অজিত দেবনাথ
বিচিত্র সব কারুকলা
আজও চাঁদ ওঠে সেই নির্জন নদীর এলোমেলো বালুচরে
অন্ধকারের অভয়ারণ্য পেরিয়ে দেবী আসেন শিউলির বৃন্ত এঁকে
এমন মায়াবী চাঁদ, ঝাউবনের অলিন্দে তারই আশ্চর্য সব সুর-বৃষ্টি
জল আর মনের মাঝে যেটুকু একাকীত্বের নিরোল উষ্ণপ্রস্রবণ
তারই উপত্যকায় এক পঙ্ক্তি মেঘমুক্ত সিঁড়ি
অনিঃশেষ শুশ্রুষায় ফুটে ওঠে অভিমতহীন নির্মলতা
গাছের উড়োঝুরো পাতায় হা-ক্লান্ত দিনের সেইসব কোলাহল, আর বিপন্ন ক্যানভাসের বিপথগামিতা
তবু দূর থেকে তাকিয়ে দেখি বাঁশির ভিন্ন সব শব্দ ও গিরিমালা
উৎসবের লাজুক দোতারায় ফুটে ওঠে আলো-আঁধারির মহানুভবতা
দেবীও একসময় ফিরে যান সাজানো আলোর নূপুরে
স্নিগ্ধ ছায়ার গুহাচিত্রে—
নদীর ঢেউয়ে ভাসে জ্বলজ্বলে রাংতার বিচিত্র সব কারুকলা।
শব্দের প্লাবন
তোমার আলপনা আঁকা মেঘের উঠোন
ঝিকমিক বৃষ্টির দু-এক পঙ্ক্তি জোনাকির টলটলে চোখ
তার বিন্দু বিন্দু বাতাসে ফুটে আছে জলের আধফোঁটা খোসা
মলিন হয়ে আসা পদ্মপাতার ছায়া দাঁড়িয়ে—
সেই আবছা দেয়ালের মতো আদিগন্ত
এ শরৎ গোপন অরণ্যের মতো
পুরনো অ্যালবামের ভিতরে ঝুলে আছে
দীর্ঘতম অন্ধকার
রাতের ঝরনায় শুধু দিনযাপনের অনুভব
শরতের বালুচরে আড় ভাঙে কাশফুলের লুকোনো চিঠি
খোলা হয়নি আলপনা আঁকা দিঘির নিষিদ্ধ বাঁধন
শরতের আকাশ তাকিয়ে আছে এক বিন্দু শব্দের প্লাবনে।
অন্তরঙ্গ মুহূর্ত
শিশিরের দিঘল কুঁড়িগুলো লুকিয়ে আছে
পুবালি ভোরের পাতায়
এ কেমন কুয়াশা মুখরিত নিভৃত প্রণয়!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাখিগুলো হাঁ করে তাকিয়ে থাকে—
একটু একটু করে শীত সরে যায় দূরে
আমাকে পরাজিত করে, খানিকটা শূন্য করেও
মায়া জড়ানো রোদ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে নদীর ওপার থেকে
পথের পাশে ধুলোর চোখে এখনও লেগে আছে চাঁদের সুরেলা ঢেউ
যে পথে বিষণ্ণ বিকেল নিরুদ্দেশ হয়েছিল
সেই বনপথে পড়ে আছে চিঠির টুকরো টুকরো স্মৃতি, অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, প্রিয়মুখ
পাঠযোগ্য নয়, তবুও কিছু সংলাপ ভেসে আসে
ফুল ফোটার মতো পাখির কলতান যেমন অরণ্যকে উৎসবমুখর করে তোলে
আমি তোমার কথা ভাবি
দূরের শান্ত পুকুরের দিকে তাকিয়ে—
দেখি কী ভাবে একটি উপেক্ষিত ভোর
পত্রলিপির মতো ক্রমশ নিখোঁজ হয়ে যায়
দু-একটি জোনাকি কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও
তাদের সঙ্গে কথা বলি না
কাছেই কোথাও বাঁশি বেজে ওঠে
ওই খসে পড়া পাতার মতো নিঃস্ব, নির্জন।
0 Comments