তুলি মুখার্জি চক্রবর্তী
প্রত্যেক বছর বাড়ি থেকে দল বেঁধে ঘুরতে যাওয়া আমাদের এই বাড়ির রেওয়াজ। বাড়ি মানে একান্নবর্তী পরিবার নয়, চৌষট্টি ঘর এক উঠোনের হাউজিং সোসাইটি। তা বেশ আছি আমরা ভালোয় মন্দে একসাথে। ঠিক হলো পাশের রাজ্য উড়িষ্যার কিছু পর্যটন স্থল যাওয়া। সবাই হৈ হৈ করে গোছগাছ নিয়ে পড়লাম। রাস্তায় কি কি লাগতে পারে যা কাছে নেই সেসবের লিস্ট হলো। চলতে লাগল কেনাকাটা এবং এর ওর সাথে আলোচনা। এগুলো মহিলাদের ডিপার্টমেন্ট। ওদিকে ছেলেরা ট্রেনের যাতায়াতের টিকিট কাটা, বেরহামপুরে নেমে হোটেল এবং ঘোরাঘুরির জন্য বাস ঠিক করা, রিসোর্ট ঠিক করা এবং কোথায় কোথায় যাব তার রুটম্যাপ ঠিক করতে লাগলো। কিছু জোড়ে কিছু বাদ যায়, এভাবে কাটা ছেঁড়া জোড়া তালি দিয়ে সময় সম্পূর্ণ হলো। অনেক গুলো স্পট ভ্রমণ এবং থাকা। পনেরটা ফ্যামিলি। ৪২ জন সবমিলিয়ে। রাতের ট্রেন। বাসে করে পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশন। লাগেজ নিয়ে উঠে গেলাম নিজেদের কামরায় এবং যে যার সিটে। কিছু সিট অদলবদল করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল নটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম বেরহামপুর। জিনিসপত্র গুছিয়ে সবাই উঠলাম বাসে। বাস এগিয়ে চললো গোপালপুরের দিকে। বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে একটা চেক পয়েন্ট এলো। সব গাড়ি ওখানে থামিয়ে পারমিশন দেয়। প্রোটেক্টেড এরিয়া মনে হলো। অপেক্ষার মধ্যে আমাদের একজন একগাদা সেদ্ধ ডিম নিয়ে হাজির। সঙ্গে ঝাললবণ।সবাই দুটো করে ডিম ছাড়িয়ে খাচ্ছি মহানন্দে।
এরমধ্যে আমাদের একজন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, 'আমার ছোট ব্যাগ!! ওটা হুকে ঝুলানো ছিল। আমি নিয়ে নামতে ভুলে গেছি ' বলেই হাউমাউ কান্না। এক মিনিট আগেই বেচারা কপকপ করে সেদ্ধ ডিম খাচ্ছিল।খাওয়ার আনন্দ মাটি।
🍂
তো ব্যাগে কি ছিল সকলের প্রশ্ন, উনি বললেন ওনার তিনখানা গোপাল ছিল ঐ ব্যাগে। বলেই আবার কান্না। সামনের সিটের রডে মাথা ঠুকে ঠুকে। হাসি পাচ্ছিল আবার গোপালদের কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছিল। ব্যাগ বন্দি তিন গোপাল কোথায় চলে যাচ্ছে একা একা....
ঐ ট্রেনেই চেন্নাই যাচ্ছিলেন একদল প্রফেসর। ওনাদের সেমিনার আছে। আলাপে বলেছিলেন। ওনাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আগত এক প্রফেসর দম্পতিও ছিলেন। সকলেই ইতিহাসের। আমাদের সম্পর্ক দেখে ওনারা এতটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন।
নেমে যখন দাঁড়িয়ে আছি তখন সেই বাংলাদেশের প্রফেসর,বেশ বয়স্ক মানুষ, এগিয়ে এসে ওনার কার্ড দিলেন আমাকে। সামান্য সৌজন্য বিনিময় করতেই ট্রেনের সময় হয়ে গেল এবং উনি উঠে পড়লেন। আমি কার্ডটা ব্যাগে রেখে দলের সঙ্গে বাসে উঠেছিলাম। এই কথা বলতেই সকলে কার্ডটা চাইল। ঐ একটা সূত্রে যদি সুরাহা হয়। ওনার বাংলাদেশের নম্বরে অনেক চেষ্টা করেও ফোন যায়নি। ইন্টারন্যাশনাল রোমিং করা ছিল না। মেল আইডিতে মেইল করা হলো। নো উত্তর। কলেজ পড়ুয়া চারটে মেয়ে ফেসবুক ইন্সটাগ্রামে ওনাকে খুঁজতে লাগল। একমাত্র পথ এটাই যদি যোগাযোগ করা যায় তাহলে পরের স্টেশনে উনি যেন রেল কর্মচারীদের কাউকে ব্যাগটা দেন এবং স্টেশনটা বলেন আমাদের। কিন্তু আশার আলো পুরো অন্ধকার। কোনোমতেই যোগাযোগ হলোনা।
গোপালদের মায়ের কান্না আরো বাড়লো। সবাই চুপ। ছেলেরা আলোচনা করছে। এরমধ্যে একজন বললো রেলের হেল্প ডেস্ক নম্বর বার করে ফোন করা হোক। সময় বলছে ট্রেন উড়িষ্যা ছাড়িয়ে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রবেশ করেছে। অভিভাবকহীন তিন গোপাল চলেছে ব্যাগে ঝুলে ঝুলে। আমরাও হাসি ভুলে কাঁদো কাঁদো। হঠাৎ উল্লাস ছেলেমহল থেকে। ফোনে কথা হয়েছে। ট্রেন নম্বর, কোচ নম্বর, সিট নম্বর সব জেনেছেন ওনারা মানে রেল কর্তৃপক্ষ। খানিক পরে রেলের তরফে ফোন এলো। অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়নগরম স্টেশনে গোপালদের নামিয়ে রাখা হয়েছে। গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ওফফ, পাথর চাপা কষ্টের ইতি।
1 Comments
Lovely...such a powerful & inspiring read.Keep sharing your inside talent which truely touches reader's heart.
ReplyDelete