পর্ব ৭
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়
অরণ্য-করিডোর: বন্যপ্রাণের আদিম মহাসড়ক
তাডোবার রুক্ষতা আর চন্দ্রপুরের কয়লার গন্ধ পেছনে পড়ে রইল। আমাদের গাড়ি এবার উত্তর-পূর্ব অভিমুখে ছুটবে। কিছুদূর এগোতেই পিচের রাস্তার দুপাশে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো জঙ্গল। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বনভূমি। জঙ্গলের এই পথ বড্ড মন কেমন করা। মনে হয় বিগত জন্মের কোন গভীর আত্মীয়তা বুকে লুকিয়ে দুহাত আগলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুপাশের এই দীর্ঘ বনাঞ্চল। এসে পড়লাম ‘পেন্চ-কানহা করিডোর’ এ। প্রায় ১৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এক আদিম অরণ্য-সেতু, যা পেন্চ এবং কানহা— এই দুই বিখ্যাত ব্যাঘ্র-সাম্রাজ্যকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে। ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই সংযোগ পথ। ভান্ডারা এবং বালাঘাট হয়ে কানহার দিকে এগোতে এগোতে এসে পড়লাম সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর পাদদেশের কাছাকাছি। এখানে রয়েছে কিছু ছোট ফরেস্ট ঘাট। ঘাট বলতে মূলত বনের ভেতরের আঁকাবাঁকা উঁচু নীচু রাস্তা কে বোঝায়। পাহাড়ের গায়ে বা বনের মধ্য দিয়ে তৈরি আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু এবং বিপজ্জনক বাঁকযুক্ত পাহাড়ি রাস্তাকে ঘাট রোড বলা হয়।
একটি বাঘের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যেমন জঙ্গলে যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্যের সংস্থান থাকা প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তার বংশবৃদ্ধিতে জিনগত বৈচিত্র্য বা জেনেটিক ডাইভারসিটি। আজকাল তাই ব্যঘ্র সংরক্ষনের সাথে সাথে, জঙ্গলের মধ্যে কোরিডোর বা সংযোগ পথ তৈরি করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে এক জঙ্গলের বাঘ অন্য জঙ্গলে গিয়ে প্রজনন করতে পারে এবং জিনগত বৈচিত্র্য বজায় থাকে। বহু সময় ধরে মধ্যভারতের বাঘেরা নিজেদের এলাকা বদল করতে বা নতুন ডেরা খুঁজে নিতে বা সঙ্গীর সন্ধানে এই প্রাচীন করিডোর বা মহাসড়ক ব্যবহার করে এসেছে। এটি কোনো কৃত্রিম পার্ক নয়; এটি এক প্রাকৃতিক সবুজ করিডোর, যার ওপর দিয়ে বাঘ, লেপার্ড বা বন্য কুকুরের দল এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে মাইলের পর মাইল নিঃশব্দে হেঁটে যায়। কিপলিং যখন তাঁর উপন্যাসে নেকড়েদের দলবদ্ধভাবে এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে যাতায়াতের কথা লিখছিলেন, তখন এই করিডোরই ছিল তাঁদের অবাধ যাতায়াতের পথ।
কিন্তু সভ্যতা যত এগোয়, প্রকৃতির পথ ততই সংকীর্ণ হয়ে আসে। এই আদিম বন্য মহাসড়কের বুক চিরে তৈরি হয়েছে ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ন্যাশনাল হাইওয়ে ৪৪। গাড়ির দ্রুতগতি, হেডলাইটের তীব্র আলো আর চাকার ঘর্ষণ এই করিডোর দিয়ে বাঘেদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। সুখের বিষয় হলো পরিবেশবিদ আর বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর, এই হাইওয়ের ওপর এখন তৈরি হয়েছে এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ এবং প্রথম ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফ্লাইওভার’ ও আন্ডারপাস। হাইওয়ে এখন চলে গেছে মাথার ওপর দিয়ে, আর তার নিচে বাঘেদের জন্য তৈরি করে দেওয়া হয়েছে কৃত্রিম অরণ্যপথ।
"প্রকৃতি তাঁর নিজের ভক্তদের যা দেন, তা অতি অমূল্য দান। অনেক দিন ধরিয়া প্রকৃতির সেবা না করিলে কিন্তু সে দান মেলে না।" আরণ্যক উপন্যাসে লেখা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভাবনা যথাযথ।
দুপুরের ম্লান আলোয় যখন আমরা সেই আন্ডারপাসের একটির কাছাকাছি এসে দাঁড়ালাম, দেখলাম তীব্র গতিতে ছুটে যাচ্ছে মালবোঝাই ট্রাক, অজস্র গাড়ি। আর ঠিক তার নিচেই, মাটির নরম ট্রেইলে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে সদ্য চলে যাওয়া কোনো এক পূর্ণাঙ্গ বাঘের চওড়া থাবার টাটকা দাগ বা পাগমার্ক। সভ্যতার তীব্র কোলাহলের সাথে বন্য প্রাণীর এমন নিঃশব্দ সহাবস্থান যে অধিকার বুঝে নেওয়ার এক নিত্য লড়াই, তা সহজেই অনুমেয়।
এই আন্ডারপাস পার হতে গিয়ে মনে হতেই পারে এ কেবল রাস্তা পারাপার নয়, এ যেন এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে প্রবেশ। একের সাথে অন্যের খুব কমই মিল। এ যেন দুই ভিন্ন গ্রহ। করিডোরের এই জটিল গোলকধাঁধাঁ পেরিয়ে আমাদের গাড়ি যখন আরও গভীরে ঢুকছে, বাতাসের গঠন আবার বদলাতে শুরু করলো। সেগুনের চাদর সরে গিয়ে এবার চোখের সামনে ফুটে উঠছে রাজকীয় শাল গাছের দীর্ঘ সারি। আমরা এসে পড়েছি কানহার দোরগোড়ায়। শিঘ্রই প্রবেশ করব এবার এক অন্তহীন সবুজের সমুদ্রে... (ক্রমশ...)
0 Comments