জ্বলদর্চি

সেগুন-শালের অরণ্যগাথা /পর্ব ৫/ মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়

ছবি- অভিজ্ঞান ঘোষ

সেগুন-শালের অরণ্যগাথা
 পর্ব ৫: 
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় 

তেলিয়া হ্রদ ও ব্যাঘ্র রাজঘরানা

"এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি;
সারারাত দখিনা বাতাসে আকাশের চাঁদের আলোয়—
কাহারে সে ডাকে!
কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার;
বনের ভিতরে আজ শিকারীরা আসিয়াছে, আমিও তাদের ঘ্রাণ পাই যেন”।

 জীবনানন্দের লেখায় বনভূমি বারে বারে ধরা দিয়েছে। জীবন ও মৃত্যুর এক অমোঘ সম্পর্কের ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর এই লেখায়।

ক্লিক করে ভিডিও দেখে নিন👇

আজ জীবন ও মরণের সেরকমই এক সহাবস্থানের কথা বলব। জিপসির চাকা ধুলো উড়িয়ে থমকে দাঁড়াতেই বুকের মধ্যে উত্তেজনা গাঢ় হলো। গাছের ফাঁক দিয়ে যে কালো অবয়বটাকে নিছক পাথর ভেবেছিলাম, সেটা আলতো করে নড়ে উঠতেই ভ্রম ভাঙল। পাথর তো নয়! এ তো এক পূর্ণাঙ্গ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার! তেলিয়া হ্রদের শান্ত জলের কিনারায় মাথা নিচু করে জল খাচ্ছে আর সতর্ক হয়ে নজর রাখছে চারপাশে। তার গায়ের হলুদ-কালো ডোরার ওপরে দুপুরের চড়া রোদ এসে পড়েছে। তাডোবা-আন্ধারির এই বিখ্যাত তেলিয়া হ্রদ শুধুমাত্র একটি জলাশয় নয়, এটি এই অরণ্যের ক্ষমতার উৎস, কেন্দ্রবিন্দু বা বাঘেদের ইতিহাস লেখার রক্তক্ষয়ী গল্পকাহিনীর মূল রসদ বলা যেতে পারে।জঙ্গলের পরিভাষায় একে বলা যেতেই পারে বাঘেদের ‘সিংহাসন’। 
মে থেকে জুন মাসের তীব্র দাবদাহে যখন তাডোবার ছোট ছোট নালা বা জলের গর্তগুলো শুকিয়ে যায়, তখন এই বিশাল হ্রদটিই হয়ে ওঠে বনের প্রাণীদের মূল চালিকাশক্তি। স্বাভাবিকভাবেই, যার দখলে এই হ্রদ, এই বাঘ-মহালের একচ্ছত্র সম্রাট সে। গাইড বাইনোকুলারটা এগিয়ে দিয়ে জানায় এই হ্রদের মাটি একের পর এক বাঘেদের রাজবংশ তৈরি হওয়ার আর ভেঙে যাওয়ার সাক্ষী। যে বাঘটাকে সামনে দেখছি ও এই হ্রদের নতুন কোনো দাবিদার “নয়া মেল”। কিন্তু একসময় এই পুরো এলাকা শাসন করে গেছে লিজেন্ডারি বাঘিনী মায়া। জানালাম এ জঙ্গলের সাথে আমরা পূর্ব পরিচিত। মায়ার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে বহুবার। তাডোবার গল্প ‘মায়া’-র উল্লেখ ছাড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। বন্যপ্রাণী প্রেমীদের কাছে মায়া, মায়াময় এক জাদুকরী চরিত্র। ক্যামেরার সামনে তার রাজকীয় চলাচল, জিপসি গাড়িগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের খেয়ালে হেঁটে যাওয়া, আর নিজের শাবকদের এই হ্রদের পাড়েই শিকার শেখানোর গল্প তাডোবার রূপকথার পাতায় সোনার আখরে লেখা থাকবে। প্রকৃতির নিয়ম বড় নির্মম। এই হ্রদের অধিকার ধরে রাখতে মায়াকে লড়াই করতে হয়েছে বনের হয় সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ বাঘ ‘মটকা সুর’ -এর সাথে, আবার কখনো বা অন্য কোনো আগ্রাসী প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে। ক্ষমতা আর মাতৃত্বের সেই দ্বন্দ্বে এই হ্রদের জল বহুবার বাঘেদের রক্তে লাল হয়েছে। মায়া আর মটকার লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছি একবার, বেশ কিছু বছর আগে।
🍂
জল খাওয়া শেষ করে বাঘটি ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার বিশাল চওড়া থাবা বনানীর মাটিতে আঁকছিলো পাগমার্ক। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের জিপসি গাড়ির দিকে তাকাল। সেই হলদেটে, জ্বলন্ত চোখের চাউনিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল অবজ্ঞা— যেন সে আমাদের মনে করিয়ে দিতে চায়, আমরা তার সাম্রাজ্যের বিনা আমন্ত্রণের অতিথি মাত্র। 

বাতাসে একটা উগ্র গন্ধ ভেসে আসছে। জানা গেল অদূরেই ‘কিল’ অর্থাৎ শিকার রয়েছে। গত রাতে হয়ত কোন বন‍্যপ্রাণ, জঙ্গলের যুদ্ধে নিহত হয়েছে! তেলিয়া হ্রদের এই জীবন-মৃত্যুর খেলা, প্রাণীজীবনের “মৃত‍্যু” নামক অমোঘ সত‍্যকে আদিমরূপে মেলে ধরে। মৃত‍্যুর সাথে পান্জা কষে প্রতিমুহূর্তে বন‍্যপ্রাণের এই লড়াই, জীবনকে আরো ভালোবাসতে শেখায়। মানুষ‍্যজীবন যে পশুবৎ নয়, এ ভাবনা মনে প্রশান্তি আনে । 

এক রাজকীয় মন্থরতায় ঢুকে গেল হ্রদের ধারের উঁচু ঘাসবনের ভেতর। বাঘটি চোখের আড়ালে যেতেই টের পেলাম মনের উত্তেজনা যেন কিছুটা কমে এল! তবে অন্য বন‍্য চরিত্ররা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দেখলাম একটা ল্যাঙ্গুর গাছের ডাল থেকে ঝুপ করে নীচে নেমে এলো, একদল চিতল হরিণ আবার চঞ্চল পায়ে হ্রদের জলের দিকে এগোতে লাগল।

বাঘ এখানে শুধু একটি প্রাণী নয়, সে এই গোটা বাস্তুতন্ত্রের চালিকাশক্তি।
তবে বাঘের পাশাপাশি তেলিয়ার বিশাল আকৃতির কুমিরের কথা না বললেই নয়। পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই বিশালদেহি কুম্ভির। তেলিয়ার কুমির ও বাঘের মধ্যকার লড়াই দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। যদি কেউ পেয়ে থাকেন, নিঃসন্দেহে অতি সৌভাগ্যবান। এই জঙ্গলের বিখ্যাত বাঘিনী 'সোনম', শোনা যায়, তেলিয়ার হ্রদের কুমিরের মুখ থেকে শিকার ছিনিয়ে এনে তার বাচ্চাদের খাইয়েছে বহুবার। তেলিয়ার রোদ পোহানো কুমির এবং হ্রদের পাড়ে জল খেতে আসা বাঘ বা অন্যান্য বন্যপশুদের একই ফ্রেমে দেখার অনন্য অভিজ্ঞতা কেবল এখানকার মোহার্লি জোনের তেলিয়ার বুকেই সম্ভব।

একটা কথা জেনে রাখা দরকার যে, ভারতবর্ষের সমস্ত জঙ্গলের মধ‍্যে এই টাডোবাতেই সবচেয়ে বেশী বাঘ দেখার সম্ভাবনা। খালিহাতে সচরাচর এ জঙ্গল ফেরায় না। প্রসঙ্গত, একবার আমাদের ১৪ টি বাঘ ও একটি লেপার্ড, একটি বিকেলের সাফারিতেই দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।

তাডোবার এই রাজবংশের ইতিহাস সাথে নিয়ে এবার আমাদের ফেরার পালা, কারণ আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার পরবর্তী গন্তব্য আরও উত্তরে— যেখানে অপেক্ষা করছে কিপলিং-এর স্বপ্নের সেই আসল চাক্ষুষ রূপ, কানহার অন্তহীন ঘাস-সমুদ্র। তার আগে সেরে নেব একটি স্থানীয় গ্রাম পরিক্রমা। (ক্রমশ...)

Post a Comment

0 Comments