জ্বলদর্চি

পারিশ্রমিক/কমলিকা ভট্টাচার্য

আজ নাকি National Engineers’ Day। তাই আমার সাম্প্রতিক এক অভিজ্ঞতার গল্প ভাগ করে নিলাম।
এই গল্পটা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিল—ইঞ্জিনিয়ারিং হয়তো একটা পেশা, কিন্তু সত্যিকারের ইঞ্জিনিয়ারের কাছে সেটা অনেক সময় একটা নেশাও। 
আমার গল্পের সেই মানুষটির প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা। আর তাঁর মতো সমস্ত passionate engineer এবং নিজের কাজকে ভালোবেসে বেঁচে থাকা মানুষদের জানাই আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।

পারিশ্রমিক
কমলিকা ভট্টাচার্য

আমার প্রতিটি যাত্রাই যেন অজান্তে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নতুন নতুন মুখের হাসি-কান্না, নতুন নতুন জীবনের গল্প তুলে দেয়। কোথাও পৌঁছনোর আগেই কখনও কখনও পথই এমন কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়, যাঁরা কয়েক মুহূর্তের জন্য এসে আমাদের চিন্তাভাবনার ভেতরটাকে একটু নাড়িয়ে দিয়ে যান।
ব্যাঙ্গালোরের আলসে আবহাওয়াটা সেদিন সকাল থেকেই কেমন একটা মিষ্টি আবদারের মতো আমাকে জড়িয়ে রেখেছিল। ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁইছুঁই। বিছানাটাও যেন সেদিন আমাকে ছাড়তে নারাজ। মনে হচ্ছিল, সে যেন মৃদু অনুযোগ করে বলছে, ‘রোজ রোজ কিসের এত তাড়া? চেন্নাই ফিরে তো আবার সময়ের সঙ্গে রিলে রেস করতেই হবে! আজ আর একটু থাকো।’
কমফর্টারটা আরও ভালো করে জড়িয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। চোখ দুটো সবে আবার বুজিয়েছি, এমন সময় মোবাইলটা বাধ্য ছেলের মতো ট্যা-ট্যা করে অ্যালার্ম বাজাতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত উঠতেই হলো।
তারপর এটা-সেটা করতে করতে, আমাদের এই সাময়িক সংসারটা গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে বেশ দেরি হয়ে গেল।
অনেকদিন পর এমন একটা আলসে সকাল পেয়ে আমার হাজব্যান্ডও বেশ উপভোগ করছিল। সকালে হাঁটতে বেরিয়ে ফিরল দু-হাত ভর্তি নানা রকম গাছ নিয়ে। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এতগুলো গাছ আবার কেন আনলে? বাড়িটা তো বন্ধ থাকবে!’
সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘বেশি করে জল দেওয়ার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি। আবার কদিন বাদে না হয় একবার আসব।’
আমি হালকা হেসেছিলাম। ব্যাঙ্গালোরে আসাটা আমাদের কাছে ব্যস্ত জীবনের ফাঁক থেকে চুরি করে নেওয়া কয়েকটা দিনের মতো। সংসার, কাজ, দায়িত্ব—সবকিছুর মাঝখান থেকে নিজেদের জন্য একটু সময় বার করে নেওয়া। আর এই লং ড্রাইভটা আমরা দুজনেই ভীষণ উপভোগ করি।
তবে সেদিন বেরোতে দেরি হয়ে যাওয়ায় আমাদের পরিচিত চার্জিং স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে সময়টা একেবারে অন্যরকম হয়ে গেল। সাধারণত গাড়ি চার্জে লাগিয়ে আমরা সেখানে লাঞ্চ কিংবা ডিনার সেরে নিই। সবকিছুরই একটা সুন্দর পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু সেদিন সময় আমাদের পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মেলাল না। চার্জিংয়ে গাড়ি দাঁড় করানোর সময়টা না লাঞ্চের, না ডিনারের—একেবারে টি-টাইম।
বড় কোনও রেস্তরাঁয় গিয়ে চা খাওয়ার কথাও মাথায় এল না। চার্জিং স্টেশনের ছেলেগুলোও আমাদের চেনে। এত ঘনঘন যাতায়াত করতে করতে ওদের সঙ্গে একটা পরিচিতি হয়ে গেছে। ওদেরই একজন এগিয়ে এসে বলল, ‘ম্যাম, পাশেই কয়েকটা ছোট হোটেল আছে। ওখানে চা পেয়ে যাবেন।’
🍂

গাড়ি চার্জে লাগিয়ে আমরা সেদিকেই হাঁটলাম।
পরপর দু-তিনটে ছোট চায়ের দোকান। স্থানীয় মানুষজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে গরম গরম চা খাচ্ছেন। সঙ্গে গরম ভাজি, পেঁয়াজি, সিঙ্গারা। কড়াই থেকে উঠে আসা গরম তেলের গন্ধ বাতাসে মিশে একটা অদ্ভুত প্রলোভন তৈরি করছিল।
দেখতে দেখতে আমারও একটু লোভ হচ্ছিল। কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে অম্বল, গলা জ্বালা আর বদহজম—আমার বহুদিনের পরিচিত তিন শত্রু—যেন জটলা করে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগল। মনে হলো, শুধু একবার ওই সিঙ্গারায় হাত বাড়ালেই ওরা তিনজন হুড়মুড়িয়ে এসে আমার পাশে বসবে।
তাই ঘোড়ার চোখে ঠুলি লাগানোর মতো এদিক-ওদিক না তাকিয়ে দু-কাপ চিনি ছাড়া চা নিয়ে বসে পড়লাম।
ঠিক তখনই চোখে পড়ল একেবারে অন্যরকম একটা দোকান।
তিনটে চায়ের দোকানের মাঝখানে ছোট্ট একটা জায়গা। সামনে একটা টেবিল নিয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। বয়স পঁচাত্তর তো হবেই। সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা রকম যন্ত্রপাতি। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা গাড়ির মিউজিক সিস্টেম সারাচ্ছেন।
দৃশ্যটা আমার একেবারেই অপরিচিত নয়। কারণ আমার বাড়ির মানুষটিরও যেকোনও ভাঙা, অকেজো যন্ত্রের প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে—বিশেষ করে পুরোনো রেডিও, ভালভ সেট কিংবা কোনও যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অচেনা তার, কলকব্জার প্রতি।
তাই চায়ের কাপটা টেবিলে রেখেই আমার হাজব্যান্ড একেবারে বৃদ্ধ ভদ্রলোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক যতটা মন দিয়ে মিউজিক সিস্টেমটা সারাচ্ছিলেন, আমার হাজব্যান্ডও ঠিক ততটাই ধৈর্য নিয়ে তাঁর কাজটা দেখতে লাগল।
আর আমি দূরে বসে দেখছিলাম দুজনকে।
কী আশ্চর্য মিল!
দুজনের কেউ কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলছেন না। অথচ দুজনের চোখেই একই রকম একাগ্রতা। একই রকম মগ্নতা। মনে হচ্ছিল, দুজনেই কোনও একটা যন্ত্র সারাচ্ছেন না—নিজেদের খুব প্রিয় কোনও জিনিসকে বাঁচিয়ে রাখছেন।
বৃদ্ধের ছোট্ট টেবিলটাও বেশ আশ্চর্য। একটা প্লাগ পয়েন্ট থেকে শুরু করে গরম থেকে বাঁচার জন্য ছোট্ট একটা ফ্যান পর্যন্ত সেখানে সবকিছুর ব্যবস্থা। সামান্য কয়েক ফুট জায়গার মধ্যে যেন তিনি নিজের একটা পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছেন। চারপাশে যত গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়, ধুলো আর কোলাহল থাকুক না কেন, ওই টেবিলটার সামনে বসলে তাঁর পৃথিবীটা বোধহয় অন্যরকম হয়ে যায়।
এদিকে গাড়ির চার্জও প্রায় শেষ।
মোবাইলে মেসেজ এল—চার্জ হয়ে গেছে।
ঠিক সেই সময় বৃদ্ধ ভদ্রলোক মিউজিক সিস্টেমটা গাড়িতে লাগিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। আমার হাজব্যান্ড গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—সিস্টেমটা সত্যিই চলল কি না, সেটা দেখার জন্য।
আমি ভাবলাম, গাড়ি যখন চার্জ হয়ে গেছে, এবার নিজেকেও একটু চার্জ করে নেওয়া যাক। মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটু দূরে বসে পড়লাম।
চোখ আটকে রইল তাঁদের দুজনের দিকে।
দু-মিনিট পর হঠাৎ গাড়ির ভেতর থেকে বেশ জোরে গান বেজে উঠল।
আমি দেখলাম, বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছে।
সে হাসির বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই।
শুধু অনুভব করতে পারলাম—ওটা টাকার হাসি নয়।
হয়তো গাড়ির মালিক তাঁকে পাঁচশো টাকা, হাজার টাকা কিংবা তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু পারিশ্রমিক দেবেন। কিন্তু মিউজিক সিস্টেমটা ঠিকঠাক বাজতে শুরু করার মুহূর্তে বৃদ্ধ মানুষটি যেন তার থেকেও অনেক বড় একটা পারিশ্রমিক পেয়ে গেলেন।
নিজের কাজটা ঠিকভাবে করতে পারার আনন্দ।
নিজের হাতে একটা মৃতপ্রায় যন্ত্রকে আবার গান গাওয়াতে পারার তৃপ্তি।
আর নিজের এতটা বয়স পেরিয়েও নিজের ভালো লাগার কাজটাকে ধরে রাখতে পারার এক নিঃশব্দ গর্ব।
ঠিক সেই একই হাসি আমি আমার হাজব্যান্ডের মুখেও দেখলাম।
সে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, ‘বহুত আচ্ছা, স্যার!’
বৃদ্ধ ভদ্রলোকও হাসলেন।
তারপর মিউজিক সিস্টেমের সঙ্গে লাগানো ব্লুটুথ থেকে একটা হিন্দি গান বাজিয়ে দিলেন। যেন নিজের কাজের সাফল্যের শেষ পরীক্ষাটুকুও তিনি সেরে নিলেন।
আমরা তাঁকে নমস্তে জানিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম।
আমার হাজব্যান্ড গাড়ি স্টার্ট করে আমাদের গাড়িতেও গান লাগাল।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, ‘কী গো! কী হলো তোমার? আমাদের গাড়িতে তো ভগবানের গান ছাড়া অন্য কিছু বাজে না!’
সে কিছু বলল না।
শুধু একবার শেষবারের মতো গাড়ির জানলা দিয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের দিকে তাকাল।
দেখলাম, তিনি আবার নিজের ছোট্ট টেবিলটায় ফিরে গেছেন। আরেকটা পুরোনো মিউজিক সিস্টেম খুলে বসেছেন। চারপাশের পৃথিবীটা যেন তাঁর কাছে আবার অদৃশ্য হয়ে গেছে।
আমার হাজব্যান্ড ধীরে ধীরে বলল, ‘বুঝলে, ভদ্রলোকের এত বয়স হয়েছে। তবু নিজের passion-টা ধরে রেখেছেন। এই রাস্তা দিয়ে যত গাড়ি-লরি যায়, তাদের মিউজিক সিস্টেম খারাপ হলে সারিয়ে দেন। দু-চার পয়সা কামান, আর নিজের passion-টাও বাঁচিয়ে রাখেন।’
আমি কোনও উত্তর দিলাম না।
জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলাম।
সামনে প্রশস্ত হাইওয়ে। দুপাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে কত মানুষ, কত গাড়ি, কত অজানা জীবন। কোথাও বাচ্চাদের নিয়ে পরিবার, কোথাও লরিতে বোঝাই মাল, কোথাও কেউ জীবিকার সন্ধানে ছুটছে, কেউ হয়তো ছুটছে বাড়ির দিকে। আর মাঝে মাঝে টেম্পো করে ভগবান গণেশের মূর্তি নিয়ে কিছু অতিউৎসাহী যুবকদল—পরের দিন গণেশ চতুর্থী।
আমাদের গাড়িতে তখন বাজছে ‘বীর-জারা’র চেনা রোমান্টিক গান।
আমি একবার আমার হাজবেন্ডের মুখের দিকে তাকালাম।
তার মুখেও সেই অদ্ভুত শান্তি।
সেদিন হঠাৎ মনে হলো, মানুষ আসলে কত রকমভাবে বেঁচে থাকে!
কেউ সংসারের জন্য, কেউ সন্তানের জন্য, কেউ দায়িত্বের জন্য, কেউ স্বপ্নের জন্য, কেউ ভালোবাসার জন্য। আবার কেউ কেউ নিজের ভালো লাগাটুকুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
বয়স সবসময় মানুষের ইচ্ছেগুলোকে বুড়ো করে দিতে পারে না।
কখনও কখনও একটা ছোট্ট টেবিল, কয়েকটা তার, কিছু পুরোনো যন্ত্রপাতি আর একটা মিউজিক সিস্টেমই হয়ে ওঠে কারও বেঁচে থাকার ঠিকানা।
হয়তো সেই বৃদ্ধ মানুষটির কাছে প্রতিটি সারিয়ে তোলা মিউজিক সিস্টেম শুধু একটা কাজ নয়। প্রতিবার একটা যন্ত্র আবার গানবা গাইতে শুরু করলে তাঁর নিজের ভেতরেও হয়তো একটু করে সুর ফিরে আসে।
তাই সেদিন মনে হলো, আমরা যাকে পারিশ্রমিক বলি, তা সবসময় টাকায় মাপা যায় না।
কখনও নিজের হাতে কোনও অকেজো জিনিসকে আবার সচল করে তোলার আনন্দই পারিশ্রমিক।
কখনও নিজের দক্ষতাকে শেষ বয়স পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার তৃপ্তিই পারিশ্রমিক।
কখনও বা কাজটা সফল হয়েছে বুঝে মুখে ফুটে ওঠা একটুকরো হাসিই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
গাড়ি তখন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে।
সামনের রাস্তা দীর্ঘ, মসৃণ, অবারিত।
পেছনে পড়ে রইল সেই ছোট্ট দোকান, ছোট্ট টেবিল আর এক বৃদ্ধ মানুষ—যিনি হয়তো জানেনও না, তাঁর দু-মিনিটের সেই হাসি আমাদের যাত্রার কতখানি পথ জুড়ে সঙ্গী হয়ে রইল।
আর আমি ভাবলাম—
জীবন আমাদের কত কিছুই না দেয়।
কখনও টাকা দিয়ে, কখনও মানুষ দিয়ে, কখনও অভিজ্ঞতা দিয়ে।
আর কখনও, একেবারে অচেনা কোনও মানুষের মুখের এক টুকরো তৃপ্তির হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দেয়—
বেঁচে থাকারও নিজস্ব কিছু পারিশ্রমিক আছে।

Post a Comment

5 Comments

  1. এই তো সত‍্যিকারের ইন্জিনীয়ার। লেখক এনাকে চিনতে পেরেছেন তাই অভিনন্দন। 🙏

    ReplyDelete
  2. শ্যামল মজুমদারSeptember 15, 2026

    এরেই কয় প্যাশন, যন্ত্রকে ভালবাসা।

    ReplyDelete
  3. পারিশ্রমিকের জন্য নয়, এক একটা বিষয়ে এক একজনের অদ্ভুত টান থাকে। খুব সুন্দর গল্প।

    ReplyDelete
  4. অসাধারণ লাগলো। 🙏🙏💐

    ReplyDelete
  5. অসাধারণ...

    ReplyDelete