জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/ পর্ব ৩৩/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ৩৩

প্রীতম সেনগুপ্ত 

শঙ্করাচার্যের কর্মবাদ এবং স্বামী বিবেকানন্দের কর্ম ধারণা এই দুইয়ের মধ্যে একটা প্রভেদ আছে। এই বিষয়ে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দশম সঙ্ঘাধ্যক্ষ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজীকে প্রশ্ন করা হয় ---“মহারাজ, ‘কর্ম কেবলমাত্র চিত্তশুদ্ধি ঘটায় কিন্তু মুক্তিদয়ক নয়’--- শঙ্করাচার্যের এই বক্তব্যের উপর তাহলে কতটা গুরুত্ব আমরা দেব?

এর উত্তরে তিনি বলেন---‘ওটা শঙ্করাচার্যের মত। শঙ্করের কর্মবাদ স্বামীজীর কর্মবাদ থেকে ভিন্ন। প্রতিটি যোগ স্বাধীনভাবে একই লক্ষ্যে নিয়ে যায়। কেবলমাত্র নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারাও আমরা সেই সর্বোচ্চ অনুভূতি লাভ করতে পারি। গীতাতে আছে:

সাংখ্যযোগৌ পৃথগ্ বালাঃ প্রবদন্তি না পণ্ডিতাঃ।

একমপ্যাস্থিতঃ সম্যগুভয়োর্বিন্দতে ফলম্।। (৫/৪ )

যৎ সাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদযোগৈরপি গম্যতে ।

একং সাংখ্যঞ্চ যোগঞ্চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।। (৫/৫)’

আবার দ্বৈত-অদ্বৈত সংঘাতের বিষয়ে তিনি বলছেন ----‘আমরা সবাই এই জগতের মধ্যেই সম্পূর্ণ ডুবে আছি। আমাদের কাছে অদ্বৈত কেবলমাত্র বৌদ্ধিক দর্শন মাত্র; কাজের বেলা আমরা দ্বৈতবাদী। জগৎ সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজকে কেবল কাজ হিসেবে ধারণা করা নয়, আমরা কাজকে উপাসনা বা সাধনারূপেই গ্রহণ করি। যদি পাথরের প্রতিমার উপাসনায় কেউ আধ্যাত্মিক জ্ঞানালোক লাভ করে তাহলে জীবন্ত মানুষের সেবা ও পূজায় কেন হবে না?’

অদ্বৈত অনুভূতি বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় ---‘অদ্বৈত অনুভূতি কি সর্বোচ্চ?’

এর উত্তরে তিনি বলেন -- ‘হ্যাঁ, শ্রীরামকৃষ্ণও প্রথমে জগজ্জননীকে এবং পরে অদ্বৈত অনুভব করেছিলেন।

প্রশ্ন --- মহারাজ, একদিন কথাপ্রসঙ্গে পূজনীয় স্বামী তপস্যানন্দজী মহারাজ বলেছিলেন যে, অদ্বৈত অনুভবকেই সর্বোচ্চ বলে রামানুজ মনে করতেন। সেই অবস্থায় জীবাত্মার স্ব-অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। ঈশ্বর থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করলেও কেবলমাত্র ঈশ্বরের বোধটুকু থাকে। এখানে ‘ঈশ্বর’ কিন্তু সাধারণভাবে আমরা যা বুঝি অর্থাৎ রূপ বিশিষ্ট ব্যক্তিবিশেষ নন। তাঁকে অধ্যাত্ম বস্তু এবং মানুষের ভাষায় যথাযথ বর্ণনা করা যায় না।

মহারাজ --- হ্যাঁ। সেই অনুভূতিতে ঈশ্বর, আমরা যা মনে করি তেমন কোন ব্যক্তি নন। কিন্তু সর্বোচ্চ নির্বিকল্প সমাধিতে জীবাত্মার অস্তিত্বও থাকে না।

প্রশ্ন -- তাহলে নির্বিকল্প সমাধি কি সর্বোচ্চ অনুভূতি? 

মহারাজ --- হ্যাঁ। নির্বিকল্প সমাধির অনুভবই সর্বোচ্চ।

প্রশ্ন---- ... শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের দার্শনিক মতবাদ অনুসারে কিভাবে অপসরণশীল দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত ও অদ্বৈত মতবাদ গুলি সুসামঞ্জস্যভাবে মিশ্রিত ও সমন্বিত হলো? কিভাবেই বা ‘পরমসত্ত্বা’, ‘ঈশ্বর’, ‘জগৎ’ ও ‘সাধনা’ এই পৃথক ধারণাগুলি সমন্বয় করা গেল?

মহারাজ ----যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণে একটা শ্লোক আছে। একদিন সভায় রামচন্দ্র হনুমানকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে তাঁকে কি দৃষ্টিতে দেখে। হনুমান ভাবল, এই সভায় নানা মতের এত লোক থাকা সত্ত্বেও কেন প্রভু এমন প্রশ্ন করলেন। হনুমান উত্তর দিল --- 

দেহবুদ্ধ্যা দাসোহস্মি তে জীববুদ্ধ্যা ত্বদংশকঃ।

আত্মবুদ্ধ্যা ত্বমেবাহম্ ইতি মে নিশ্চিত মতিঃ।।

এটাই পরমসত্ত্বা, ঈশ্বর ও জগৎ সম্বন্ধীয় পৃথকভাবের যথাযথ মীমাংসা, কারণ এই তিন ধরনের ধর্মীয় অনুভূতি হলো তিনটি দার্শনিক মতবাদের ভিত্তি স্বরূপ এবং প্রতিটি মতবাদ এই পর্যন্তই সত্য।

(তথ্যসূত্র:  স্বামী বীরেশ্বরানন্দ --- এক দিব্য জীবন)

  ( ক্রমশ)

🍂

Post a Comment

0 Comments