বক্সা দুর্গের কাহিনী
বক্সা দুর্গের চারপাশে যে পুরু পাথরের প্রাচীর আর কুখ্যাত লোহার কুঠুরিগুলো আজ আমরা দেখি, তার আগে এই দুর্গ ছিল ঢের বেশি ভঙ্গুর এক অস্তিত্ব। সিঞ্চুলা পাহাড়ের কোলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৮৪৪ ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গ প্রথমে ছিল নেহাতই একটি ভুটানি সীমান্ত-চৌকি। বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বাঁধা। তিব্বত আর ভারতের মধ্যে সংযোগকারী প্রাচীন রেশমপথের ছোট্ট অংশকে পাহারা দেওয়াই ছিল তার কাজ। তরাইয়ের সেই ম্যালেরিয়া-জর্জরিত, গহীন সবুজ চাদরে ঢাকা পথটুকু ভুটান রাজের রাজকীয় সৈন্যদল নজরদারি করত, সারাবছর।
১৮৬৫ সালের বর্ষায়, ভুটান যুদ্ধ আর সিঞ্চুলা চুক্তি স্বাক্ষরের পর, ব্রিটিশ ১১তম বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি খাড়া, জোঁক-ভরা পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠে এসেছিল দুর্গের দখল নিতে। সমতলের বিশাল পাথুরে দুর্গ দেখে অভ্যস্ত ব্রিটিশ অফিসারেরা এই ঠুনকো বাঁশের বেড়া দেখে মনে মনে হাসাহাসি করেছিলেন। ভুটানি রাজারা নাকি এই বাঁধা বাঁশ দিয়েই এতকাল এই এলাকা আগলে রেখেছেন। প্রায় অবিশ্বাস্য! স্থানীয় মেচ আদিবাসী সম্প্রদায়ের পথপ্রদর্শকেরা বলেছিলেন এই বাঁশের বেড়া কখনোই শত্রু আটকাতে তৈরি হয়নি। এটি ছিল বনদেবতার মুখ থেকে বাঁচার জন্য।
ব্রিটিশদের কাছে বাঘ ছিল শিকারের এক লোভনীয় পুরস্কার; কিন্তু ডুয়ার্সের আদিবাসীদের কাছে সে ছিল জঙ্গলের সার্বভৌম আত্মা, বনদেবতার মতোই পূজনীয়। অফিসাররা আদিবাসীদের এই সতর্কতাকে নেহাতই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলেন। তাঁরা বাঁশের চৌহদ্দির ভেতরেই শিবির গাড়লেন। পুব দিকের দরজার কাছে বেঁধে রাখলেন তাঁদের রসদবাহী খচ্চর আর ঘোড়াগুলো।
বক্সার পাহাড়ে রাত নামে, গ্রাস করে নেয় গোটা প্রান্তরকে। জয়ন্তী নদীর উপত্যকা থেকে যখন কুয়াশার পুরু আস্তরণ উঠে আসতে থাকল, তখন ব্রিটিশ প্রহরীরা এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলেন—একটানা, নিচু, গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এক প্রাগ ঐতিহাসিক শব্দ। যা পরে ব্রিটিশ অফিসার দিনলিপিতে লিখেছিলেন “ঠিক যেন করাত দিয়ে কাঠ চেরার মতো শোনাচ্ছিল”।
গভীর রাতে, বাঁশের বেড়াটা ভাঙল না—শুধু নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল কেউ। একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার—উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক নথিতে প্রায়ই মেলে যেমন ১২ ফুট লম্বা দৈত্যাকার বাঘের বর্ণনা, সম্ভবত তেমনই এক বাঘ— অবিশ্বাস্য নীরবতায় ডিঙিয়ে গেল বাঁশের খুঁটিগুলো। ঘুমন্ত সশস্ত্র সৈন্যদের দিকে সে ফিরেও তাকাল না। ভয়ংকর নিখুঁত এক আঘাতে সে মটকে দিল একটা সামরিক খচ্চরের ঘাড়, আর তারপর সেই বিশাল দেহটাকে বেড়ার ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেল, ঠিক যেমন সহজে একটা পোষা বেড়াল ইঁদুর বয়ে নিয়ে যায়।
ভোর হতে ব্রিটিশরা দেখল শুধু রক্তের একটা ধারা, যা মিলিয়ে গেছে দুর্ভেদ্য শাল বনের ভেতর। আশ্চর্যের বিষয় কাদায় গেঁথে থাকা থাবার ছাপ—ডিনার প্লেটের সমান বড়!
এই ঘটনা নতুন আসা দখলদারদের মনে কিরকম প্রভাব ফেলল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ডুয়ার্সকে ধরে রাখতে হলে তাঁদের লড়তে হবে শত্রুর সাথে নয় বরং জঙ্গলের নিজস্ব, অবাধ্য শক্তির বিরুদ্ধেও।
কয়েক মাস যেতে না যেতেই ব্রিটিশরা পাহাড় বেয়ে ভারী পাথর টেনে তুলতে শুরু করল। বাঁশের বদলে গড়ে তুলল সেই বলিষ্ঠ পাথুরে দুর্গ, যার ধ্বংসাবশেষ আজও দাঁড়িয়ে আছে। তবে তাঁরা কখনও ভুলতে পারেননি সেই প্রথম রাতের কথা, আর সেই অদৃশ্য প্রহরীকে, যে মনে করিয়ে দিয়েছিল—বক্সার আসল অধিপতি কে?
Reference: The Forests of India (1922) by E.P. Stebbing and the memoirs of E.O. Shebbeare (a prominent British forest officer in Bengal).
0 Comments