অয়ন মুখোপাধ্যায়
আমার ফেরার কোন রাস্তা জানা নেই
যাওয়ার আগে
আমার শরীর তোমার হাতটাকে চায়, মন বলে—ভদ্রলোকের মতো বসো।
মনটা বোধহয় আমার চেয়ে অনেক বয়স্ক; সব সময় অভিভাবক সেজে থাকে।
তুমি একটু কাছে এলেই সে নড়েচড়ে ওঠে,
আমি আর তোমার দিকে তাকাতে পারি না।
অথচ খুব ইচ্ছে করে তোমার দিকে তাকাই, তোমার বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়ি—
যেমন অনেকটা পথ হেঁটে ক্লান্ত মানুষ শেষ বাসে উঠে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে ঘুমোতে গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
তুমি শুধু তোমার হাতটা আমার বুকের ওপর রাখো।
পাপ-পুণ্যের হিসেব বরং কাল সকালে করব।
সকাল কোথাও নেই
সকালে ঘুম ভেঙে দেখি তোমার হাতটা আর আমার বুকে নেই।
মন যেন স্বস্তি পেল—শেষ পর্যন্ত তার কথাই ঠিক হল।
শরীর এত সহজে মানে না।
সে বালিশে, বিছানায় তোমার গায়ের গন্ধ খুঁজে বেড়ায়।
আমি জানলার দিকে মুখ করে শুয়ে থাকি। বাইরে দুধওয়ালা, খবরের কাগজ, মানুষের সকাল।
সবাই যে যার কাজে বেরিয়ে পড়েছে—শুধু আমার একটা হাত কোথাও যেতে চাইছে না।
রাতে ভেবেছিলাম সকালে হিসেব করব।
সকাল হয়েছে, আর হিসেব করতে ইচ্ছে করছে না।
🍂
দুপুরের ভুল দিক
দুপুরে তোমার কথাটা মনে পড়াটা অসুবিধের নয়, বরং চাপের।
রাতে অন্তত অন্ধকারকে দোষ দেওয়া যায়, দুপুরে সব কিছু পরিষ্কার ছিল।
টেবিলের ওপর আমার হাত পড়ে আছে।
তার পাশে তোমার হাতটাও থাকার কথা ।
মন বলে—কাজে মন দাও।
শরীর বলে—ওসব পরে হবে।
এই টানাপোড়েনের মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ কে
“রইনু চুপে তাঁহার পায়ের চিহ্নরূপে।”
আমি মনে মনে বলি, “মিলাই আমি, আর কিছু না চাই।”
এখান থেকেই আমার শরীরটা আবার আমার সাথে কথা বলতে শুরু করেছে।
তোমাকে ছোঁয়ার ইচ্ছে হচ্ছে— সেটা খুব বড় কোনও প্রেমের কথা নয়।
তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, এই পৃথিবীতে আমার জন্য
কেনো কেউ দু-একটু শরীর বরাদ্দ করে রেখে যায়নি?
বাড়ি ফেরার সময়
আজ শেষ বাসটাও চলে গেল।
সরকার জোর করে চালাচ্ছিল বলেই এই রুটে এতদিন বাস চলছিল।
এবার আর এই রাস্তায় বাস দেখা যাবে না।
রাস্তা ফাঁকা। মন বলে—বাড়ি চলো।
অথচ আমার পুরনো শরীরটা এখনও একটা কম্পাসের মতো তোমার বাড়ির দিকটা কে ঠিক চিনে ফেলে।
মাঝবয়সে এসে এ বড় খারাপ অভ্যাস।
মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে ভাবি, কেউ বলবে—আর একটু থাকো।
কেউ বলে না।
তখন বুঝি, বাড়ি ফেরার চাইতে কারও বুকে ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছেটাই আসলে বেশি বিপজ্জনক।
বাস মিস করলে মানুষ হেঁটে বাড়ি ফেরে।
কিন্তু মানুষ মিস করলে কোন রাস্তা ধরে ফিরতে হয়—আমাদের কেউ শেখায়নি।
0 Comments