লোককথা - বোকা তাঁতি



লোককথা - বোকা তাঁতি  
গল্প- ১২

সু ব্র ত কু মা র  মা ন্না    

বউয়ের পিঠে বােকা দুম দুম করে কিল দিল

শ্বশুরবাড়িতে কিন্তু বােকার খুব খাতির। শাশুড়ীমা বােকাকে নিজের ছেলের মতােই দেখেন। পিঠে, পুলি ভালােমন্দ কিছু হলেই মেয়ে জামাইয়ের ডাক পড়ে। শ্বশুরবাড়ি তাে আর বিদেশ বিভুঁইয়ে নয়। মাঝখানে শুধু একখানি মাঠ । মাঠের মাঝখানে খাল। খালধার ধরে হেঁটে গিয়ে খালটা পার হলেই মাঠের ওপারের গায়ে বােকার শ্বশুরবাড়ি।

ময়নামাসী গঞ্জের হাটে চাল বেচতে গিয়েছিল, ফিরে আসার সময় চালের বস্তা মাথায় হাঁক দিল, 'ও দিদি ও বােকা.... হাটে বােকার শাশুড়ীর সঙ্গে দেখা হল, তােকে আজ বিকেলে ডেকেছে যে'।

বােকা লাফিয়ে উঠে বলে, যাব।
মা বললেন, তা যাস।

বউ দরজার আড়ালে লজ্জিত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। বােকা জিজ্ঞাসা করে, 'তুমি যাবে নাকি?'

মা বলেন না ও যাবে না। তুমি ব্যাটাছেলে মানুষ হেঁটে চলে যাবে। সােমত্ত বউ দুদিন পরে ছেলের মা হবে - গায়ে হাওয়া লেগে যাবে। পরে গােরুর গাড়ি করে বৌমাকে আমি বাপের ঘরে রেখে আসবাে। বােকা জামা জুতাে পরতে লাগল। মা অবাক হয়ে বলেন, 'বাবা এখন কেন জামা পরিস ? ভাতটাত খেয়ে ওবেলা যাস'। বােকা আড়ি ধরে বলে , "না এখনই।" বােকা মাকে গড় হয়ে প্রণাম করে ছুটে বের হয়ে গেল। বউ যতদূর পথ দেখা যায় তাকিয়ে রইল। মা বলেন, "পাগল ছেলে, কোনাে কিছুতেই তর সয়নে।"

শ্বশুর বাড়িতে সবাই মহাখুশী। বােকা গড় হয়ে প্রণাম করে শাশুড়ির হাতে মিঠাইয়ের বাক্স দিল। শাশুড়ী বলেন, 'যাও বাবা চান করে এসাে, যা রান্না হয়েছে তাই একটু মুখে দেবে'। কলমীশাক ভাজা, মুগের ডাল, আলুপােস্ত দিয়ে পেটভরে দুপুরের খাবার খেয়ে নরম বিছানায় বিশ্রাম নিতে নিতে বােকা অঘােরে ঘুমিয়ে গেল। যখন ঘুম থেকে ওঠে সন্ধে হয় হয়। বােকা বলে, মা তবে বাড়ী যাই । শাশুড়ী বলেন, সেকি বাবা ... এতােদিন পরে এলে, আজ যাওয়া হবে না। চাল ভিজিয়েছি, পিঠে বানাবাে। কাল সকালে যে।

সন্ধেবেলা শাশুড়ী আসন পেতে থালা ভর্তি গুড় পিঠে বােকার সামনে ধরেন। বােকা খেয়ে দেখে ভীষণ সুস্বাদু। শাশুড়ী আরও খান চার পাঁচেক পাতে দিলেন। বােকা নামটা মনে রাখে – গুড়পিঠে। বাড়ি ফিরে গিয়ে মাকে আর বৌকে গুড় পিঠে বানাতে বলতে হবে। সারারাত বােকা ঘুমের মধ্যেও বিড় বিড় করে বলতে লাগল, -গুড়পিঠে..... গুড় পিঠে......গুড় পিঠে.....

সকালে উঠেই বােকা বাড়ির পথ ধরে। সারা রাস্তা মনে মনে বলে গুড় পিঠে...গড় পিঠে...গুড় পিঠে...। পথে কত লোক জামাইয়ের সাথে কুশল বিনিময় করে। বােকা মুখ খােলে না, পাছে নামটা ভুলে যায়। হাঁটতে হাঁটতে খালের ধারে পৌঁছাল। খালে একটু খানি জল, বােকা হুশ করে খাল পার হল, অমনি পিঠের নামটা বােকার মাথায় তালগােল পাকিয়ে গেল। বােকা বলতে  লাগল,--হুত্তা পিঠে.. হুত্তা পিঠে.. হুত্তা পিঠে ...
 
বাড়ি ফিরে মা কিছু বলার আগেই বােকা বলে, 'মা কাল হুত্তাপিঠে করবে ? মা বুঝতে না পেরে, জিজ্ঞেস করেন 'কি পিঠে ? - হুত্তা পিঠে গো..হুত্তা পিঠে....

বউও এমন অদ্ভুত নাম জীবনে শােনেনি, সে তো হেসে কুটিকুটি। বােকা বােঝানাের প্রাণপণ চেষ্টা করে। মা বুঝতে পারেন না, আর বৌ হেসে উল্টে পড়ে। বােকা প্রথমে লজ্জিত হল, তারপর বৌয়ের হাসি তার অসহ্য লাগল। বােকা রেগে লাল হয়ে বউয়ের পিঠে দুমাদুম করে কিল দিল। মা হাঁ হাঁ করে ওঠেন, কি করিস....কি করিস..

বােকা রাগ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বউ মাটিতে পড়ে কাঁদতে লাগল। বােকা সারাদিন ঘুরে বেড়াল। নাইল না, খেল না। রাগ পড়লে মনে মনে অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে খিড়কির দরজার কাছে এসে পৌঁছাল। মা কেঁদে বলেন, বৌকে এমন মারলি পিঠটাতে গুড় পিঠের মত ফুলে গেছে। বােকা আনন্দে লাফিয়ে বলল, “মা ঐ গাে ঐ.....গুড় পিঠে গাে গুড় পিঠে।”
______________________________________
নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে 
বোকা তাঁতির গল্প
www.jaladarchi.com

Comments

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো