পার্থপ্রতীম মিশ্র
কবি দিলীপ মহান্তীর 'মৌসুমি বায়ুর দেশ' কাব্যগ্রন্থে মোট ৩৮টি কবিতা স্থান পেয়েছে।কাব্যটি 'জ্বলদর্চি' থেকে প্রকাশিত।প্রথম প্রকাশ:অক্টোবর,২০২৬।বইটির প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন শিল্পী দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়।
কাব্যের সমস্ত কবিতাগুলি পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই,একদিকে রয়েছে প্রকৃতির আনন্দধারা,পালাবদল প্রকৃতির কোলে আত্মলীন হওয়ার অদম্য ইচ্ছা।কখনও অতীতের রোমন্থনে ফিরে যাওয়া শৈশব বেলা। এছাড়া কয়েকটি কবিতায় প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নানা লোকায়ত আচার অনুষ্ঠান,লোকবিশ্বাস প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে।অন্যদিকে শহুরে সভ্যতা,হতাশা,যন্ত্রণা, ক্লান্তি যেমন দানা বেঁধেছে মনে,তেমনি দেখা গেছে জীবনকে পাল্টে দেওয়ার শপথ,উত্তরণের মন্ত্র,আশাবাদ। বিষয় উপস্থাপনের অনুষঙ্গে এসেছে পৌরাণিক নানান প্রসঙ্গ ও চরিত্রের সমাবেশ। সহজ সরল কথায় গভীর ভাবনার প্রকাশে,দেশজ ও চলিত শব্দের প্রয়োগে,সর্বোপরি অনবদ্য চিত্রকল্পের সমাবেশে মুন্সিয়ানার পরিচয় পাই কবি দিলীপ মহান্তীর মধ্যে।
কবির প্রথম কবিতা 'অভিষিক্তা'। এক সিক্ত বসনা উঠে আসছে সুদূর ভূমধ্যসাগর থেকে ইরান- আফগানিস্তানের মরুময় তাপ-তপ্ত পরিবেশের উপরদিয়ে,যার আঁখিতে মেঘভার।তারপর কবির একান্ত আকুতি সে যেনো ধূসর রোদে পোড়া এ জীবনের উঠোনে নেমে আসে,তাকে সিক্ত করে। 'আশ্বিনের ঝড়' কবিতায় তেমনি দেখতে পাই দেহজ মিলনের আদিম অন্ধকার,আবেদন-নিবেদনের ধারাভাষ্য-
"তুমি ক্রমশ লাবন্যমাখা থোড়ে শীষে দুধ আসা ধানক্ষেত হয়ে উঠছো।
আমি ও হয়ে উঠছি আশ্বিনের ঝড়"।
'আগুন' কবিতায় আগুন ধ্বংসের প্রতীক নয়,বরং জীবনকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস। 'বৃষ্টি' কবিতা মূলত প্রকৃতি,প্রেম,নস্টালজিক মনন ও আবেগের মেলবন্ধন।'চিত্রলেখা' এক মানব জীবনের বিবর্তন ধারাপাত।'মেঘমালা' কবিতা যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে সরে এসে শৈশবের পাঠশালায় আসল সত্তাকে খুঁজে পাওয়া।'করম' কবিতার বিষয় প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক।আদিবাসী গোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানকে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস। তেমনি 'টুসু'কবিতায় টুসু উৎসবের সূচনা,আচার-অনুষ্ঠান, গ্রামীণ নারীদের ভূমিকা এবং প্রকৃতির সাথে গভীর সংযোগ অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। 'ইঁদ' রাঢ় বাংলার আদিবাসী সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।'শালগাছ','লাল মাটি','ইঁদ পরব-এর মতো শব্দগুলো মাটির গন্ধকে মনে করিয়ে দেয়।
আলোচনার শেষ টানছি এই কাব্যের নাম কবিতা'মৌসুমি বায়ুর দেশ'নিয়ে।কবিতার মূলভাব ভারত বা বাংলা ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট,বহিঃশত্রুর আক্রমণ,লুণ্ঠন,পাশাপাশি সামাজিক- রাজনৈতিক নানা সংঘাত,দুর্নীতি,মূল্যবোধের অবক্ষয় ধরা পড়েছে।শুধু তাই নয়,মানুষের সংঘবদ্ধতায় পরিবর্তন ঘটবে তার ইঙ্গিত ও সুস্পষ্ট।
সহজ সরল ভাষায়,উপমা,রূপক,সমাসক্তি,অতিশয়োক্তি অলংকার প্রয়োগে,মাত্রাবৃত্ত,মুক্তক, গদ্য ছন্দের নৈপুণ্যে কবি দিলীপ মহান্তীর 'মৌসুমি বায়ুর দেশ' কাব্যটি সত্যিই অনবদ্য হয়ে উঠেছে।
0 Comments