চলতে ফিরতে আনন্দ – এক আনন্দ পাঠ
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
বিখ্যাত ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের একটি সংস্করণ আছে কিশোর কিশোরীদের জন্য কিডস্ ভার্সন। তারই এক সংস্করণে Andrew J. Pegman এর লেখা নিবন্ধের শিরোনাম ছিল এরকম - “Fall is for the birds – and it's a great way to get kids outside.” – আজ শরৎ এসেছে গাছেদের পাতা খসানোর বার্তা নিয়ে, এরপরই আসবে শীত। জবুথবু হয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেবার সময়। এ্যান্ড্রু সাহেব এমনই সন্ধিক্ষণে ছোটোদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন – এসো, তোমরা সবাই ঘরের বাইরে এসো। দেখো, এই পাতা ঝরানোর সময়ে কতো বর্ণিল হয়ে ওঠে আমাদের চারপাশের প্রকৃতি। এতো রঙিন দৃশ্যপট উপভোগ করবে এসো। অবশ্য আমাদের চেনা পাখিদের এখন এখানকার পাততাড়ি গুটিয়ে একটু উষ্ণতার খোঁজে আরও দক্ষিণে যাত্রা করার সময় এসেছে। ওদের এখন চরম ব্যস্ততা। এই তো সুযোগ, ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোর। শরতের এই মরশুম এক প্রাণবন্ত সময়, কেননা এর পরেই নেমে আসবে শীতল শীতের শিহরণ জাগানো বিষণ্ন মুহূর্তগুলো। চারিদিক ছেয়ে যাবে সাদা রঙের বরফে । প্রকৃতি নতুন সাজে নিজেকে সাজিয়ে তুলবে মানানসই করে। এসো সবাই মিলে নতুন পরিচয়ের উদযাপন করি।
এমনই এক বার্তা এসে পৌঁছেছে তিতলির কাছে। ক্যারিয়ার গড়ার এমন ব্যস্ত সময়ের মধ্যে থেকেও তিতলি একটু অন্যরকম। বাবা, মা দুজনেই বেজায় ব্যস্ত নিজেদের কাজকর্ম নিয়ে। তাই ক্লাস সেভেনে পড়া তিতলি আর তার কুচু ভাইয়ের সময় কাটে দাদু আর ঠাকুমার কাছে। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বাড়ির লাগোয়া এক চিলতে বাগানেই অনেকটা সময় কেটে যায় তার, অবশ্যই দাদানের পিছু পিছু ছায়া হয়ে। সেখানে কতো বিস্ময় যে অপেক্ষা করে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। তিতলির দাদান তাকে বাগানের এক অজানা জগতের হদিস পাইয়ে দিয়েছেন। বইয়ের বাঁধা কথার বাইরেও যে এমন এক রহস্যময় জগতের অস্তিত্ব আছে তিতলি তার হদিস পেয়েছে দাদানের কাছ থেকে। তিনিই তাকে সঙ্গে নিয়ে চিনিয়ে দিয়েছেন বাগানের গাছপালা, লতা -গুল্ম, বর্ষার জল পেয়ে ভিজে যাওয়া স্যাঁতসেঁতে জায়গায় পঁচা কাঠকুটোর মাঝে জেগে ওঠা ছত্রাকের সঙ্গে। বাগানে, রাস্তার আশেপাশে, ঝোপঝাড়ে গজিয়ে ওঠা দুব্বো ঘাস থেকে শুরু করে শ্যামা ঘাস,মুথা ঘাস, চলতে ফিরতে পোশাকে চিপকে যাওয়া চোরকাঁটা ঘাস, গোথুবি ঘাস থেকে শরতের আগমনী গাইতে আসা কাশ ঘাসের কথাও তিতলি শিখে নিয়েছে দাদানের সঙ্গে চলতে ফিরতে গিয়ে। তবে তিতলির সব থেকে ভালো লেগেছে উলুঘাস। দাদানের সঙ্গে চলতে ফিরতে এমনই সব আনন্দ পাঠ নিয়েছে ছোট্ট তিতলি।
তিতলি চায় অন্যদেরও এই আনন্দের শরিক করে তুলতে। দাদানের মুখে তিতলি শুনেছে, যে শেখা থেকে আমরা আনন্দ পাইনা, সেই শেখাটা কখনোই সত্যিকারের শেখা হয়ে ওঠেনা। তাই ঘরদুয়োরে হাজির হয়ে গান শুনিয়ে যাওয়া কোকিল , কিংবা বসন্ত সমাগমে পিউ কাঁহা,পিউ কাঁহা করে মাথায় জ্বর তুলে দেওয়া পাপিয়া পাখিদের সঙ্গে কোনো সখ্যতা গড়ে ওঠেনা একালের ছেলেপিলে পড়ুয়াদের। সেই আশ্চর্য বোম্বাগড়ের আজব রাজার মতো ইটের পাঁজার ওপর ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা নিয়ে তারা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না – কিতাবের পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে হাত ব্যাথা হয়ে গেলেও তারা সত্যিকারের শিখছে না । তাই শেখার থেকে পরিপূর্ণ আনন্দ লাভ আর হচ্ছে না। বোধ আর পরিপূর্ণতা ছাড়াই তারা বছরের পর বছর ধরে পাশ দিয়ে পরের ক্লাস, তারপরের ক্লাস পার হয়ে যাচ্ছে। বইতে লেখা কথাগুলোকে বিন্দুমাত্র যাচাই না করেই বা সেই চেষ্টা না করেই চলেছে নিরানন্দ পাঠ।
এইসব কথা বিলক্ষণ জানেন সৌমেন। সৌমেন রায়। বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকার জন্য গোটা ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলো সম্পর্কে তিনি বিলকুল ওয়াকিবহাল। শিক্ষার্থী জীবনের এই অপূর্ণতা তাঁকে নিরন্তর পীড়িত করে, বেদনার্ত করে। নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় তার –নিজর ছোটো কাকার চেলা হয়ে বনবাদাড়ে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির নিয়মগুলোকে জেনে বুঝে শিখে নিয়ে নিজের শিক্ষার্থী জীবনকে অন্যরকম আনন্দে ভরিয়ে তোলা। পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে সৌমেনও চেয়েছেন বিশ্বপ্রকৃতির আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা অগণিত বিস্ময়ের সঙ্গে তাঁর শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেবার। তিতলির চোখ দিয়ে তিনি পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান, তাই তাঁর বইয়ের নাম দিয়েছেন চলতে ফিরতে আনন্দ।তিনি নিজে যা বিশ্বাস করেছেন তাকেই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তাঁর এই বইয়ের মধ্য দিয়ে।
অযথা পাণ্ডিত্য ফলানোর চেষ্টা মোটেই করেননি সৌমেন। কেননা তিনি জানেন যে এই লেখাগুলো পড়ে তাঁর কচিকাঁচা
শিক্ষার্থীদের মধ্যে যদি জানার আগ্রহটুকু একবার সত্যি সত্যিই জেগে ওঠে, ভবিষ্যতে তারা নিজেদের গরজেই জেনে শিখে নেবে আরও অনেক অনেক কিছু। সেই নাড়া বাঁধবার কাজটুকুই করেছেন তাঁর বইয়ের মধ্য দিয়ে।
বইটা পড়তে পড়তে এক অন্যরকম অনুভুতি জাগছিলো মনে। পাখিদের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিতে দিতে তিনি পাঠকদের নিয়ে গিয়েছেন প্রজাপতিদের রং বাহারি ডানা মেলা এক আশ্চর্য রঙিন জগতে। করবী গাছে ঝুলতে থাকা কানের দুলটি যে আসলে প্রজাপতির মূককীট তা টের পাওয়া গেল সেইটি কেটে কালো ডানা মেলে বেরিয়ে আসা কমন কৌয়া বা common crow প্রজাতির প্রজাপতিটিকে দেখে। একদম স্থানীয় বা লোকায়ত পরিচিতি ব্যবহার করেছেন সৌমেন তাঁর বইতে যাতে তাঁর কথা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হতে না হয় পাঠক তথা ছোটোদের । বাগানের কোন গাছে কোন প্রজাতির প্রজাপতিদের বিশেষ আসক্তি,সে কথাও সৌমেন জানিয়েছেন তাঁর বইতে। যে সব গাছ বা গুল্মকে আমরা নিতান্তই অকাজের বলে মনে করি সেই সব নাম না জানা অল্পপরিচিত উদ্ভিদ যেমন অমলতাস, রুদ্রজটা,আমরুলি, হুড়হুড়িয়া, কাল কাসুন্দি - কিছু কিছু বাছাই করা প্রজাপতিদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বইয়ের তালিকা মিলিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আমিও রীতিমতো বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছি এই ব্যাপারে। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্য দিয়ে সেই আগ্রহটাই নতুন করে চাগিয়ে তুলেছেন যে আগ্রহের ডানায় ভর করে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব হয় অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে। এই কৃতিত্বের ষোলো আনাই সৌমেন এবং তাঁর বইয়ের প্রাপ্য। এ ব্যাপারে আমি দ্বিধাহীন , অকপট।
সৌমেনের বই পড়তে গিয়ে কোথাও একবারের জন্যও হোঁচট খেতে হয় না। সহজ সরল তাঁর কথনভঙ্গি। আগেই বলেছি যে তিনি নিজের জানাকে কখনোই পাণ্ডিত্য প্রকাশের জন্য ব্যবহার করেন নি ,তাই তাঁর কথকতা শুনতে বা পড়তে ভারি ভালো লাগে। সেই ভালোলাগায় ভর করে তরতরিয়ে এগিয়ে যায় আনন্দ পাঠ। পরিচ্ছন্ন ছাপাই ও বাঁধাই এই বইয়ের বিশেষ সম্পদ। এজন্য জ্ঞান বিচিত্রা প্রকাশনীর দেবানন্দ দাম মহাশয় বিশেষ প্রশংসার দাবিদার হবেন নিঃসন্দেহে। প্রধানতঃ ছোটোদের জন্য লেখা হলেও বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। সেই কথা মাথায় রেখেই প্রকাশক চেষ্টা করেছেন বইটিকে যথাসম্ভব দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে। রঙিন ছবিগুলো কেবল চোখটানেনা মনটাকেও কাছে টেনে নেয়।তার নিজের তোলা ছবিগুলি প্রমাণ করে যে হাতেনাতে প্রকৃতি ছেনে তিনি বইটি লিখেছেন।
আশ্রমিক ছেলেপিলেদের বিশ্ববীক্ষণে উৎসাহিত করতে এক আশ্চর্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের সেই বরেণ্য শিক্ষক মানুষটি। তিনি বুঝেছিলেন এই পরম সত্যটা যে, বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে এক আত্মিক বন্ধনে শিক্ষার্থীদের আত্মাকে যুক্ত করতে না পারলে সব কেতাবি শিক্ষাই প্রাণহীন,অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হায়! সেই শিক্ষার ধারাকে আমরা কবেই বর্জন করেছি। আমাদের শিক্ষায়তনে এখন আনন্দ পাঠের আয়োজন নেই। সিলেবাসের কচকচানিতে, পণ্ডিত মশাইদের শাসনে আর শতেক বিধি নিয়মের ফাঁদে পড়ে শিক্ষার প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত। এমনই কঠিন এক সময়ের বৃত্তে দাঁড়িয়ে সৌমেন যে একটু অন্যভাবে ভাববার আন্তরিক চেষ্টা করেছেন তার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানাই তাঁকে। সৌমেনের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি সমস্যাটিকে নিয়ে একলা ভাবেননি, আমাদের সকলকে সানন্দে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
সৌমেন প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করতে পারছেন আমাদের চেনা ছকের স্কুলগুলোর রুগ্নতার কারণগুলোকে। আর তাই মরীয়া হয়ে তাঁর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ দূরত্বে টেনে আনার কথা ভেবেছেন, সংযুক্ত করতে চেয়েছেন আনন্দ পাঠের নতুন এক পাঠক্রম। তিনি জানেন যে জোর করলে হবে না, চাই অন্যরকম ভালোবাসার এক নতুন ক্ষেত্র। এই বই শিক্ষা নিয়ে তাঁর একান্ত ভালোবাসার প্রতিবিম্ব। আমাদের আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা একটু অন্যভাবে বেড়ে উঠুক। সৌমেনের এই অভীপ্সা সফলতা অর্জন করবে এই আশা রাখি। আশাকরি বইটি সাধারণ পাঠকমহলে সমাদৃত হবে।
চলতে ফিরতে আনন্দ/ সৌমেন রায়
প্রথম প্রকাশ – বিশ্ব পরিবেশ দিবস, জুন ৫. ২০২৬.
প্রকাশক – দেবানন্দ দাম , জ্ঞান বিচিত্রা, আগরতলা
3 Comments
রিভিউ লেখক সোমনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয়কে অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই। তিনি বইটি পাঠ করেছেন এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করেছেন ।কিশোর কিশোরীদের প্রকৃতির দিকে মুখ ফেরানোর উদ্দেশ্যে এটি এক ছোট্ট প্রয়াস।
ReplyDeleteবইটি কেউ সংগ্রহ করতে চাইলে প্রকাশক জ্ঞান বিচিত্রা থেকে সরাসরি সংগ্রহ করতে পারেন। অ্যামাজনেও বইটি উপলব্ধ। তাছাড়া মেদিনীপুর থেকে কেউ সংগ্রহ করতে চাইলে মল্লিক পুস্তকালয় এবং গ্রন্থসাথী এই দুটি বই দোকানে পাওয়া যাবে।
# চলতে ফিরতে আনন্দ - বইয়ের থেকে দুটি অংশ দিলাম পাঠকদের জন্য ।
ReplyDeleteকোকিলটাকে একদিন পাকা পেঁপে খেতে দেখেছি। কোকিল নিরামিষাষী। কিন্তু কোকিল (Koel) কাকের বাসায় ডিম পাড়ে। কাক তো নোংরা আমিষ খাদ্য খায়। ছোটবেলায় কোকিল তাহলে দিব্যি সেসব খেয়ে হজম করে! অবাক কান্ড না !
একদিন স্কুল থেকে ফিরতে ঠাম্মা বলল দাঁড়া, সুজি করে দিই। সুজির কৌটা খুলে বলল, ‘যা এতো পোকা হয়ে গেছে।‘ আমার হাতে দিয়ে বলল যা ডাস্টবিনে ফেলে দে। হাতে নিয়ে দেখলাম ছোট ছোট সাদা পোকা কিলবিল করছে। ফেলতে যাব ঠাম্মা বলল, ‘দাঁড়া, একবার বুড়ো খোকাকে দেখিয়ে নিয়ে আয়’। ঠাম্মা মাঝে মাঝে আদর করে দাদুকে বুড়ো খোকা বলে।
লেখক নিজেই হাজির হয়েছেন দেখে ভালো লাগলো। শিব ঠাকুরের কাণ্ড কারখানা পড়ার পর আবার সেই চেনা যুগলবন্দি। খুব ভালো লাগলো বইটির আলোচনাটায় নজর বুলিয়ে। বেলা বাড়লে গ্রন্থসাথীতে ছুটবো বইটির খোঁজে। আপনারাও আসুন।
ReplyDelete