ঘুসপেটিয়া
শ্রীজিৎ জানা
-ও পঞ্চাত লাতি! মোর কি হবে গো? মোকে কি বাংলাদেশে পাঠি দিবে নাকি গো?
- তমার কাগজে ভুল থাকলে ত কিছুই করার নাই,ঠাকমা।
-কাগজপাতি-ই সব। মানুষের কুনু দাম নাই? তমার বাপের বিয়া দেখলি। তমাকে হতে দেখলি।তদ্দিন কার বউড়ি এই গেরামের, কে না জানেনি!
- উসবে জানলে ত হবেনি ঠাকমা। সরকারি নিয়মে পরিচয়পত্র ঠিক দেখাতে হবে।
-কাগজ বলতে ত ওইগুলানই আছে। ভোটকাট,আঁধারকাট আর রেশনকাট। আর কি থাকবে? ওইগুলান ত সরকারের দেয়া। থাইলে?
-তমার সমস্যা অন্য জাগায। আগের ভোটার লিস্টে নাম ছিল চম্পা তেয়ারি। এখন নাম চম্পা রানী ডগরা। আবার তমার বাপের নাম শম্ভু কারফার। ইত পুরা পিন্ডি চটকানা কেস। তাই তমাকে হেয়ারিং নোটিস ধরিছে। ইখিনে ত মোর কিছু করার নাই।
চম্পা ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে থাকে পঞ্চাযেতের দিকে। পাঁচ বোন আর এক ভাই তারা। বাপ তার দুটি বোনের বিয়ে দিতে পেরেছিল। মদ খেযে খেয়ে লিভারের রোগে মারা যায়। মা তার বিয়ে দেয় বিহারে। স্বামীর নাম ওমপ্রকাশ তেয়ারি। বিয়ের হপ্তা খানেক পর থেকেই ওমপ্রকাশ রোজ মারত তাকে। বছর তিনেক পরে চলে আসে সে। পাড়ায় তাকে কত গালমন্দ শুনতে হয়। সেই সময ভোটার লিস্টে নাম লেখানোর কাজ হচ্ছিল। চম্পা আর স্বামীর ঘরে ফিরতে চায়নি। পাড়ার নন্দ মাস্টার চম্পা তেযারি নামেই ভোটার লিস্টে নাম তুলে দেয়। বছর দুয়েক পর চম্পার বিয়ে হয় আনন্দপুরের বসন ডগরার সাথে। সেও মারা গেছে আজ বছর আটেক হলো। তিন ছেলের সংসার। তাকে কেউ ভাত দ্যায় না। স্বামীর ভিটার এক কোণে একটা ঝিটাবেড়ার ঘরে থাকে চাঁপিবুড়ি । বয়স সত্তর পেরিযেছে। এস আই আর পর্বে চাঁপিবুড়ির নামে নোটিস আসায় চিন্তার শেষ নেই তার। তাকে অমন করে চেয়ে থাকতে দেখে পঞ্চায়েত শংকর ছাতিক বলে
- অত চিন্তা করনি গো ঠাকমা। ঘরকে যাও। তাড়ি দিবে বল্লেই কি সস্তার তাড়ানা!
- মোর মেজ বেটার বড় ছেনাটা বোম্বে থাকে। জান, লাতি, সে বলেঠে আমি নাকি ঘুসপেটা। আর বলেঠে আমি নাকি রোঙ্গা। ইসব কি পঞ্চাত লাতি? তাবাদে এতবার যে ভোট দিলম তখন ত বলেনি চাঁপিবুড়ি ই দেশের লয়?
- সেটা ঠিকই বলেচ ঠাকমা। কিন্তু তমার দুসালের ভোটে নাম আছে চম্পা তেয়ারি। অথচ তমার বাপের পদবী কারফার। এখন আবার ডগরা।
-- পদবী মোর যাই হউ,মানুষটা ত আমি একই আছি!
-উসব ত আইন বুজবেনি ঠাকমা। তা বলি কি তমার বাপের, তমার আগের বরের কিছু কাগজ নাই?
-- সে ত কত কালের কথা গো লাতি। কিচ্ছুটি নাই। অত কি জানতি,ইসব হবে বলে। সাদে কি মোর দাদু বোলত কাগজ লয় রে,উ কা -গঁজ। গঁজ ঢুকলে পা পুঁজিযে লষ্ট করে দিবে। মোর হইচে সেই মরণ দশা। তা লাতি সত্তি করে বল না, মোকে কি উ দেশে পাঠি দিবে? আমি থাইলে ঘুসপেটা নাকি রোঙ্গা হয়েই চলে যাব?
- অই ত বল্লম। দেয় দিবে। তমার ছেনারাো ত এম্নিতে তমাকে দেখেনি। সেখিনে না হয থাকবে।
-নাই দেখু। তবু ত অরা মোর পেটের ছেনা। অদের ছেড়ে,লাতিপুতি ছেড়ে,সোয়ামির ভিটা ছেড়ে যেতে পারবো নি গো পঞ্চাত লাতি। কাগজে মোর নাম যাই লিখু আমি ত জানি মোর গেরাম আমডাঙরা। সোয়ামির গেরাম আনন্দপুর। মোর বাপ শম্ভু কারফার। মা কাজলি কারফার। জন্ম হইচে যে দেশে,মোরবো সেখিনেই। মোকে কেউ লি যাতে পারবেনি গো পঞ্চাত লাতি।শুদু ছেনাগুলানের জন্নে মনটা হাউহাউ করেঠে। উঠতে বসতে দাঁতে ভাঙেঠে বৌমারা
- মা না উ কালমুখি। কুনু কাগজপাতি-ই রাখেনি। নিজেও যাবে খালকে, মোদেরকেও তাড়াবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস আছড়ে পড়ে মাটিতে। নড়বড় করে উঠে দাঁড়ায় চাঁপিবুড়ি। অশীতিপর বৃদ্ধার কুঞ্চিত চর্মগাত্রের মুখমণ্ডলে কৃষ্ণবর্ণের মেঘ ঘনায়মান। তাতে যেন সমগ্র দেশের আশঙ্কাই ঘনীভূত হয়েছে।
🍂
0 Comments