দীপালি সাহু
আজ অষ্টমী । সন্ধে হতে না হতে চারদিকে আলোর রোশনাই ।বক্সে বাজছে রগরগে চলতি গান।কান ফাটানো আওয়াজ । বিশ্বনাথ বাবু ঘরের ভেতর থেকেই তার বিকট আওয়াজ পাচ্ছিলেন । দরজা জানালা বন্ধ করেও তার তীব্রতা রোধ করতে পারেন নি । একটু আগেই তিনি ফোনএ বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া শুনছিলেন। পুজোর নস্টালজিক অনুভূতিকে ছুঁয়ে দেখার জন্য ,কিন্তু পারলেন না ।কিছু সময় পরে তিনি বারান্দায় এসে বসলেন । বিশ্বনাথ বাবু এখন বাহাত্তরে পা দিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। বারান্দায় বসে বিশ্বনাথ বাবু দেখছিলেন পাশের ক্লাবের প্যান্ডেলে তরুণ-তরুণীরা উজ্জ্বল পোশাকে হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে , সেলফি তুলছে । মানুষজন পরিবারসহ মায়ের সামনে । অনেক বছর আগের পুজোর স্মৃতি মনে পড়ছিলো। একসময় মফস্বলের বাড়ির উঠোন গম গম করত প্রিয়জনদের পদচারণায়। বিশ্বনাথবাবু ছিলেন সেই আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সময় তার নিজস্ব নিয়মে নদীর মতো বদলেছে। আজ বড় ছেলে সুদূর টরন্টোয় নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, ছোট মেয়ে কর্মসূত্রে বেঙ্গালুরুতে।
তিন বছর আগে সহধর্মিণী সুচরিতা দেবীও ওপারে পাড়ি দিয়েছেন।চারপাশের এই অতিরিক্ত আলো আর কোলাহল বিশ্বনাথবাবুকে আনন্দ দেওয়ার বদলে যেন ভেতরে তীব্র এক মানসিক যন্ত্রণা দেয়।তিনি অভ্যাসবশত দুটো কাপে চা ঢেলে একটি টেবিলের ওপাশে রাখেন, যেন সুচরিতা এখনই এসে বসবেন। কিন্তু ওপাশের ফাঁকা চেয়ার ফাঁকা বাড়ি যেন হাঁ করে গিলতে আসে।বাইরে আলোর উৎসব যত বাড়ছে, বিশ্বনাথবাবুর একলা ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা যেন তত বেশি ভারী হয়ে উঠছে।
🍂
উৎসব যে সবসময় আনন্দ বয়ে আনে না, আমাদের সামাজিক কাঠামোর এ এক চিরন্তন অথচ গোপন সত্য। সমাজ আমাদের শৈশব থেকে শিখিয়ে এসেছে পুজো মানেই নতুন জামার গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ, আতশবাজির রোশনাই আর এক অদ্ভুত যৌথ উল্লাস। কিন্তু বাস্তব জীবনের নিরিখে এই আলোর ঝলকানি সবার কাছে ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে না; অনেকের কাছে এটি বয়ে আনে গভীর হাহাকার, একাকীত্ব ও নিঃশব্দ যন্ত্রণা। উৎসব মানেই কি শুধু আনন্দ, হাসি, আলো আর উদযাপন? সমাজে আমরা প্রায়ই এমন একটি ধারণার মধ্যে বড় হই যে উৎসবের সময় সবাই খুশি থাকে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অনেক মানুষের কাছে উৎসব আনন্দের পাশাপাশি নিয়ে আসে এক ধরনের শূন্যতা, একাকীত্ব, চাপ, দুঃখ কিংবা পুরনো স্মৃতির ভার।বাইরে এতো আলো থাকলেও মনের ভিতরে অনুভূত হতে পারে চাপা অন্ধকার।
যখন চারপাশের মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, তখন যাঁরা একা থাকেন, প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, সম্পর্কের সমস্যার মধ্যে আছেন, আর্থিক চাপের মুখোমুখি, অথবা জীবনের কোনো কঠিন সময় পার করছেন—তাঁদের কাছে উৎসবের দিনগুলো কখনও কখনও আরও কঠিন মনে হতে পারে।
এই অভিজ্ঞতাকে অনেক সময় “ফেস্টিভ্যাল ডিপ্রেশন” বা উৎসবকালীন মন খারাপ বলা হয়।অর্থাৎ উৎসবের সময় দুঃখ, একাকীত্ব, উদ্বেগ, মানসিক চাপ বা বিষণ্ণতার অনুভূতি তুলনামূলক ভাবে বেড়ে যাওয়া ।
উৎসবের সময়ে যখন চারপাশের প্রতিটি গলি, আকাশ আর মানুষের মুখ আলোয় ঝলমল করে, ঠিক তখনই একজন বিষণ্ণ বা একাকী মানুষের ভেতরের অন্ধকারের গভীরতাটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিউরোসায়েন্সের ভাষায়, অতিরিক্ত আলো ও শব্দ ব্রেনকে এক তীব্র বৈপরীত্যের মুখোমুখি করে। যখন একজন মানুষ দেখে বাইরে আনন্দের জোয়ার কিন্তু তার নিজের ভেতরটা শূন্য, তখন এই তুলনার ধাক্কা তার মনের জমাটবদ্ধ কষ্টকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কাদের এই সমস্যা হতে পারে. ..
প্রবীণ মানুষ :
জীবনের এই বয়সে এসে একাকীত্ব, জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোক ,সন্তানদের কাছে না থাকা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে তারা নিজেদের অবহেলিত বা অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। উৎসবের দিনগুলোতে অতীতের সুন্দর দিনগুলোর স্মৃতি তাদের আরও বেশি কাতর করে তোলে । এছাড়া আধুনিক উৎসবের দ্রুত গতি (যেমন: হুল্লোড়, সেলফি, ক্যাফে কালচার)-এর সাথে প্রবীণদের ধীরগতি মিলতে পারে না। ফলে সমাজ বা পরিবার না চাইলেও প্রবীণরা নিজেদের মানসিকভাবে আলাদা বা 'অপ্রয়োজনীয়' মনে করতে শুরু করেন।
পরিবার থেকে দূরে থাকা প্রবাসী মানুষ :
পড়াশোনা, চাকরি বা জীবিকার প্রয়োজনে যারা ঘর ছেড়ে অন্য শহর বা দেশে থাকেন এবং উৎসবে বাড়ি ফিরতে পারেন না। চারপাশের মানুষের পারিবারিক আনন্দ দেখে তাদের ভেতরে তীব্র নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়।
প্রিয়জন হারানো বা ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তি
সম্প্রতি যাদের জীবনে কোনো বড় ক্ষতি হয়েছে (যেমন: বাবা-মা/সঙ্গীর মৃত্যু, ডিভোর্স বা সম্পর্কের বিচ্ছেদ, অথবা চাকরি হারানো)। উৎসবের আনন্দের আবহাওয়া তাদের ভেতরের শূন্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।অনেক সময় তাঁদের কাছে উৎসব যেন স্মৃতির আঘাত। অনেক পুরানো স্মৃতি যা তাঁরা ভুলতে চান তার ঝাঁপি খুলে যেতে থাকে, সাথে অনেক তিক্ততা ও যন্ত্রনা বয়ে নিয়ে আসে।
অতিরিক্ত দায়িত্ব ও মানসিক চাপে থাকা মধ্যবয়সী বা গৃহিণী
উৎসবের কেনাকাটা, অতিথি আপ্যায়ন, ঘর সাজানো, রান্নাবান্না ও অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে গিয়ে যারা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সবাইকে খুশি করার সামাজিক চাপে তারা নিজেদের খেয়াল রাখতে পারেন না।
তরুণ ও কিশোর-কিশোরী
ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে সহপাঠী ও বন্ধুদের কৃত্রিম "পারফেক্ট উৎসব“এর ছবি দেখে এরা নিজেদের জীবনকে হীন মনে করতে শুরু করে এবং বিষণ্ণতায় ভোগে।
আগে থেকেই মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষ
যারা আগে থেকেই ডিপ্রেশন,অ্যাংজাইটি , বাইপোলার ডিসঅর্ডার কিংবা সোশ্যাল ফোবিয়ায় ভোগেন। উৎসবের অতিরিক্ত আলো, শব্দ, ভিড় এবং মানুষের সমাগম তাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
অন্তর্মুখী বা ইন্ট্রোভার্ট মানুষ
যারা একা থাকতে বা শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন। উৎসবের সময়ে অনবরত সামাজিক যোগাযোগ বা চারদিকের হৈ হট্টগোলে তারা মানসিকভাবে হাঁপিয়ে ওঠেন।
উৎসবের সবচেয়ে বড় মানসিক ট্র্যাপ হলো সমাজে চেপে বসা এক অদৃশ্য নিয়ম—যে উৎসব মানে আনন্দে থাকতেই হবে
উৎসবের ছুটিতে পরিবারের সবাই যখন একত্র হয়, তখন পুরনো কোনো পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা মানসিক মতভেদের ক্ষতগুলো আবার নতুন করে জেগে উঠতে পারে, যা উৎসবের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে ।
এই কষ্ট বা অসুবিধা থেকে বেরিয়ে আসার উপায়. ...
প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে উৎসবের দিনে মন খারাপ হওয়া কোনো অপরাধ নয়। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে তাকে গ্রহণ করা জরুরি।কারুর অভাব বোধ হতেই পারে ।কাছের মানুষের মৃত্যু বা বিচ্ছেদ হলে তার সাথে উৎসব নিয়ে কিছু বিশেষ মুহূর্ত মনে আসবে । সেটা তখনি কষ্ট বেশি অনুভব করায় যখন আমরা ভাবি আর কখনো এরকম সময় বা ভালো লাগা আমার জীবনে আসবে না।স্মৃতি তখন ভালো লাগা দেয় না অপ্রাপ্তি বা হাহাকারের অনুভব নিয়ে আসে। হয়তো তার সাথে বা সেই রকম মুহূর্ত আসবে না । কিন্তু অন্য কারুর সাথে অন্য রকম মুহূর্ত তৈরী করতে পারি । যেমন কোনো একজন প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, পুরনো কোনো বন্ধুর খোঁজ নেওয়া, কারও পাশে দাঁড়ানো কিংবা নিজের পছন্দের কোনো কাজে সময় দেওয়া উৎসব কে বিশেষ মানে দিতে পারে । যা হারিয়ে গেছে তার চেয়ে যা আমার বর্তমান জীবনে যা আছে সেগুলো একটু খেয়াল করা যেতে পারে ।
উৎসবকে নিজের মতো করে গ্রহণ করুন। সবার মতো বড় আয়োজন করতেই হবে, সব অনুষ্ঠানে যেতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ছোট ছোট ভালো লাগার মুহূর্তও মূল্যবান হতে পারে।
পুরানো সব কিছু ভালো ছিল আর নতুন সব কিছুখারাপ ভেবে , নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে সবার থেকে দূরত্ব তৈরী না করা। মনে করে দেখুন পুরানো অনেক কিছুতেও অনেক খারাপ লাগা আছে । নতুনকে গ্রহণ করতে পারলে বুঝবেন অনেক ভালোলাগার বোধ তৈরী হচ্ছে ।
শরীরের যত্নও মনের যত্নের অংশ। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাবার, কিছুটা হাঁটা বা বিশ্রাম মনকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।অথচ উৎসবের সময়ই আমরা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাই।
উৎসবের আলো শুধু বাড়ির বাইরে নয়, মানুষের মনেও পৌঁছানো দরকার। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা ভিড়ের মধ্যেও একা। তাই শুধু দামি দামি গিফট সবাইকে না দিয়েও
উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর উপহার হতে পারে একটু সহানুভূতি, একটু সময়,একটু যত্ন একটু সময় কাটানো ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা অন্যের সুন্দর মুহূর্তের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনকে তুলনা করবেন না। মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ গল্প কখনও শুধুমাত্র কয়েকটা ছবি , ভিডিও বা রীলস এ বোঝা যায় না।
উৎসবকে 'পারফেক্ট' হতে হবে—এই চিন্তা বাদ দিন। সাধারণ একটা বই পড়া, এক কাপ চা খাওয়া বা বারান্দায় একা বসে বাতাস উপভোগ করাও উৎসবের আনন্দ হতে পারে।
0 Comments