জ্বলদর্চি

দুটি অণুগল্প / সন্দীপ দত্ত

অণুগল্প : যুগ / সন্দীপ দত্ত


"আজ আবার এসেছিস তুই? ফোনে তোকে বললাম না, আজ আমাদের মাছের দরকার নেই! দু'চার পিস যা আছে,তা আজকের মতো হয়ে যাবে। বারণ করা সত্ত্বেও তবু তুই কথা শুনলি না। চলে এলি। শুধু ব‍্যবসা আর ব‍্যবসা। ব‍্যবসা ছাড়া কিচ্ছু বুঝিস না। বিনে পয়সায় দিয়েছিস কখনও? দামই কমাস না আর বিনে পয়সা!" রাগে গড়গড় করলেন ধূর্জটি।
      তরুণ মাছ বিক্রেতা ছেলেটি চুপ। শান্ত। একফোঁটাও মেজাজ নেই। এতগুলো কথা শোনার পরেও সেই একইভাবে মিষ্টি হাসল সে। এসেই একগাল হেসে যেমন বলে,"কাকু,আজ আপনার জন‍্য ভাল বাটা এনেছি। আর ভাল চিংড়ি। কোনটা নেবেন বলুন।"
     ছেলেটা আজ বলল," আজ ভোরে ধরা আমাদের পুকুরের মাছ। দারুণ টেস্ট কাকু। আপনার জন‍্য এক কেজি এনেছি আমি।"
      "তোর কি মাথা খারাপ? এক কেজি মাছ নিয়ে আমি কী করব? বাড়িতে খাওয়ার লোক নেই। এমনিতেই মাসের শেষ। এই এক কেজি মাছের দাম আমি এখন দেব কেমন করে?" ধূর্জটি রেগে রেগেই বললেন।
     ছেলেটি তবুও স্বাভাবিক। "বললাম তো কাকু,এটা আমাদের পুকুরের মাছ। আড়ত থেকে নিয়ে আসা ব‍্যবসার মাছ নয়।"
     "তবুও তো ব‍্যবসা করছিস ওই পুকুরের মাছটা নিয়ে! ব‍্যবসা ছাড়া কী বুঝিস তোরা? বুঝিস কিছু?" ধূর্জটি বললেন।
      "না কাকু,এটা ব‍্যবসার মাছ নয়। এটা আমাদের নিজেদের পুকুরের মাছ। আপনি পুকুরের টাটকা মাছ খেতে ভালবাসেন। মাঝেমধ‍্যেই বলেন আমাকে।   কথাটা আমার মনে ছিল বলেই আজ আপনার জন‍্য নিয়ে এসেছি। এটার দাম লাগবে না।" ছেলেটি বলে।
     "তোদের বিশ্বাস নেই। এখন মিষ্টি হেসে দিয়ে যাবি,আর হিসেবটা পরে ঠিক দেখিয়ে দিবি আমায়। নারে,আজ লাগবে না। তুই যা।" 
     "কাকু,এটা আমাদের পুকুরের মাছ। দাম দিতে হবে না আপনাকে।" ছেলেটি নাছোড়ভাবে বলল।
     "বললাম না তোকে,আজ যা! অন‍্যদিন আসিস।" ধূর্জটি দরজা বন্ধ করে দিলেন।
 

মেহগনি

তুমুল ঝড়ের পর মেহগনির একটা ডাল এমনভাবে হেলে পড়ল, বাড়ির বাইরের দিকের দেওয়ালটার বেশ খানিকটা অংশ জুড়েই নেমে এল অন্ধকার। অন্ধকারে ঢাকা পড়ল রমেশের অক্ষমতা। এ বাড়ির ফাটল। বাড়ির বাইরের দেওয়ালজুড়ে আড়াআড়ি একটা রেখা। গভীর ক্ষতের মতো। খানিক দূরে একবার বজ্রাঘাতের পর যেটা হয়েছে। বছর তিন আগে।
     বাড়ির ফাটলটা আজও সারানো হল না রমেশের। কোনওরকম করে কষ্টেসৃষ্টে যদিও কিছু টাকা সঞ্চিত হয়, মিস্ত্রী পাওয়া যায় না। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে জমানো অর্থ খরচ হয়ে যায় নানাবিধ কাজে।
      আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রমেশ দেখল, দক্ষ হাতে সে ফাটলটাকে ঢেকে দিয়েছে বাগানের মেহগনি। যে ফাটলটার দিকে তাকিয়ে এতদিন কত জন কত কথা বলেছে! "বাবার তৈরি করা বাড়িটাকে একটু রিপিয়ারও করতে পারো না রমেশ! ফাটলটা সারাতে পারো না? চোখে লাগে। খারাপ লাগে দেখতে।"
    মেহগনির চারাটা রমেশের বাবা-ই একদিন লাগিয়েছিল বাগানে। সেই ছোট্ট চারাগাছ এখন বৃক্ষ। ডালপালা মেলে ছায়া দেয়।
     অর্থাভাবে ধুঁকতে থাকা রমেশ সংসারের জোয়াল টানতেই হিমশিম এখন। তিন তিনটা মেয়ে। প্রত‍্যেকটাই বিকলাঙ্গ।
      আজ বাবা নেই। বাবা হয়ে বাগানের ওই মেহগনি গাছটা আছে। তাই কি বাড়ির ফাটলটাকে লোকের চোখের থেকে আড়াল করতে ডালটা অমনভাবে হেলে পড়ল ওই জায়গাটায়! বাবা যেন হাত বাড়িয়ে ঢেকে দিতে চাইল ছেলের দৈনতার চিহ্নটাকে। 
     রমেশকে খুব ভালবাসত ওর বাবা। বাবারা সব বুঝতে পারে।
🍂

Post a Comment

0 Comments