তুলি মুখার্জি চক্রবর্তী
মিউনিখ থেকে কলকাতা ফিরব আবুধাবি হয়ে। এবার আমাদের দুজনের ভ্রমণ। শুরু হয়েছে ইংল্যান্ড থেকে। মিউনিখ ঘুরে দেখলাম দুইদিন। নতুন দেশ এসে সব দেখছি অবাক হয়ে। ভাতের খোঁজে আফগান রেস্টুরেন্টে ঢুকে বেস্বাদ খাবার খেয়েছি। আলু টমেটো হলুন নুনের মুরগির ঝোল। কনকনে ঠান্ডায় এক বৃদ্ধাকে ডাস্টবিন ঘাঁটতে দেখেছি খাবারের জন্য। পাশেই চার্চে প্রেয়াররত উদাসীন বড়লোক দেখলাম। অবাক হয়ে উঠে পড়ি 'হফ অন হফ অফ' বাসে। এই বাসের টিকিট কাটলে যেখানে ইচ্ছে নামা যায় এবং পরবর্তীতে ওদের অন্য বাসে উঠে ফিরে আসাও যায়। বেশ অদ্ভুত। ঘুরে দুপুরে ফিরলাম হোটেলে। পরেরদিন আমাদের ফ্লাইট। ওলা-উবর ৯০০ ইউরো দেখাচ্ছে এয়ারপোর্ট ড্রপ করতে। আমরা দুজনে ট্রেনের খোঁজে বেরোলাম রেকি করতে। হোটেল থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে একটু এগোলেই বড় রাস্তা।রাস্তা পেরোলেই সুরঙ্গ পথ। সেই পথে ট্রেন। ওদেশে লেয়ারে লেয়ারে ট্রেন চলে এক একদিকের। খোঁজ নেবার মানুষ নেই। সবাই যে যার মতো ছুটছে গন্তব্যের ট্রেন ধরতে। আমরা রেলের চাকুরে মানুষ খুঁজছি জানকারি নেবার জন্য। অনেক খোঁজাখুঁজি করে অফিস দেখলাম যেখানে ঝকঝকে রেল চাকুরে কম বয়সী ছেলেরা বসে। ভাষা পার্থক্য। তাও বুঝলাম আরো দুই লেয়ার নেমে এয়ারপোর্ট যাবার ট্রেন পাবো। ভোর ৬.৪০ এ প্রথম। সেই জায়গা ঘুরে দেখে এলাম।
গোছগাছ করে টেনশন নিয়ে শুলাম, ঘুম এলোই না। জানুয়ারির বিকট ঠাণ্ডায় উঠে ছুটতে হবে লাগেজ নিয়ে। উঠে সব নিয়ে নামলাম লিফটে। এই হোটেলের একটা অদ্ভুত নিয়ম। ঢোকার গেট দিয়ে বেরোনো যাবে না কারণ ভীষণ ছোট্ট একফালি জায়গায় রিসেপশন। বসার জায়গা নেই। ভিতর থেকে বেরোনোর একটা গেট আছে পেছনের দিকে। সেন্সর চাবিতে। ঘুরে ফিরে ঢুকতে হলে পেছনের গেটের সেন্সরে চাবি টাচ করলেই খুলবে। ভিতর থেকে খোলা যায় চাবি ছাড়া। আমরা জিজ্ঞেস করায় বলেছিল চাবি রুমে রেখে দরজা টেনে ঐ গেট খুলে যেন যাই। অত ভোরে ওদের কেউ থাকবে না চাবি নিতে এবং গেট খুলতে। আবার অবাক।
যাইহোক, সব নির্দেশ পালন করে বাইরে বেরিয়ে ছুটলাম সুরঙ্গ অভিমুখে। তারপর তিন লেয়ার লিফ্ট খুঁজে নামলাম অত লটবহর সহ। স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে স্টেশনে গরম চা স্বপ্নের অতীত। হিহি কাঁপুনি নিয়ে দেখছি পরপর ট্রেন থামছে, চলে যাচ্ছে। আমাদের ট্রেনের সামনে এরোপ্লেনের ছবি থাকবে। সে আসতে আরো দশ মিনিট।
🍂
হঠাৎ দেখি সিঁড়ি বেয়ে একটি মোমরঙা মেয়ে ছুটে ছুটে নেমে আসছে। তার গায়ের রঙের সঙ্গে ম্যাচ করা লঙ জ্যাকেট টুপি স্কার্ফ। সে এসেই আমাদের জিজ্ঞেস করল ইংরাজিতে, তোমরা কি এয়ারপোর্ট যাবে? আমরা হ্যাঁ বলতেই হাসিমুখে বললো, খুব ভালো হলো, আমিও এয়ারপোর্টে যাব। স্টেশনে লোক খুব কম। আমার হাসব্যান্ড তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি টিকিট কেটেছ?? সে চোখ বড় করে মাথা নাড়ে। টিকিট কেটে আনতে বলায় সে সুটকেস নিয়ে আবার ছুটতে লাগলো। তার চলার দিকে তাকিয়ে আমরা। মরিয়া হয়ে ছুটছে মেয়েটি। কোনোদিকে খেয়াল নেই। হাতে থেকে স্কার্ফ পড়ে গেল প্ল্যাটফর্মে। সে ছুটছে। স্কার্ফটা কুড়িয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাবছিলাম ট্রেন আসার মধ্যে মেয়েটি না এলে ওখানে নামিয়ে রেখে ট্রেনে উঠব। তার হাতে দিতে পারব না ভেবে মনটা খারাপ। কিন্তু নিরুপায় আমরা।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে আরো উপরে টিকিট মেশিন। সেখানে ভিড় লাইন আছে। আমি দেখছি, সময় কমছে পাঁচ মিনিট, চার, তিন, দুই... ওহ্ ঐ তো নামছে সিঁড়ি বেয়ে। এদিকে ট্রেন ঢুকছে।
ওর হাতে স্কার্ফটা দিতেই রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়লো মুখে। বললো, তোমরা খুব ভালো মানুষ। কোনদেশের থেকে?? বললাম,ভারত ইন্ডিয়া, নাম শুনেছ?? সে হেসে বললো, খুব শুনেছি। আমি তো আজারবাইজানের। ওখানে আমার বাড়ি। ছুটিতে একা ঘুরতে এসেছিলাম। এখন ফিরছি দেশে। ট্রেনে একসাথে বসে এয়ারপোর্ট পৌঁছালাম। এরপর দুই দিকে। ওর ফ্লাইট বাঁদিকের পথে, আমরা ডানদিকে।
কিন্তু উপরে উঠতে হবে এস্কালেটারে। একদিকে দুটোই উঠছে। সময় কম,লাগেজ অনেক।, এদিকে আমার পায়ের চোট। একটাও বড় সুটকেস নিয়ে উঠতে পারব না।কি করি? মেয়েটি আমার হাসব্যান্ডকে বললো, 'আমি উপরে উঠে দাঁড়াচ্ছি, তুমি একটা করে সুটকেস উপরে রাখো। আমি দেখব'। নিচে আমার হেফাজতে সব রেখে আমার হাসব্যান্ড একটা করে সব তুললেন আর ঘুর পথে নেমে আবার আরেকটা। উপরে ঐ মেয়েটি সেসব নিয়ে। সব শেষে আমি উঠলাম। মিষ্টি হেসে বিদায় নিলো। ওর চলে যাবার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম। তারপর আমাদের ফ্লাইটের দিকে চললাম। লাগেজ জমা করে সিকিউরিটি চেকিং সেরে বসলাম। আধঘন্টার পরিচয় কিন্তু মনটা বেশ খারাপ হলো এই বিচ্ছেদে। পৃথিবীতে কত ভালো মানুষ!! সৌভাগ্যে দেখা হয় শুধু।
0 Comments