সংযুক্ত
উজ্জ্বল সামন্ত
১৩ বছর আগের কথা। কো এড স্কুলে ক্লাস ফাইভ, মফস্বলের স্কুলে ভর্তি হল তিয়াসা। ওর বাবার ট্রান্সফার হয়ে ব্লক পাবলিক হেল্থ সেন্টারে এসেছেন মাস খানেক। বাবান এর বাবা প্রাইমারী স্কুলের হেড টিচার। ক্লাস ফোর এর গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হলো ঊমা সুন্দরী হাই স্কুলে ক্লাস ফাইভে। স্কুলের প্রথম দিনটা, প্রচুর ছেলে মেয়ে স্কুল ড্রেস পরে প্রেয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে। জাতীয় সংগীত শেষ হবার পর যে যার ক্লাসে চলে গেল। তিয়াসা ও বাবান পাশাপাশি বসলো। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে। এই তুই আমার বন্ধু হবি? তিয়াসা মুখে কিছু বললো না। স্কুল শেষ হলে মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে এলো। স্কুলের কিছুটা দূরে নদীর বাঁধ। নদীর কুলু কুলু শব্দে জলরাশি বয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিকেলবেলায় বাবা ওকে নিয়ে নদীর বাঁধে বেড়াতে যেত।
কয়েক মাস পর তিয়াসার সঙ্গে বাবানের ভালো বন্ধুত্ব হলো। সূত্রটা ছিল একদিন বিকালে খেলতে খেলতে বাবানের পায়ে চোট লাগে। ওর বাবা তাড়াতাড়ি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গেলে , ডাক্তারবাবু কোয়াটারে আছেন। কোয়াটারে গিয়ে কলিং বেল বাজালে, তিয়াসার মা দরজা খোলে। তিয়াসাও বেড়িয়ে আসে। ওর মা-বাবাকে ডাক দিলে , ডাক্তারবাবু এসে দেখেন একটি বাচ্চা ছেলে ও একজন মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক ধুতি পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ডাক্তারবাবু ব্যস্ত হয়ে বলেন কি হয়েছে বলুন? নমস্কার আমি, অগ্নিশ্বর ভট্টাচার্য। এই গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের হেডমাস্টার। আমার ছেলে বাবান ভট্টাচার্য। দেখুন ডানপিটে ছেলেটা খেলতে খেলতে পায়ে চোট পেয়েছে। হাটু থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারবাবু হেল্থ সেন্টারে এসে ব্যান্ডেজ করে , ইনজেকশন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ লাগিয়ে ছেড়ে দেন। বলেন, দিন ২ পরে এসে একবার দেখিয়ে যাবেন।
এইভাবে সুবর্ণ মুখার্জি ও অগ্নিশ্বর ভট্টাচার্যের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়। মাঝে মাঝেই বাবান তিয়াসার সঙ্গে খেলতে ওদের কোয়ার্টারে আসে। দেখতে দেখতে কয়েক বছর গড়িয়ে যায়। ওরা এখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। ওদের বন্ধুত্বটা আর বন্ধুত্বের মধ্যে নেই, একটা মিষ্টি সম্পর্কের রূপ পেয়েছে। বছরখানেক আগে তিয়াসার জন্মদিনে বাবান, তিয়াসাকে সাইকেলে চড়িয়ে নদীর বাঁধে ঘুরতে নিয়ে যায়। বাঁধে সাইকেল রেখে,গোধূলির লগ্নে ওরা নদীর বাঁধ ধরে দুজনে হাঁটতে থাকে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। তিয়াসার চুলগুলো উড়ছে, মাঝে মাঝে মুখে চলে আসছে। বাবান, আলতো করে চুল সরিয়ে দেয়। তিয়াসাও প্রশ্রয় দেয়, মিষ্টি হাসে। বাবান প্রশ্ন করে তিয়াসাকে, বল তোর জন্মদিনে কি উপহার চাই? যা চাইবো দিতে পারবি বাবান?
আরে বলেই দেখ না, আমার সাধ্য হলে নিশ্চয়ই চেষ্টা করবো। তবে আমি একটা জিনিস ভেবে রেখেছি! বল না বাবান, কি দিবি আমাকে? বাবান তখন মনে মনে হাসে। আমি যা ভেবেছি তা তোকে দিতে পারব কিনা জানিনা। বল না কি?
🍂
'ছোটবেলার বন্ধু তিয়াসার জন্য একটি নদী কিনবে ভেবেছিল বাবান'। এই কথাটা বললে তিয়াসা হয়তো হো হো করে হাসবে।
বাবান, তিয়াসা তোর জন্য ভেবেছি এই নদীটা কিনবো। কিন্তু তা তো হবার নয়। তাহলে ,এই নদীর পাড়ে একটা ছোট্ট বাড়ি বানাবো। একটা নৌকাও কিনবো। মাঝে মাঝে আমরা নৌকায় চড়ে ঘুরতে যাবো।
তিয়াসা : হেসে, তাই বাবান!
বাবান তিয়াসা কে কাছে ডেকে আলিঙ্গন করলো। দুজনের হৃদস্পন্দন তখন বেড়ে চলেছে। বাবান নিজের ঠোঁট তিয়াসার সরু গোলাপি ঠোঁটে স্পর্শ করলো। তিয়াসা চোখ মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরলে বললো, তিয়াসা : বাবান, চল সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাড়ি ফিরতে হবে, নাহলে মা চিন্তা করবে। আরে কাকিমা তো জানে, তুই আমার সঙ্গে আছিস। চিন্তা করছিস কেন?
তোর সব দায় দায়িত্ব তো এখন থেকে আমার।
তিয়াসা: তাই?
বাবান: তাই নয় কি!
0 Comments