ইন্দ্রদীপ সিনহা
অদৃশ্য চাবুক ও মুক্ত অক্ষর
অর্গল ভেঙে আজ রাজপথে নেমেছে অবাধ্য সব বর্ণমালা,
সারাটা রাত জুড়ে উপচে পড়ছে তাদের আনন্দ-উন্মাদনা।
জানলা গলে তাকিয়ে দেখি—
পায়ের শৃঙ্খলগুলো গড়িয়ে এসে বাঁধছে এক বেতাল সুর,
চাবুকের শপাং শব্দে উত্তাল ঢেউ উঠছে ছত্রিশ ব্যঞ্জনে।
আর কোল-বালিশে মাথা রাখা ওই স্বরধ্বনিরা—
তারাও আজ মেতেছে এক অদ্ভুত উল্লাসে।
সবাই গাইছে— এ কেমন মুক্তি! এ কেমন বাঁধনহীন সুখ!
জানলার ওপাশ থেকে ভাবি— কে এই নাচের ইশারা দেয়? আর কে-ই বা নাচে এই ছন্দে?
খোলা রাস্তায় দিকবিদিক ভাসিয়ে চাবুকের সেই চেনা গর্জন,
চারিদিকে শুধু মুক্তির জয়গান, অদ্ভুত এক ভালোলাগা।
অথচ, কার হাতে সেই চাবুক— তা অধরাই থেকে যায়।
চামড়ায় চামড়ায় ঘর্ষণের সেই নরম, ব্যাকুল আওয়াজ,
যেখানে ছত্রিশ ব্যঞ্জন আর অলস স্বরধ্বনিরা একাকার।
পায়ের শেকলগুলো আজ ঝনঝন শব্দে গেয়ে উঠছে—
স্বাধীন এক নাচের সুর— থৈ থৈ তা তা থৈ!
বুকের ক্ষত ও জলস্রোত
এমনিতে মানুষগুলো বেশ, আচরণে ভীষণ ভালো,
ভদ্রতার আড়ালে লুকিয়ে রাখে যত কালো—
সুযোগ বুঝে সময় পেলেই ঠিক,
হিংস্র দাঁত-নখ বেরিয়ে আসে চারিদিক।
কৃতজ্ঞতা? ও তো শুধু বইয়ের পাতায় সাজানো কথা,
ধর্মকে সাক্ষী রেখে চলে সুড়ঙ্গের গোপন নীরবতা।
লেনদেনের নিঁখুত হিসেব ছাড়া আজ—
কানাকড়ির মূল্যও নেই কোনো সম্পর্কে, কোনো কাজে।
এই যে বুকের ভেতরটা খুবলে নিয়েছে ক্ষতবিক্ষত করে,
শুনতে চাও কি, সেই ইতিহাস কখন ঘটেছিল কার হাত ধরে?
সে এক বিশাল রূপকথা, এক দীর্ঘ উপাখ্যান—
সাতসমুদ্র তেরো নদীর ওপারের এক বিষণ্ণ গান!
অর্থাৎ, সেই বয়ে যাওয়া চেনা জলস্রোতও
যদি আজ ধুয়ে দিত এই গভীর ক্ষত...
ধৃতরাষ্ট্রের ইশতেহার
একটু জোর দিয়ে খুঁজলে রেহাই পাবে না কারও পিঠও,
খুব শক্ত একটা বল্লমে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে এই ধূর্ত রাষ্ট্র।
অসম্ভবের কোনো বাসায় কেউ এসে আলতো পালক বুলিয়ে যাবে—
সেই অলীক আশায় তো ঘর বাঁধিনি, যুদ্ধের জন্য দুর্যোধনেরা প্রস্তুত।
শত্রুপক্ষের মগজ চিবিয়ে খাবে তারা,
হে সঞ্জয়, আমায় শুধু জানাও— সেই গ্রাস শুরু হয়েছে কি না?
সামান্য এক ছটাক জমিও কেন ছেড়ে দেবে আমার সন্তান?
আমার পক্ষে আজ লড়ছে ভূমিসেনা, পাশে দাঁড়িয়ে সমস্ত ভূস্বামী।
আমার দলে দ্রোণ কিংবা কৃপ, আমার সাথেই আছে ভীষ্ম-বিদুর,
সেদিক থেকে বিচার করলে জয়ের সেই ধর্মরাজ্য আর কতটাই বা দূর!
নিন্দুকেরা বলে, মনে মনে তারা নাকি আমাদের কেউ নয়—
তা যদি সত্যিও হয়, তবে একাই একশো আমার ছেলে।
তারাই চেনে মৃত্যুর দেবতা শমনকে, জানে কীভাবে ধ্বংসের রাত নামাতে হয়,
মহাধ্বংসের সেই দিনে আড়ালে থাকা সমস্ত কানাকানি নিমেষেই ছড়িয়ে পড়বে বাতাসে।
0 Comments