জ্বলদর্চি

মুক্ত গদ্য: কথাসপ্তক/সুহিতা ভট্টাচার্য্য

মুক্ত গদ্য
কথাসপ্তক

সুহিতা ভট্টাচার্য্য


১.
গান শুনতে শুনতে আমি নখ চেয়েছি আদিম যাতে একশো পুরুষের তীব্র থেকে তীব্রতর শরীর ঘেঁটে ঘেঁটে সভ্যতা তৈরি করতে পারি নখের আগায়। সেদিন সভ্যতা যেদিন মৃত ডেনিসোভানের সন্তানের গায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে কম্পিত শীতার্ত আহত শুষ্ক নিয়ানডারথাল যুবতীর হাত। আসলে শেষতঃ মা। অন্তিমে বিলুপ্ত হবে, তবুও এমন স্বাদ, এই লবণাক্ত স্বাদ, এই রক্ত, গর্ভজল এক হাজার পুরুষের দৃষ্টি স্মৃতি অতিক্রম করে নখে লেগে থাকুক আমার। একটি পুরুষ, তার নিতান্ত জলস্থল, তল্লীন রতিবোধ ভেবে চলে পিঠে বুকে গায়ে তার শীৎকারের সুখপত্রলেখা প্রতি আমন্থিত নিমজ্জনে কিন্তু তখন সেই মাতৃনখ তার স্বাদ আর শব নিয়ে যজ্ঞাহুতি দেবে বলে এইভাবে চৌকাঠে প্রতিবার আলপনা আঁকে। 

২.
রাত্রিমেঘ সন্ন্যাসের নান্দীশ্লোক যার কথা তুমি যদি লিখে যাবে ভাবো, সম্পূর্ণ একা হয়ে যেতে পারো সামূহিক স্বহত্যার দায় কাঁধে নিয়ে। স্বহত্যা, ঠিকমতো লক্ষ্য করে দেখো, স্বতন্ত্র এক প্রাণী তোমার ভিতরে যত দুঃখের গাছেঝোপে বৃষ্টির রাতে পলিত চাঁদের গর্ভ চিরে এসে পড়েছিল জারজ সন্তান। প্রতিদিন যত্ন করেছ তাকে অজান্তে, পার্শ্ববর্তী মানুষের ভিতরেও জন্মবীজ তার নিক্ষেপ করেছ। তোমার লালসা হয় অনন্ত সন্ন্যাসের: যদি মৃত্যু রুখে যায়, যদি বা একটি বধ ওই ঘৃণ্য সন্তানের তোমায় বাঁচিয়ে রাখে (কিংবা আঁকড়ে রাখে) প্রচলিত এই গতিচৈতন্যের মোহে; কিন্তু সন্ন্যাস মানে ত্রৈকালিক লালসা কাটানো। তুমি আমি নিষ্ফল এত বেশি আশাহীন কষ্ট পুষেছি, আজ একা রাত্রিমেঘ দেখে বড়ো কষ্ট হয়: আনন্দসন্ন্যাসের মৃত্যু হয়ে ভাঙা পৃথিবীর প্রান্তে একা হয়ে গেছি। 
🍂
৩.
ঘর এবং তৎসম্পর্কিত অবিন্যাস ছুঁয়ে থাকা অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ জোনাকি এসে কত বড়ো অর্জন দিয়ে গেছে আমায় তাই ভেবে বিস্ময় ধ্রুব স্থিরতর হয়ে আসে। এ খদ্যোৎ দিনের দীর্ঘ প্রহর ধরে অন্তরালে বুনেছে নিপুণভাবে পৌরাণিক ফিনিক্সের ডানার পালক। ঘাসের সবুজ থেকে ঘরোয়া কাঁসার পাত্রে বিম্ব দিয়ে কেঁপে কেঁপে ভেসে গেছে বহুদূর মাঝগঙ্গার কোনো একা ধীর প্রবাহের আরতিপ্রদীপে। যেখানে সে ডুবে যায়, নরকের ধারণার বিনির্মিত বিপ্রতীপ জ্বালা তুলে আনে। বাস্তুস্বপ্ন ও বাস্তুত্যাগের মধ্যে যতখানি জাগে শ্রান্ত ত্রিনয়ন, ততখানি মৃন্ময়ী মুখখানি ভেসে যায় বরণের আরশির ঘাট বেয়ে নেমে যেতে অলক্তক পা কেটে লোহলাজ অপূর্ব আঁধার। আরোগ্য নিতে চিতাগ্নিতে বাজুবন্ধ রেখে আমি ভৈরবী আমি বুঝি খদ্যোৎ কী আশ্চর্য অর্জন। 

৪. 
স্পর্শের চূড়ান্ত পাড়ে সোহিনীর নদী পেলে স্থিরতার ভ্রম বড়ো ভয়ংকর ক্ষতি। আসঙ্গের পরবর্তী চিৎকার ভেঙে বাঁকিয়ে দিচ্ছে সেই রেখাগুলো যা তোমাকে ঘুম দিয়ে রাখত লীন ঔষধি গভীরে, তুমি স্থির ঘুম বেছে নিয়েছিলে বলে। পাতলা ত্বকস্তরে ক্ষীণ নীল শিরাগুলি নিভন্ত তুষারের পাহাড়ি অর্কিড, গ্রীবার ঝিনুকমণি দ্বিধাতুর ঝুলন্ত উদ্যান, নির্জন দুটি সোঁতা দু'গালের নিরিবিলি একা হয়ে যাবে ভেবে কিছুই বলোনি। জানতে না প্রতি তর্ক পরিত্যাগ-পরিণতিকামী। ভুলে যাও কতভাবে মনরঙ্গ, কত সজ্জাসাজ; ভুলে যাও কতভাবে তোমার নৃত্যরত শরীরের জ্যামিতিতে, ভাস্কর্যে নিত্য নির্মাণ। ত্রিবলি ধ্রুপদী রূপে চিত্রকলা হয়ে আছে লক্ষ্য করোনি। ভাঙো তুমি এইবার, যদি ভাব ফিরে পাও, শৃঙ্গারশিঞ্জিনীশব্দে, ছন্দোময় পদপাতে অপ্রেম চিৎপরমাণু। 

৫.
আমি যদি অজ্ঞ হই, এই স্পেস ভালোবাসি, এই এক আকাশিক বিস্তার (অবিস্তার) ধীর কামগন্ধহীন কাব্যে রাধার শরীর, যোগিনী ও প্রণয়নিপুণা থেকে মুখের জন্ম হয় অযুত অধিক (যথা সম্ভাব্য শিশু ইভ), যেমন দুইটি ঠিক নির্ধারিত স্বাভাবিক সংখ্যার মাঝে অনন্ত সম্ভাবনা টুকরো সংখ্যার। তবুও পিঁপড়ে খায় জীবনের অসুস্থ রস, স্থূলতার দুঃস্বপ্ন অনুমতিহীন বেড়ে উঠে দূরে নিয়ে যায় রূপকথাশখ। এই বিস্তারে ছাই মেখে গরবিনী অগ্নিত্যাগ করে আসে, তপোবনে নিষ্পাপ বল্কল পরিধানে হেঁটে চলে পুনর্জন্মে স্থান থেকে স্থানে। চেনা এই অবসরে অচেনা প্রবল প্রগলভ হতে পারি আমি, চামড়ার ভিতরে ফোটে বর্ষরেখা, বর্ষরেখা ঢেকে রাখে উন্মন কৈশোর, বৃক্ষ মারা গেলে পরে বর্ষরেখা খুলে খায় কাষ্ঠকীট, এই অবিস্তারে আমি বাকরুদ্ধ প্রাকৃত অজস্র হয়ে আছি।

৬.
আমাকে খোঁজো যেন তোমার সকল হারিয়ে যাওয়া শরীর থেকে পাথর খসে যায়। এই পৃথিবী অত্যন্ত জাদুসম্ভব: অপর্ণ বৃক্ষের পাশের জানালায় মাথা রাখলে সামনে দেখবে কাচের দেওয়াল, ওপাশে ভেসে যাচ্ছে অপ্রাসঙ্গিক আলো। অপর্ণ বৃক্ষ এভাবে প্রার্থনা দেয়, দিগন্ত পার হয়ে উদযাপনের লেশটুকু এলে তুমি সৈনিকের ধূসর চোখের তুষার পেরিয়ে পৌঁছে যাও ছায়াদীঘল প্রাচীন করুণায় গাঢ়নম্র মূর্তিমতী ক্ষমার পদপ্রান্তের কমনীয় ধুলায়। সেখান থেকে নরনারী কত সরে গেছে নির্বিচার, পাথরের জরায়ু ভেঙে মানুষের মুখ দেখে চমকে উঠে ভালোবেসেছে তথাপি। করুণাকে ঘিরে যেন পাথর না জমে, প্রতিটি বৈখরী বাক্য হৃদয়ে নিও না। আমায় খোঁজো যেন পাথর ঝরে মানুষের গতায়াত হয়, যথা রুদ্রগণিকার কোমল আঁচল পেয়ে রূপদক্ষ রেখে গেছে শিল্পপাথর। 

৭.
তোমার গাঢ় বাধ্য কেশগুচ্ছ আমার অবসরের দ্বিতীয় অবসর, অলটার ইগো আর তার মধ্যে ডুবে থেকে আমি দেখি তেমন অত্যন্তাভাব কীভাবে সাঁকোর তলে বানবন্যার দিনে জুড়ে রাখে সংসারের আঁতিপাঁতিটুকু। তোমার সহজ উদ্বেগমুখ, তোমার প্রশ্রয়ের নিজস্ব চিরায়ত হাসিসংসার, বীণার ধমনি বেয়ে সুসংস্কৃত দীর্ঘ পেলব অঙ্গুলি, নিষ্ঠুরা তেমনি কাড়ো যতটা নতুন চাই - আমার ব্যক্তিত্বের প্রচলন বাস্তবের ধারণার পূর্ণতার বোধে। টানা নথ, ভাবীকালে তেলহলুদে দাগ লাগা শঙ্খবলয় আর প্রিয়তর কল্পবাস্তব তুমি পেতে পারো, কিন্তু কেন ভুলে যাও কাব্যকথিতা তুমি আসলে আমিও হতে পারি। ঈর্ষা নয়, দুঃখ নয়, অষ্টাঙ্গিক নির্লিপ্তি কামনা ত্রিকাল ব্যেপে প্রশমিত ফল্গুতোয়া নির্বাণ হয়ে আসে: কথাসপ্তক শেষে আমি বুঝি কথকতা কতখানি কঙ্কালসার মোহন বিপদ।

Post a Comment

0 Comments