ছিল, উপস্থিত ছিল আমেরিকার সেনাও। ভারতও সেই প্রকল্পে অংশ নেয় এবং প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। কোভিড কালের শেষ পর্যায় ২০২১ সালে তালিবানের এক অংশ প্রতিবাদী হয়ে কাবুলের দখল নেয় এবং আগের তালিবান সরকারকে সরিয়ে শাসক হয়ে বসে। এই দুই তালিবানে আজও সংঘর্ষ চলছে।  সেনা সমেত আমেরিকার লোকজন দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এই নতুন তালিবান মেয়েদের প্রতি আরও অনেক বেশি কট্টরপন্থা অবলম্বন করে তাদের উপর আরও কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন চালু করে। পুরুষ সঙ্গী ছাড়া একা বাড়ির বাইরে বেরনো নিষেধ। বোরখা ছাড়া রাস্তায় বের হওয়া মানা। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করা যাবে না। কলেজেও না। তবে ঘরে বসে অনলাইন পড়ায় আপত্তি নেই। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী মহিলারাই কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে।   

সম্প্রতি আফগানিস্তান সফরে গিয়ে সেখানের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়। প্রথমত ভারতীয় বলে যথেষ্ট সমাদর ও অভ্যর্থনা পাই নীতিরক্ষক হাতে কালাশনিকভ বন্দুকধারী তালিবান যুবকদের থেকে। রাস্তায় কোনও মহিলা প্রায় দেখা যায় না, বোরখা পরাও নয় কেবলমাত্র কাবুল বিমানবন্দর এলাকায় বোরখাহীন মহিলা ভিক্ষাজীবি দেখা গেল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলের পোশাক পরে আনন্দে স্কুলে যাচ্ছে। ছুটোছুটি করছে। তাছাড়া সর্বত্রই পুরুষ আর পুরুষ। হাসপাতালে অবশ্য মহিলা ডাক্তার দেখা গেল। বামিয়ানে পর্যটক বেশি দেখলাম, এমনকি কিছু পশ্চিমীও। বিভিন্ন বয়সের পুরুষদের সঙ্গে কথা হয়েছে। নীল হ্রদের কাছে কিছু মধ্যবয়সী তালিবান উৎসাহভরে ছবি তুললেন। কথায় কথায় জানা গেল বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসে বর্তমান তালিবান সরকার অসন্তুষ্ট কারণ পর্যটন শিল্প মার খাচ্ছে। তারা আফগানিস্তানে পর্যটনকে আবার শক্তিশালী শিল্প হিসেবে দেখতে চায়। বামিয়ান থেকে বল্‌খ অঞ্চলে মাজার-এ-শরীফ যাওয়ার রাস্তা বেশ কয়েক কিলোমিটার খুবই খারাপ, গাড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। কারণ জানতে চাইলে শুনলাম আমেরিকান সৈন্যদের গাড়ি যাতে দ্রুত চলতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন অর্থাভাবে আশু সমাধানের প্রশ্ন নেই। দু-তিন কিলোমিটার অন্তর তালিবান চেক পয়েন্ট, হাতে বন্দুক নিয়ে যুবকের দল। যুব সমাজে এটাই এখন অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্র। ভারতীয় জেনে হাসিমুখে অভ্যর্থনা। জানাল অপারেশন সিঁদুরে ভারতকে সমর্থন। কাবুলে হিন্দু মন্দিরে গেলাম। দ্বিপ্রাহরিক ভোগ-প্রসাদ খাওয়া শেষে প্রধান পুরোহিতকে শুধাই, কিভাবে আছেন। সন্তোষজনক উত্তর শুনে ভাল লাগল। গণ্ডগোলের সময় পাশের মসজিদ আগলে রেখেছিল। মেয়েদের গৃহবন্দি করে রাখার ব্যাখ্যায় যা বললেন হুবহু একই কথা সশস্ত্র তালিবানি লোকেদের মুখেও। ওরা চায় পৃথিবীর দেশগুলো তাদের স্বীকৃতি দিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হোক তবে কোনও দেশের তত্ত্বাবধানে নয়, সম্মানের সাথে তালিবানদের নিজেদের ক্ষমতায় ও পরিশ্রমে। তবে মেয়েদের উপর কেন নিষেধাজ্ঞা? সপাট যুক্তি, সবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। “মনে রাখবেন, আমাদেরও বাড়িতে মায়েদের বেরোতে না পারার কষ্ট, বোনেদের পড়াশোনায় বাধা এসবের মুখোমুখি হতে হয়। আমরা আশাবাদী।”   

ভেবে দেখলাম, যবে থেকে ধর্ম সমাজে মিশেছে, নারীর শরীরে পায়ে শৃঙ্খল এসেছে যা প্রাতিষ্ঠানিক-ধর্ম-পূর্ব সমাজে ছিল না। ভারতে দ্রাবিড় সম্প্রদায়ের যে কটা প্রাচীন জনজাতি এখনও টিকে আছে, সেখানে ধর্ম হল প্রকৃতি, কোনও মূর্তি নেই। দেখেছি আফ্রিকার কিছু প্রাচীন জনজাতির মধ্যে। পড়েছি অস্ট্রেলিয়ার আদি জনজাতির কথা সেখানেও প্রকৃতি ধর্ম। সর্বত্র পুরুষ ও মহিলারা সমমর্যাদাসম্পন্ন, বৈষম্যহীন। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে নারী-পুরুষে বৈষম্য, নারীকে পণ হিসেবে ব্যবহারের প্রথা প্রাচীন। ভারতের মহাকাব্য মহাভারতই তার প্রমাণ। আধুনিক সমাজেও নারীকে পণ ও পণ্য হিসেবে আকছার ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যে, রাজিনীতিতে, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কোথায় নয়। নারীকে বাজি রেখে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সেই প্রাচীন প্রথাই অনুসৃত হচ্ছে আজও।

Post a Comment

0 Comments