দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৬ই অক্টোবর বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস, মানব জীবনে এই দিবসের গুরুত্ব অনেক, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
সক্ষমতার নতুন দিগন্ত
প্রতিবছর ৬ই অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। দিনটি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থার বিষয়ে মানুষকে জানানোর দিন নয়, এটি সমান অধিকার, মর্যাদা, সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার অঙ্গীকারেরও দিন। সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর পাশাপাশি তাঁদের সক্ষমতা, প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়াই এই দিনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সেরিব্রাল পালসি বা Cerebral Palsy (CP) হলো, এমন একটি স্নায়বিক অবস্থা, যা মূলত শরীরের নড়াচড়া, ভারসাম্য ও অঙ্গভঙ্গির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এটি সাধারণত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের সময় কোনো ক্ষতি বা অস্বাভাবিকতার কারণে দেখা দেয়। কারও চলাফেরায় বেশি সমস্যা হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম। অনেকের কথা বলা, দেখা, শোনা বা শেখার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেরিব্রাল পালসি একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। একজন মানুষ সেরিব্রাল পালসি নিয়ে জন্মেছেন বা জীবনযাপন করছেন বলেই তাঁর স্বপ্ন, প্রতিভা কিংবা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় না উপযুক্ত চিকিৎসা, থেরাপি, শিক্ষা, সহায়ক প্রযুক্তি এবং পরিবারের সহযোগিতা পেলে সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত অনেক মানুষ নিজেদের দক্ষতা বিকশিত করে শিক্ষা, কর্মজীবন, শিল্প, খেলাধুলা ও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় প্রতিবন্ধকতার চেয়ে সমাজের তৈরি বাধাই একজন মানুষের পথকে বেশি কঠিন করে তোলে। চলাচলের উপযোগী রাস্তা বা ভবন না থাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকা, কর্মক্ষেত্রে সুযোগের অভাব, কিংবা মানুষের ভুল ধারণা, এসবই তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে।
সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সমান অধিকার ও সুযোগ।
একজন সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশুকে করুণার চোখে না দেখে তার সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত। স্কুলে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক ব্যবস্থা, সহজে চলাচলের পরিবেশ, উপযোগী শিক্ষা-পদ্ধতি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা দরকার। পরিবারের সদস্যদেরও শিশুটিকে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না করে তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্বনির্ভর হতে উৎসাহিত করতে হবে। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও সময়মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে পারে। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু এবং সমাজ যদি পাশে থাকে, তাহলে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ শুধু প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নয়, সবার জন্যই ভালো সমাজ। এমন একটি পরিবেশ যেখানে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী সহজে প্রবেশ করতে পারেন, যেখানে যোগাযোগের বিভিন্ন পদ্ধতিকে সম্মান করা হয়, যেখানে শিক্ষায় ভিন্ন প্রয়োজনকে বিবেচনা করা হয় এবং যেখানে কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক ও আধুনিক সমাজ। আমাদের প্রত্যেকের ছোট,ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারও চলাফেরার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা আটকে না রাখা, সাহায্যের প্রয়োজন হলে আগে জিজ্ঞেস করা, কাউকে নিয়ে উপহাস না করা, স্কুলে সহপাঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা, এসব সাধারণ আচরণই একটি মানুষের জীবনকে আরও সহজ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে পারে আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত, সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের আমরা তাঁদের সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়, তাঁদের সম্ভাবনা দিয়ে দেখব। তাঁদের জন্য এমন একটি সমাজ গড়ে তুলব যেখানে জন্মগত বা শারীরিক কোনো পার্থক্য স্বপ্ন দেখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস তাই শুধু সচেতনতার দিন নয়, এটি আমাদের মানবিকতার পরীক্ষা। একজন মানুষের সক্ষমতাকে সম্মান করা, তার কথা শোনা এবং তাকে সমান সুযোগ দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি। সেরিব্রাল পালসি কোনো মানুষের স্বপ্নের শেষ নয়। সঠিক সহায়তা, সুযোগ ও সম্মান পেলে সক্ষমতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। আসুন, করুণার নয়, সম্মান, অধিকার, সুযোগ ও অংশগ্রহণের সমাজ গড়ে তুলি।
0 Comments