স্মৃতিগদ্য:
যে শরৎ আর ফিরে আসে না
সুদীপা চৌধুরী
শরৎ এলেই আমার মনে হয়, পৃথিবী বুঝি একটু ধীরে হাঁটতে শুরু করেছে। ভোরের জানলা দিয়ে যখন সাদা কাশফুলের মতো মেঘ ভেসে যায়, দূর থেকে কোনো অচেনা পাখির ডাক আসে, কিংবা বিকেলের রোদটা হঠাৎ নরম হয়ে গিয়ে বারান্দার মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলে, তখন মনে হয়—কোথাও একটা পুরোনো দরজা খুলে গেল। সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আমার ছোটবেলা।
সেই ছোটবেলার শরৎ ছিল অন্যরকম। তখন শরৎ মানেই ছিল পুজো আসছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল দাগ দেওয়া কয়েকটি দিন যেন সারা বছর অপেক্ষা করে থাকত আমাদের জন্য। পুজো আসার অনেক আগে থেকেই বাড়ির মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। মায়ের আলমারি খোলা, পুরোনো জামাকাপড়ের হিসাব, নতুন জামার গন্ধ, বাবার বাজারের থলে, আর সন্ধ্যা হলেই পাড়ার মোড়ে প্যান্ডেল তৈরির শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হতো, আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটাও যেন উৎসবের জন্য একটু একটু করে সেজে উঠছে।
আমাদের পুজোয় খুব বেশি কিছু ছিল না। ছিল না বড় বড় আলো, ছিল না নামী শিল্পীর অনুষ্ঠান, ছিল না দূরদূরান্ত থেকে মানুষ টানার মতো কোনো চমক। অথচ সেই পুজোগুলোর আনন্দ আজও বুকের মধ্যে কোথাও অক্ষত হয়ে আছে। কারণ আনন্দের জন্য তখন আমাদের অনেক কিছু দরকার হতো না। একটি নতুন জামা, হাতে দুটো ফুচকা, প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে ধূপের গন্ধ নেওয়া, আর বন্ধুদের সঙ্গে রাত অবধি ঘুরে বেড়ানো—এইটুকুতেই পৃথিবী সম্পূর্ণ হয়ে যেত।
পুজোর আগের রাতগুলো ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যের। দূরের কোনো বাড়িতে ঢাক বাজছে, কোথাও মাইক পরীক্ষা হচ্ছে, গলির মধ্যে বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা ছুটে ছুটে দেখতাম প্রতিমার মুখে শেষ তুলির টান পড়ছে কি না। তখন মনে হতো, দেবী যেন সত্যিই আমাদের পাড়ারই কোনো বাড়ির মেয়ে। কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়ি আসছেন। তাই তাঁর আসার অপেক্ষাটাও ছিল আপনজনের অপেক্ষার মতো।
🍂
আজ এত বছর পরে বুঝি, পুজোর আনন্দের চেয়ে বড় ছিল অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষাটাই এখন নেই।
এখন পুজো আসে সময়মতো, কিন্তু অপেক্ষা আসে না।
শহরের আলো অনেক বেড়েছে। প্যান্ডেল বড় হয়েছে। প্রতিমা আরও শিল্পসম্মত হয়েছে। মানুষের হাতে দামি ফোন এসেছে, গাড়ি বেড়েছে, রেস্তোরাঁয় ভিড় বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুজোর ছবি পোস্ট হওয়ার আগেই পরের ছবি তোলার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। অথচ কোথাও যেন সেই পুরোনো বিস্ময়টা হারিয়ে গেছে। আমরা উৎসবকে দেখি, কিন্তু উৎসবের মধ্যে আর ঢুকতে পারি না।
একদিন বহু বছর পর পুজোর সময় সেই পুরোনো পাড়ায় গিয়েছিলাম। প্যান্ডেল হয়েছে, আলো হয়েছে, ভিড়ও হয়েছে। কিন্তু পরিচিত মুখ খুব কম। যে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে একসময় সন্ধ্যার পর গল্প করতাম, সেখানে এখন অন্য মানুষ থাকে। যে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত, সেটাও নেই। দোকানের জায়গায় ঝকঝকে একটি ছোট্ট খাবারের দোকান। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। কেউ আমাকে চিনল না। অথচ আশ্চর্য, আমি সেই রাস্তাটাকে চিনেছিলাম। রাস্তা আমাকে চিনল কি না জানি না।
হঠাৎ মনে হলো, আমরা আসলে কোনো জায়গা ছেড়ে চলে যাই না। জায়গাগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের ছেড়ে চলে যায়। বাড়ি বদলে যায়, দোকান বদলে যায়, মানুষ চলে যায়, গাছ কেটে ফেলা হয়, রাস্তার নাম বদলে যায়। শুধু স্মৃতির ভিতর সেই জায়গাগুলো একই রকম থেকে যায়। তাই পুরোনো কোনো গলিতে ঢুকলেই মনে হয়, এই তো সেই দিন—এইমাত্র কেউ আমাকে ডাকবে, এইমাত্র বন্ধুরা দৌড়ে এসে বলবে, “চল, পুজো দেখতে যাই।” কিন্তু কেউ আসে না।
স্মৃতি বোধহয় এমনই এক অদ্ভুত দেশ, যেখানে মৃত সময়ও বেঁচে থাকে। সেখানে সন্ধ্যা কখনও নামে না, প্রিয় মানুষ বুড়ো হয় না, পুরোনো বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা জমে না। সেখানে আমরা যে বয়সে সুখী ছিলাম, ঠিক সেই বয়সেই থেকে যাই।
তাই শরৎ এলেই আমি আকাশের দিকে তাকাই। কাশফুল দেখি, শিউলির গন্ধ পাই, ঢাকের শব্দ শুনি। আর মনে মনে ফিরে যাই সেই পুজোগুলোর কাছে, যেগুলো এখন আর কোনো ক্যালেন্ডারে নেই।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের জীবনে আসলে কোনো সময়ই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। মানুষ চলে যায়, উৎসব বদলে যায়, বাড়ি ভেঙে যায়, সম্পর্কের রং ফিকে হয়ে আসে—তবু কোথাও একটা অদৃশ্য ঘরে তারা থেকে যায়। শরতের নরম আলোয় সেই ঘরের দরজা হঠাৎ খুলে যায়। তখন মনে হয়, আমি আবার ছোট হয়ে গেছি। হাতে নতুন জামা, পায়ে নতুন জুতো, দূরে ঢাক বাজছে, মায়ের গলা ভেসে আসছে—“বেশি রাত করিস না।”
আমি জানি, সেই দিন আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তবু প্রতি শরতে আমি তার জন্য অপেক্ষা করি। কারণ কিছু কিছু দিন ফিরে আসে না, অথচ তাদের জন্য অপেক্ষা করতেই ভালো লাগে। হয়তো সেই অপেক্ষার নামই স্মৃতি। হয়তো সেই অপেক্ষার নামই শারদীয়া। আর হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর শরৎটি সবসময়ই পড়ে থাকে একটি পুরোনো বিকেলের ভেতর, যেখানে আমরা একদিন খুব অল্প কিছু নিয়েই ভীষণ সুখী ছিলাম।
শিউলির গন্ধে ফিরুক হারানো দিনের গান,
0 Comments