সদ্যোজাত চাকলাদার
প্রতিবিম্ব
রাত দেড়টা। ৭ নম্বর জাতীয় সড়কের অলকাত্রা-কালো বাঁকে তখন শ্রাবণের মাতন। ঘন কুয়াশার বুদ্বুদ চিরে উইন্ডশিল্ডে আছড়ে পড়ছে চাবুকের মতো জলধারা। স্টিয়ারিং চেপে ধরা অয়নের হাতের তালুতে জমাট ঘাম; এসি-র ঠান্ডা হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে এক অচেনা অস্বস্তি। হঠাৎ আলোর বৃত্তে ভেসে উঠল রাস্তার ঠিক মাঝখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা এক শ্বেতবস্ত্রা নারীমূর্তি।
সজোরে ব্রেক কষল অয়ন। টায়ারের তীক্ষ্ণ আর্তনাদে কেঁপে উঠল হাইওয়ের আদিম নিস্তব্ধতা; গাড়িটা খাদের প্রান্ত ছুঁয়ে থমকে গেল।
যান্ত্রিক শব্দে দরজার লক খুলতেই পেছনের সিটে বসল ভিজে একাকার অবয়বটি। ব্যাকভিউ মিররে অয়ন দেখল, মেয়েটির স্থির নীল মণি আর ঠোঁটের কোণে জমে থাকা এক অতল হিমশীতল শূন্যতা।
অস্বস্তি কাটাতে অয়ন ধাতব কণ্ঠে বলল, "এই নিঝুম রাতে একা... কোথায় নামবেন?"
মেয়েটি জবাব না দিয়ে সামনে ঝুঁকে এলো। অয়নের ঘাড়ের ওপর স্থির হলো তার বরফশীতল নিঃশ্বাস, "পাঁচ বছর আগের এই কালরাত্রির কথা মনে পড়ে অয়ন? সেদিন মদের ঘোরে এক তরুণীকে চাকার নিচে থেঁতলে দিয়ে নিশুতি রাতে পালিয়েছিলে?"
বুকের অলিন্দে তীব্র পক্ষাঘাত নামল অয়নের। আতঙ্কে রুদ্ধ হয়ে আসা গলায় অয়ন ফিসফিস করল, "তুমি কে?"
🍂
মেয়েটির নির্জীব হাসি আছড়ে পড়ল, "আয়নায় নিজের অবয়বটা দেখো অয়ন!"
অয়ন কাঁপা চোখে ব্যাকভিউ মিররে তাকাল। শূন্য কাচ—সেখানে অয়নের কোনো প্রতিবিম্ব নেই! পেছনের সিটটাও আদিঅন্তহীন ফাঁকা!
মেয়েটির মেটে কণ্ঠস্বর এবার অয়নের মাথার কোটরে আছড়ে পড়ল, "দশ মিনিট আগেই বাঁকটায় ব্রেক ফেল করে তোমার গাড়ি আশি ফুট নিচের পাথুরে খাদে চুরমার হয়ে গেছে। আমি আসিনি তোমায় মারতে, এসেছি তোমায় সাথে করে শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দিতে।"
একসাথে চুরমার হয়ে গেল সবকটা কাচ। অন্ধকার খাদে তলিয়ে যেতে যেতে অয়ন বুঝল—এ গাড়ি তার অবচেতন অপরাধবোধের মায়াজাল, আর সে বহু আগেই এক নিথর মৃতদেহ।
অসমাপ্ত সমীকরণ
গলির মুখে দাঁড়িয়ে বিজু দেশলাই জ্বালল। হাওয়ায় শিখাটা নিভে গেল দু-বার। আজ বিজয়ার রাত, গঙ্গার ওপার থেকে বিসর্জনের বাজনা ভেসে আসছে।
"দেশলাইয়ের কাঠি শেষ হলে আমার কাছে লাইটার আছে।"
ঘুরে তাকিয়ে বিজু থমকে গেল। অনন্যা। নীল শাড়ি, সিঁথিতে চেনা ফিকে লালচে দাগ। পাঁচ বছর আগে এই অনন্যাই মাঝরাত্রে এসে বলেছিল, "আমায় নিয়ে কোথাও পালিয়ে চলো বিজু।" বিজু পারেনি। বেকারত্বের লজ্জা তাকে সেদিন ভিতু করে দিয়েছিল।
"তুমি এখানে?"
"অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। বাসের ভিড়ে দম আটকে আসছিল, তাই ঘাটের দিকে এলাম," অনন্যা হালকা হাসল।
দুজনে নিস্তব্ধ ভিড় ঠেলে ঘাটের শেষ সিঁড়িতে গিয়ে বসল। জল নেমে গেছে, ভেজা শ্যাওলার গন্ধ বাতাসে। বিজু পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতেই অনন্যা বলল, "এখনও ছবি আঁকো?"
"আঁকি। এখন প্রদর্শনী হয়, মোটা দামে বিক্রিও হয়। অভাব গেছে, কিন্তু ছবিগুলোর আর প্রাণ নেই।"
অনন্যা গঙ্গার কালো জলের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। তাদের মাঝখানের দূরত্বটা কোনো অনুযোগের নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রাপ্তিহীনতার।
বিজুর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে পিসির নাম। ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে পিসির ডুকরে ওঠা গলা— "বিজু, তুই শুনেছিস? আজ বিকেলে হাইওয়েতে অনন্যাদের গাড়িটা লরির ধাক্কায় জলে পড়ে গেছে... অনন্যা আর ওর স্বামী কেউ বাঁচেনি রে!"
1 Comments
শনিবারের বারবেলা।
ReplyDelete