জ্বলদর্চি

পুজোর ছুটি (স্মৃতি গদ্য)/সুচরিতা চক্রবর্তী

পুজোর ছুটি (স্মৃতি গদ্য)

সুচরিতা চক্রবর্তী 

মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের গলা বাজতেই মা ঘুম থেকে তুলে দিত। আমাদের পুরোনো ফিলিপস রেডিওটা ঘড় ঘড় করত, তবু পুজো এসে গেছে টের পেতাম ওই আওয়াজেই। ক্লাস নাইনের অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা সবে শেষ। রেজাল্ট যা-ই হোক, পুজোর ছুটির পনেরোটা দিন আমার। বাবা রেলের চাকরি করে, ছুটি পায় মাত্র চারদিন। তাই ঠিক হল, অষ্টমীর দিন সকালে আমরা তিনজন রওনা দেব মামাবাড়ি, বীরভূমের সিউড়ির কাছে ছোট্ট গ্রাম আমোদপুরে।
ট্রেনের টিকিট কাটা হল বর্ধমান পর্যন্ত, তারপর বাস। আমার ব্যাগে তখন তিনটে নতুন জামা, একটা ডায়েরি, আর কাকার দেওয়া ক্যামেরা। ফিল্মের রোল মাত্র একটা, ৩৬টা ছবি। হিসেব করে তুলতে হবে।
পঞ্চমীর দিন স্কুলে শেষ ক্লাস। দিদিমণি হোমওয়ার্ক দিতে গিয়ে থেমে গেলেন। হেসে বললেন, “যা, পুজো দেখ। কিন্তু দশমীর পরের দিন থেকে পড়তে বসবি।” আমরা হুল্লোড় করে বেরিয়ে এলাম। পাড়ার প্যান্ডেলে তখন বাঁশ বাঁধা শেষ, ঠাকুরের কাঠামোয় মাটি লেপা চলছে। ঢাকী কাকা ঢাকটা রোদে দিয়ে বাজিয়ে দেখছে। সেই শব্দে বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় মা বোধনের ঘট বসাল। বাবা অফিস থেকে ফিরে নতুন পাঞ্জাবি মেলে ধরল আলনার উপর। আমি ছাদে উঠে দেখলাম, পাড়ার প্রতিটা বাড়ির ছাদে আলোর মালা টাঙানো হচ্ছে। কলকাতা থেকে দূরে আমাদের মফস্বল শহরটাও তখন আলোর মালায় রাজার মতো সাজে।
সপ্তমীর সকাল। ঠাকুর দেখতে বন্ধুদের সঙ্গে বেরোলাম। নিয়ম হল, প্যান্ডেলের সংখ্যা গুনব। দুপুরে বাড়ি ফিরে পায়ে ফোস্কা, তবু বিকেলে আবার বেরোনো। নতুন জুতো কামড়ে ধরেছে, খুলে হাতে নিয়ে হাঁটছি। মা দেখে বকল, “পুজোর সময়ও জুতো হাতে? লোকে কী বলবে!” আমি হেসে জানাই, পুজোর সময় লোকে কিছু বলে না মা। 
🍂
অষ্টমীর ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনে ভিড় কম,  হাতে পুঁটলি, বাচ্চাদের হাতে খেলনা নিয়ে অপেক্ষায় কেউ কেউ।  ট্রেনে জানালার ধার পেলাম। ধানক্ষেতের উপর দিয়ে সাদা কাশফুল উড়ছে। বাবা বলল, “দেখ, এটাই পুজোর সিগনেচার।” আমি ক্যামেরা তুললাম। ক্লিক। ৩৬টার মধ্যে একটা গেল।
বর্ধমানে নেমে বাস। ভাঙা রাস্তা, গরুর গাড়ি, আর পালা করে লোডশেডিং। দুপুর গড়িয়ে আমরা যখন আমোদপুর পৌঁছালাম, মামাবাড়ির উঠোনে ঢাক বাজছে। মামা দৌড়ে এসে আমাদের ঘরে নিয়ে গেলো। আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, তবু মামার কাছে আমি সেই ছোট্ট ভাগ্নেই। দিদা  হাতে নাড়ু দিল।
মামাবাড়ির পুজো তিনশো বছরের পুরোনো। চণ্ডীমণ্ডপের থামে এখনও তলোয়ারের কোপের দাগ। অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় একশো আট প্রদীপ জ্বলে। আমি ক্যামেরা নিয়ে রেডি। মামাতো বোন টুম্পা বলল, “দাদা, আমারও একটা ছবি তুলবি না?” তুললাম। ওর নতুন ফ্রক, চোখে কাজল, হাতে কাশফুল।
নবমীর দিন গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ে মণ্ডপে। কলকাতার মতো থিমের বালাই নেই, এখানে শোলার সাজ, ডাকের সাজ, আর মায়ের ভরাট মুখ। পুরুতমশাই মন্ত্র পড়েন, আর ঢাকী কাকা এমন ঢাক বাজায় যে বুকের ভেতর কাঁপন ধরে। রাতে যাত্রা হল। ‘মহিষাসুর বধ’। আমি প্রথম দেখলাম। আলো কম, মাইক ঘড় ঘড় করে, তবু রাজা-রানির সংলাপে গোটা মাঠ চুপ।
দশমীর সকালটা বিষণ্ণ। মা দিদার চোখ ছলছল। আমি বুঝতে পারি না, মা তো মাটির, তবু কেন সবাই কাঁদে। বিসর্জনের আগে মামা বলল, “চল, তোকে একটা জিনিস দেখাই।”
পুকুরপাড়ে নিয়ে গেল। একটা ভাঙা রাজবাড়ি। শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি। মামা বলল, “এখানে আমার দাদু লুকিয়ে স্বদেশী করত। পুলিশ এলে পিছনের সুড়ঙ্গ দিয়ে পালাত।” আমি অবাক। পুকুর পাড়ে স্বাধীনতার  ইতিহাসও থাকে !
বিকেলে বিসর্জন। কাঁধে করে ঠাকুর নিয়ে যাচ্ছে গ্রামের ছেলেরা। “আসছে বছর আবার হবে” চিৎকারে আকাশ কাঁপছে। পুকুরে যখন মা পড়ল, আমার মনে হল ছুটিটাও ডুবে গেল। টুম্পা  বলল, “দাদা, আবার কবে আসবি?” আমি কথা দিতে পারলাম না। ক্লাস টেন, সামনে বোর্ড পরীক্ষা।
একাদশীর দিন ফেরার পালা। দিদা ব্যাগে নাড়ু, গুড়, মুড়কি ভরে দিল। মামা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এল। বলল, “পড়াশোনা করিস, কিন্তু পুজোয় আসিস। না এলে মা দুঃখ পায়।” বুঝলাম, মা মানে শুধু দুর্গা নয়, দিদাও।

ফেরার বাসে জানালার ধারে বসে ডায়েরি খুললাম। লিখলাম, পুজোর ছুটি আসলে কী। নতুন জামা? ঠাকুর দেখা? না। পুজোর ছুটি হল অপেক্ষা শেষ হওয়ার দিন। সারা বছর এই কটা দিনের জন্য আমরা বাঁচি। ইস্কুলের রুটিন, বাবার অফিস, মায়ের সংসার, সবাই যেন এই সময়টায় একসঙ্গে নিঃশ্বাস নেয়।
বাড়ি ফিরে দেখি পাড়া ফাঁকা। প্যান্ডেল খোলা হচ্ছে, বাঁশগুলো ট্রাকে উঠছে। আলোর মালা খুলে নিয়েছে। শুধু রাস্তার কোণে কোণে শোলার ফুল পড়ে আছে। সেগুলো কুড়িয়ে আনলাম। মা বলল, “এসব দিয়ে কী হবে?” বললাম, “পরের বছরের জন্য রেখে দিই।”
রাতে ছবি প্রিন্ট করাতে দিলাম। ৩৬টার মধ্যে ৩২টা উঠেছে। বাকি চারটে আলো পায়নি। টুম্পার ছবিটা সবচেয়ে ভালো এসেছে। কাশফুলের ব্যাকগ্রাউন্ডে ওর হাসি। ছবিটা দিদাকে পাঠাব বলে খামে ভরলাম।
পুজোর ছুটি শেষ। কিন্তু রেখে গেছে অনেক কিছু। ক্যামেরার ফিল্মে কয়েকটা মুহূর্ত, ডায়েরিতে কয়েকটা লাইন, আর বুকের ভেতর একটা টিক টিক শব্দ। ওটা আসলে কাউন্টডাউন। আবার কবে মহালয়া, আবার কবে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ, আবার কবে মামাবাড়ির নাড়ু।
বাবা রাতে বলল, “বড় হয়ে গেলে পুজোর আনন্দ কমে যায়।” আমি মনে মনে বললাম, “কমে না বাবা, বদলে যায়।” আগে পুজো মানে ছিল নতুন জামা,  নাগরদোলা। এখন পুজো মানে ফিরে দেখা। যে উঠোনে একবার পা দিয়েছ, সেখানে প্রতি বছর টান পড়ে।
 পুজোর ছুটি শুধু ছুটি নয়। ওটা একটা সাঁকো। এক বছরের ক্লান্তি থেকে আরেক বছরের স্বপ্নে পৌঁছে দেওয়ার সাঁকো। আমি সেই সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে আছি, হাতে টুম্পার ছবি, ব্যাগে শোলার ফুল, আর মনে একটাই মন্ত্র, “আসছে বছর আবার হবে।”

Post a Comment

1 Comments

  1. Liton RakibOctober 05, 2026

    খুউব সুন্দর লাগলো স্মৃতি মেদুর লেখনী

    ReplyDelete