জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ৩০৬/দোয়েল পাখির বিয়ের সাধতিব্বত (এশিয়া)/চিন্ময় দাশ

 দূর দেশের লোকগল্প— ৩০৬

দোয়েল পাখির বিয়ের সাধ

তিব্বত (এশিয়া)

চিন্ময় দাশ


এক শহরে ছিল একটা দোয়েল পাখি। গোবরের ঢিবিতে খুঁটে খুঁটে খাবার খুঁজে দিন কাটে তার। এক দিন খুঁজতে খুঁজতে এক টুকরো নারকেলের ছোবড়া পেয়ে গেল পাখিটা। 

ফেলে না দিয়ে, সেটা তুলে রেখে দিল সে। আবার খুঁড়তে খুঁড়তে সে কিছুটা চালের গুঁড়ো পেয়ে গেল। সেগুলো নিয়ে ভিজিয়ে রাখল।  তার পর কাজ সেরে পাড়ায় বেরুল পাখিটা।

হাঁক পেড়ে পেড়ে বলল, "এ বাড়ির বউদি, ও বাড়ির বউদি। এসো না তোমরা। একটু আটা কুটে দাও না।"

মেয়েরা বলল, "না, না। ওইটুকু তো জিনিষ! তুমি নিজেই কুটে নাও।।" এই সব বলে, তারা কেউ এলো না।

দোয়েল নিজেই আটা কুটল। তারপর বেশ যত্ন করে, এই এত্তো বড় একটা ধামার মতো, একটা  পিঠে বানাল। একটা ঝুড়ির মতো বড় খোঁপা বাঁধল। এক আঙুল চওড়া একটা কাপড় পরল। সেজেগুজে সে কোথায় চলল জানো? বিয়ে করতে বের হলো পাখিটা।

🍂

যেতে যেতে তার সাথে এক শিয়ালের দেখা। শিয়াল বলল, "কোথায় যাচ্ছ?"

দোয়েল বলল, "পাত্র খুঁজে পেয়েছি, বিয়ে করতে যাচ্ছি।" 

শিয়াল বলল, "আমার সাথে গেলে হয় না?"

পাখি জিজ্ঞেস করল, "তুমি কী খাও?"

শিয়াল বলল, "আমি আর কী খাই? দু’-একটা কাঁকড়া খাই। আর একটু জল খাই।"

পাখি বলল, "ছি! ছি! কী বিচ্ছিরী লোক তুমি!"

বলে আবার চলতে লাগল। যেতে যেতে তার দেখা হলো এক অন্ধ লোকের সাথে।

অন্ধ লোক বলল, "কোথায় যাচ্ছ?"

দোয়েল বলল, "বিয়ে করতে যাচ্ছি।"

অন্ধ বলল, "আমার সাথে গেলে হয় না?"

পাখি জিজ্ঞেস করল, "তুমি কী খাও?"

অন্ধ বলল, "আমি আর কী খাব? দু’-একটা কুঁচে মাছ চিবিয়ে খাই। আর একটু জল খাই।"

পাখি বলল, "ছি! ছি! কী বিচ্ছিরি খাবার!" 

বলে আবার চলতে লাগল। এবার দেখা হলো এক কুঁজো লোকের সাথে। মাঠে কোদাল দিয়ে মাটি কাটছিল লোকটা। কুঁজো বলল, "কোথায় যাচ্ছ?"

দোয়েল বলল, "বিয়ে করতে যাচ্ছি।"

কুঁজো বলল, "আমার সাথে গেলে হয় না?"

পাখি বলল, "তুমি কী খাও?"

কুঁজো বলল, "আমি আর কী খাব? আমি পিঠে খাই।"

পাখি বলল, "বাহ! এটা বেশ ভালো কথা।"

তখন কুঁজো বলল, "আমি ভাত বসিয়ে এসেছি। তুমি ঘরে গিয়ে একটু দেখো।"

পাখি কুঁজোর বাড়ি গিয়ে দেখে, ভাতের হাঁড়িতে জল কম, ভাত সেদ্ধ হচ্ছে না, শুধু শব্দ হচ্ছে-- "কুজা টাপা টাপা, কুজা টাপা টাপা।"

পাখি কুঁজোর কাছে গিয়ে বলল, " ও কুঁজো। ভাতে তোমার জল কম। শুধু বলছে, কুজা টাপা টাপা। জল নিয়ে এসো।"

কুঁজো এই কথা শুনে রেগে গেল। বাড়ি এসে একটা কলসি নিয়ে কুয়োয় গেল জল আনতে। কুয়োর মুখে একটা ব্যাঙ বসেছিল, সে "কুজিজা বুস"-- শব্দ করে,লাফ দিয়ে কুয়োয় নেমে গেল।

ব্যাঙের এমন কথা শুনে কার না রাগ হয়? রাগে গরগর করতে করতে কুয়ো থেকে জল তুলতে লাগল কুঁজো। কলসির জলে ব্যাঙটা উঠে এসেছে। ব্যাঙটাকে ধরে এক আছাড়।  তাতে কলসির সব জল গেল পড়ে।

আবার কলসি নামিয়েছে কুয়ায়। তখন নতুন ঝামেলা। কলসিতে জল ভরতে গেলেই, জল শুধু "কুজা কুটু কুটু, কুজা কুটু কুটু" শব্দ করে, আর ছিটকে ছিটকে পড়ে যায়। কলসি আর ভরে না। রাগে কলসিটাকেই কুয়োর মুখে এক আছাড়। কলসি ভেঙে চুর চুর।

গজ-গজ করতে করতে বাড়ি ফিরে আসছে। রাস্তায় গাঁয়ের মোড়লের সাথে দেখা। মোড়ল জিজ্ঞেস করল, "ও কুঁজো ভাই, কোথায় গিয়েছিলে?"

কুঁজোর মাথা তো তখন রাগে জ্বলছে। সে খেঁকিয়ে উঠে বলল-- "আরে, হতভাগা। তোর কাছেই তো যাচ্ছি। তুই আবার জিজ্ঞেস করছিস?"

তার মেজাজ দেখে, মোড়ল বেশ ঘাবড়ে গেছে। পিছন ফিরে চোঁ-চোঁ দৌড়। 

বাড়ি ফিরে এসেছে কুঁজো। মাথা তখনও জ্বলছে। সামনে পেয়ে গেল পাখিকে। এই হতভাগার জন্য যত হয়রানি। এত্তোবড়ো একটা পিঠে নিয়ে, তারই অপেক্ষায় বসে ছিল দোয়েল। 

মাথায় রাগ চড়েই ছিল। হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেলেছে পাখিটাকে। ধরেছে তো ধরেছে। তার হাতের চাপেই মরে গেল পাখিটা। 

এদিকে হাঁড়িতে তো জল ছিল না। সব ভাত পুড়ে ছাই। এক্টুও মন খারাপ হোল না। দোয়েলের আনা এতো নড় একটা পিঠে রাখা আছে ঘরে। মনের আনন্দে পিঠে খেতে লেগে গেল কুঁজো।

বিয়ের সাধ মিটে গেল বেচারা পাখিটার।

Post a Comment

0 Comments