মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২৮
বিদ্যুৎ পাল (সম্পাদক - 'নয়ন' পত্রিকা, মেদিনীপুর)
ভাস্করব্রত পতি
তিনি 'নয়ন পাল'। আদরের 'নয়নদা'। অথচ এটি তাঁর পিতৃদত্ত নাম নয়। 'বিদ্যুৎ পাল' নামেই সরকারি খাতায় তাঁর আসল পরিচয়। আসলে মেদিনীপুরের বিদ্যুৎ পাল সম্পাদিত ছোটদের পত্রিকার নাম 'নয়ন'। দীর্ঘদিন ধরে ছোটদের সেই লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে ঈর্ষা করার মতো জনপ্রিয়তায় সাহিত্যমোদী জনগণের ভালোবাসায় অচিরেই এই সম্পাদক 'বিদ্যুৎ পাল' হয়ে উঠেছেন 'নয়নদা'! এ এক অদ্ভুত মেটামরফোসিস। এ এক মনোমুগ্ধকর সম্মান। এ এক ভালোবাসার প্রীতি উপহার। এভাবে কোনও সম্পাদকের নাম পরিবর্তন হয়ে সেই সম্পাদকের সম্পাদনায় প্রকাশিত কোনও পত্রিকার নামেই তাঁর পরিচিতিজ্ঞাপক সম্পর্ক হয়ে ওঠার ঘটনা বিরলতম দৃষ্টান্ত এবং সাহিত্যের জগতে এক দৃষ্টিনন্দন উদাহরণ। এ যেন কবিগুরুর গানের 'নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে / হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে'! আজ 'মেদিনীপুরের নয়নদা' খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন ছোটদের জন্য 'সামান্য' একটা পত্রিকা প্রকাশ করে। সেইসাথে ধারাবাহিকভাবে তা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
মেদিনীপুরের এই 'মানুষ রতন'টি তাঁর পত্রিকা 'নয়ন'এর হাত ধরে ১৯৮৪ সালে (১৩৯১ বঙ্গাব্দ) প্রথম পথচলা শুরু করেন। গুটিগুটি পায়ে সেই হাঁটার দৃশ্য মনে করিয়ে দিত হীরেমানিকের গান 'এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাবো, সেই চাঁদের পাহাড়, ঠিক দেখতে পাবো'। তিনি তাঁর কাগজের অবয়বে দৃশ্যমান দুই মলাটের সেই হৃদয়ের বাষ্পচাপ নিয়ে কম্পিউটার, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম, এ আই, চ্যাট জিপিটির সঙ্গে আজ অসম লড়াই করে দিব্যি প্রাণচঞ্চল রয়েছেন ছোটদের মনের অন্তরীক্ষে। ছোটদের জন্য বড়দের ক্ষুরধার লেখনীতে।
১৯৫৭ এর ১৪ ই ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার হরিশ চ্যাটার্জী স্ট্রিটে। বাবা ছিলেন রাজকৃষ্ণ পাল ও মা গীতাঞ্জলি পাল। চাকরিসূত্রে চলে আসেন মেদিনীপুর। ১৯৭৪ সালে শালবনিতে প্রথম চাকরি পান। কিন্তু ১৮ বছর বয়স তথা ১৯৭৬ সাল থেকে সেই চাকরি পাকা হয়। সেসময় মা ছিলেন সোশ্যাল এডুকেশন অফিসার। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই লেখালেখি শুরু। মায়ের উৎসাহেই নয়নের পথচলা শুরু। এই নাম তাঁরই দেওয়া। আর নয়নের অবয়ব ঠিক রাখতে এবং পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে অর্থের অভাবে নিজের স্ত্রী ইলা পালের গয়না বিক্রিও করতে হয়েছে এই মেদিনীপুরীয়ান সম্পাদককে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত চাকরি করেছেন জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগে। বিদ্যুৎ পালের কথায়, "আঠারো বছর বয়স থেকে সরকারি চাকরি, ৪০ বছর ধরে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরে কাজ করে মানুষের জন্য শুধু জল (জীবন)দান করে এসেছি"। এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত স্বীকৃত 'বুড়ো'। নেই 'কাজ'। তাই মজে থাকেন নয়নের প্রতি সজাগ দৃষ্টি নিয়ে। যা বিগত চল্লিশ বছর ধরে একনাগাড়ে করে চলেছেন বিরামহীনভাবে।
স্ত্রী ইলা পাল। পত্রিকা সম্পাদনার অন্যতম অনুপ্রেরণা।
প্রথম যখন 'নয়ন' প্রকাশিত হয়েছিল, তখন এর দাম ছিল মাত্র দু টাকা! পরবর্তীতে দাম বেড়ে হয় পাঁচ টাকা! ১৯৮৯ থেকে আরও খানিকটা দাম বেড়ে হয় দশ টাকা। সেইথেকে আজ পর্যন্ত টানা সাঁইত্রিশ বছর ধরে নয়নের দাম ঐ দশ টাকাই! দিন বদলের সাথে সাথে সব জিনিসের দাম বাড়লেও এই মাগ্গি গণ্ডার যুগে ঢাউস আকারের নয়নের দাম কিন্তু বাড়েনি। একই রয়েছে। মাত্র দশ টাকা!
'নয়ন'-এর বিভিন্ন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন বছরে। যা শিশু কিশোরদের সাহিত্যের রসনাতৃপ্ত করেছে বছরভর। বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প, রূপকথার গল্প (২ টি সংখ্যা), ছড়া, ভৌতিক ছড়া, বিজ্ঞান সংখ্যা ইত্যাদি বিষয়ে পরিপূর্ণ থেকেছে আদরের নয়ন। কে কে লেখেননি এখানে? মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, কার্তিক ঘোষ, দীপ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ এরাজ্যের বিশিষ্ট ছড়াকারদের কলমে পরিপুষ্ট হয়েছে নয়ন। সেইসব অমূল্য লেখার রসাস্বাদন করেছে নয়নের গ্রাহক, পাঠক ও লেখকরা। এখনও পর্যন্ত বিদ্যুৎ পালের নয়ন পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা মিলিয়ে লিখেছেন প্রায় পাঁচ হাজার স্বনামধন্য, প্রতিষ্ঠীত, অপ্রতিষ্ঠিত, অনামা এবং আনকোরা কচিকাঁচার দল। এ এক অভূতপূর্ব কার্য সম্পাদন। 'তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম' সুলভ ভাবনায় জারিত হয়েছে বারংবার। পক্ষীরাজ মৎস্যকন্যা, ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী, রাক্ষস ক্ষোক্ষস, রাজা রাণী, মন্ত্রী কোটাল, ফুল পাতা, আলো আঁধার, সুখ দুঃখ, ভালো খারাপ, ধনী গরিবদের কথা উঠে এসেছে কবিতা, ছড়ার ছত্রে ছত্রে। আর ছোটদের নিয়ে গিয়েছেন পান্তাবুড়ির সংসার থেকে আর্থার কোনান ডয়েলের 'দি লস্ট ওয়ার্ল্ড'-এ।
সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলা ভাষার লেখকদের কাছ থেকে লেখা আসে এই দশ টাকার পত্রিকার জন্য। কি যাদু আছে এতে? কি মহিমা আছে এতে? কি লাভ হয় এখানে ছড়া প্রকাশিত হলে? এসবের একটাই উত্তর - 'সম্পাদকের কৃতিত্ব'। সম্পাদকের ভূমিকা। সম্পাদকের প্রতি অসীম বিশ্বাস, আস্থা এবং ভালোবাসা। প্রতিটি লেখকের কাছে নয়নের সৌজন্য কপি যথাসময়ে পৌঁছে যায়। সুদূর অষ্ট্রেলিয়ার বুকে স্টিভ ওয়াগের দেশেও পৌঁছে যায় আদরের 'নয়ন'। বিদ্যুৎ পালের কথায়, "মানুষের ভালোবাসা ও মানুষের স্বীকৃতি আমার কাজের বড় পুরস্কার। এটাই আমার পাথেয়। আজ পর্যন্ত নিজের জন্য কিছুই করিনি। এই মুহূর্তে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে যে ব্যবসা শুরু হয়েছে, আমি তার বিরুদ্ধে সবসময়। 'নয়ন' তারই প্রতিফলন।"
ছোটদের সাথে ছোটদের পত্রিকা 'নয়ন' এর সম্পাদক বিদ্যুৎ পাল
কলকাতার কৃত্রিমতা তিনি পছন্দ করেন না কোনওকালেই। মেদিনীপুর থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা কলকাতায় গেলে পাবেননা, এই ভাবনা পোষণ করে আর কখনও নিজের পৈতৃক বাসভবন কলকাতামুখো হননি। আসলে গ্রামবাংলার রসদ খুঁজে বের করতে করতে তিনি মেদিনীপুরের বুকে থেকে গিয়েছেন। তাঁর কাছে নমস্য হয়ে উঠেছে মেদিনীপুরের জল, মাটি, আকাশ, বাতাস, পাখি, গাছপালা আর লোকজন। এখানেই ছড়ার বৃক্ষে জলসিঞ্চন করেন সাদা কাগজের বুকে কলমের আঁচড় টেনে।
তিনি নিজেকে একজন লিটল ম্যাগাজিন কর্মী হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। এক্ষেত্রে তাঁর নির্দিষ্ট কিছু ভাবনা কাজ করে। যার ফলে নিজের জন্য কিছু করতে চাননা। নিজের কলমের সৃষ্টির প্রায় তিন হাজার বিভিন্ন লেখা জমা থাকলেও তা দিয়ে নিজের বইপ্রকাশ করার ইচ্ছে জাগেনি। তাঁর লেখা গল্প কবিতাগুলো এখনও খেরো খাতায় বন্দী। দুই মলাটের আলিঙ্গনে কখনও ধরা পড়েনি। মোটকথা, ধরা দিতে চাননি। তাঁর কথায়, "আমি ভালো সম্পাদক হতে চাই। আমি বলি না, আমি ছড়াশিল্পী। আমি একজন কবি হিসেবে নিজেকে দেখি। আমার ধ্যান জ্ঞান ছোটদের নয়নকে ঘিরেই।"
শালবনীতে থাকাকালীন সেখানে গড়ে তুলেছিলেন বিশেষ সাহিত্য ও সংস্কৃতির অখণ্ড পরিসর। গঠন করেছিলেন বিভিন্ন সংগঠন। শালবনী ছেড়ে মেদিনীপুর খড়গপুর চলে এলেও সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নির্যাস পান করেছে শালবনীর মানুষজন। এখানে তিনি গঠন করেছিলেন শালবনী শিশু সঙ্গী এবং শালবনী শিশু শিল্পী সংস্থা। তখন এখানে প্রতিদিন মাঠে একশ জন শিশু কিশোর খেলতো তাঁরই তত্বাবধানে। আজ অবশ্য তা বন্ধ হয়ে গেছে শালবনী ছেড়ে চলে আসার পর। তবে এখনও তিনি বিভিন্ন শিশু সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ব্রতচারী, ফিল্ম সোসাইটি, তরুণ থিয়েটারের সাথে পাওয়া যায় বিদ্যুৎ পালকে। অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিনে তিনি লেখেন। কিন্তু নিজের লেখা নিয়ে আলাদা বই প্রকাশ করার ভাবনায় নিজেকে ভাসাননি। মনখারাপের কবিতা আর মনভালোর কবিতায় তিনি তাঁর উপলব্ধি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে --
"হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত এখন
তরুণের তরতাজা 'মন' ছিল,
কোকিলের কুহু কুহু ডাক ছিল,
যৌবনের বাঁধভাঙা বান ছিল,
রাত হলে জুঁই বেলার ঘ্রাণ ছিল,
ভোর হলেও দুচোখে ঘুম ছিল
ধেড়ে খোকার 'মা'এর কোল ছিল।
এখন কিছুই নেই যদি হয়
তবুও তো আছে কিছু কিছু
প্রেমের কোলে হাসি আছে
ঘুমের কোলে স্বপ্ন আছে
বিশ্বাসের সাথে শক্তি আছে
ভক্তির সাথে শ্রদ্ধাও আছে
তিনি একজন ভালো হরবোলা। নানা ধরনের কন্ঠের নকল করতে পারেন। ছোটদের জন্য নাটক লেখেন, পরিচালনা করেন। নিজের হাতেই পোশাক ও মেকাপ শেখান। মঞ্চে অভিনয় করেন, শর্ট ফিল্মে অভিনয় করেন। সব মিলিয়ে একজন যথার্থ সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন পুরুষ। এবছর (২০২৬) তিনি পেয়েছেন 'আপনজন পুরস্কার'। যা তাঁর দীর্ঘদিন ধরে লিটল ম্যাগাজিনকে আঁকড়ে নিবিড় সাহিত্যসেবার স্বীকৃতি। এছাড়াও পেয়েছেন 'শিবরাম চক্রবর্তী পুরস্কার' (২০০৪), ঘাটাল থেকে লক্ষ্মণ কর্মকার সম্পাদিত সৃজন পত্রিকার 'সৃজন সম্মান' (২০২২), তাপস মাইতির 'উপত্যকা সম্মান', 'কাঁসাই কবিতা উৎসব পত্রিকা সম্মান' ইত্যাদি।
প্রতিবছরের মতো এবছরের 'নয়ন' বিশাল বপু নিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রায় ২০৮ পৃষ্ঠার। দাম কিন্তু মাত্র দশ টাকাই। তিনি তাই 'দশ টাকার সম্পাদক'! অতি সস্তার সম্পাদক! অবশ্য যে দশ টাকার মূল্য ক্যালকুলেটরের কি বাটন টিপেও হিসাব করা যায়না! যে দশ টাকার প্রকৃত মান নির্ধারণ করতে হলে নিজেকে পরিশীলিত করতে হয় ত্যাগ, তিতীক্ষা, আত্মনিয়োগ, পরিশ্রম আর নাছোড়বান্দা মানসিকতার সাথে। যে দশ টাকার হিসেব বুঝতে 'ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো'র সংকল্প করতে হয় হাতে দু টাকার কলম নিয়ে। এভাবেই সাদা কাগজের পাতায় পাতায় অক্ষরের আলপনা সাজিয়ে কথাসাহিত্যের প্রদীপ জ্বালানোর দুরূহ কাজ সহজভাবে সামলাতে 'দশ টাকার সম্পাদক বিদ্যুৎ পাল' থেকে হয়ে উঠেছেন দেশের এবং দশের 'নয়ন পাল'!
🍂
0 Comments