জ্বলদর্চি

মুক্তি/ ষষ্ঠ পর্ব /স্বাতী ভৌমিক

মুক্তি
 ষষ্ঠ পর্ব 
স্বাতী ভৌমিক 

 আজ সকাল থেকেই সুভাষিনীকে খুব খুশি মনে হল। গতকাল সন্ধ্যেবেলা তার দিদি তাকে একটি কাজের সন্ধান দিয়েছেন। প্রকাশবাবুর সাথে এ নিয়ে গতকাল তো কথাও হয়েছে, খুব একটা অমত আছে বলে মনেও হয়নি। আজ অফিস সময়ের মধ্যে তাকে সিদ্ধান্তটা জানাতে হবে। সুভাষিনী ভাবছিল, খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির কাজগুলো সব গুছিয়ে নিয়ে দুপুরবেলা ভাত খাবার পর সে প্রকাশবাবুর সাথে এ বিষয়ে কথা বলবে। তাই সুভাষিনী খুব উদ্যমের সাথে সমস্ত কাজ গোছানোর চেষ্টা করছিল। প্রকাশবাবু ঘুম থেকে উঠে সুভাষিনীকে অন্যদিনের তুলনায় একটু অন্যরকম ভাবে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, " কিগো, আজ তোমাকে খুব প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে- কোন ব্যাপার আছে নাকি? কোন আত্মীয়স্বজন আসবে নাকি ?" সুভাষিনী বলল, " না না, সেরকম কোন ব্যাপার না- তোমার সাথে একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করার আছে। তাই এত তড়িঘড়ি কাজ সারছি।" 

 প্রকাশবাবু ব্যাপারটা যে আন্দাজ করতে পারছেন না- এতটা নির্বোধ তিনি নন। হাওয়া বুঝতে পেরে তিনি এখন আর কোন কথা না বাড়িয়ে নিজ কাজে মন দিলেন। আসলে সুভাষিনীর উত্তরের মধ্যে আজ আলাদা একটা জোর ছিল। কেমন যেন একটা দৃঢ়তা ছিল। তার চোখের ভাবে প্রকাশবাবু তা লক্ষ্য করেই তেমন কিছু আর না বলে সঠিক সময়ের অপেক্ষায় নিজের কাজ সারতে লাগলেন।
🍂
 সমস্ত কাজ তাড়াতাড়ি সেরে দুপুরবেলায় সুভাষিনী খাবারের আয়োজন করল। আজ মনের অজান্তেই হোক বা ভবিষ্যতের সুখ-স্বপ্নেই হোক বেশ মনোমতো অনেক খাবারের  আয়োজন করেছিল সুভাষিনী। মেয়ে ও স্বামীকে খেতে দিয়ে বাকি খাবার নিয়ে সে নিজে খেতে বসলো। খাওয়া শেষে সমস্ত স্থান সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে সমৃদ্ধিকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিয়ে গেল। মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে তার চোখেও তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব নেমে আসছিল কিন্তু আজ তো ঘুমোলে হবে না।প্রকাশবাবুর সাথে যে অনেক প্রয়োজনীয় কথা আছে তার।

 মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সুভাষিনী প্রকাশবাবু যেখানে অফিসের প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র উল্টে দেখছিলেন সেখানে গেল।সেখানে গিয়ে কোন ভনিতা না করেই সুভাষিনী বলে উঠলো,  "হ্যাঁ গো, শুনছো? আমার কিছু দরকারী কথা ছিল তোমার সাথে।" প্রকাশবাবু বললেন," হ্যাঁ- বলো। তোমার কথার জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম। তা তোমার দিদি কিছু খবর দিয়েছেন বুঝি?"

 সুভাষিনী বলল, " হ্যাঁ, দিদি একটি অফিসে কাজের জন্য বলেছিল।সেখানে কাজটা হবে বলেছে। দিদি আমার শিক্ষাগত সমস্ত যোগ্যতা বলেছে। কোম্পানির ম্যানেজার দিদির সাথে পরিচিত। বলেছেন- কাজটা হয়ে যাবে। তবে আমি যদি কাজটা করতে চাই, তাহলে আজ অফিস টাইম মানে চারটার মধ্যে জানাতে হবে। আগামীকাল তাহলে ম্যানেজার আমার ইন্টারভিউ নেবেন।"

 প্রকাশবাবুর যদিও আলোচনাটা খুব একটা মনোগ্রাহী ছিল না, তথাপি পুরোপুরি উপেক্ষাও তিনি করতে পারলেন না। তার বিব্রত মনোভাবের প্রতিরূপস্বরূপ সুভাষিনীর প্রতি এই উক্তিটুকুই বেরিয়ে এল-" যা তোমার ভালো মনে হয়, কর। আমি তো এখন অক্ষম, তাই আমার কথায় কার কী বা যাবে আসবে!" 

 সুভাষিনী প্রকাশবাবুর কথা শুনে খুব একটা আশ্চর্যান্বিত হয়নি। কারণ প্রকাশবাবু কবেই বা তাকে এতটা স্বাধীনতা দিয়েছেন যে সুভাষিনী মন খুলে কথা বলতে পারবে!
 সে এটুকু বুঝে গিয়েছিল যে, তাকে এই পরিস্থিতিতে সংসার বাঁচাতে গেলে, মেয়েকে মানুষ করতে গেলে সংসারের নিত্যকর্মের সাথে সাথে অর্থনৈতিক হালটাও তাকে ধরতে হবে। তাই সুভাষিনী বেশি কিছু তর্কে না গিয়ে বলল, " তাহলে তোমার অমত নেই ধরে নেবো তো!" প্রকাশবাবু বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু তা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে বিছানায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন।

 সুভাষিনী ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের মনে মনে যা সে প্রকাশ্যে বলতে পারেনি, তা নিজের মনের কাছে নীরবে বলতে লাগলো-" তুমি কবেই বা চেনা সীমানার বাইরে আমায় পা রাখতে দিয়েছো! মেয়ে বলে কম তাচ্ছিল্য তো করো না। মেয়েরা যেন সংসার-হেঁসেল ঘর ছাড়া আর কোন কিছুই সামলাতে পারে না! মেয়েদের চেনা চৌহদ্দি তো শুধু পরিচয় করিয়ে দেওয়া সীমানাটুকুই বলে মনে করো।আর তাও তো মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সংসার যখন ভাসতে বসেছে, তখন আমি কী করেই বা সব জেনে বুঝে তোমার ভুল ধারণা গুলোকে বাঁচাতে গিয়ে আমার কর্তব্য ভুলে যাই! তাই এবার আমি এটা প্রমাণ করে দেবো  যে, মেয়েরাও ইচ্ছে করলে সংসার বাঁচানোর ক্ষমতা রাখে এবং সেটা খুব ভালোভাবেই পারে।" এরকম আরো অনেক কিছু সুভাষিনী বলে চলল আপন মনে। আর এসবের ফাঁকে কখন যে তার দুই গাল বেয়ে অঝোরে জল ঝরছিল তা সুভাষিনী নিজেও বুঝতে পারেনি। সম্বিত ফিরল মেয়ের ডাকে," মা, তুমি কাঁদছো কেন? বাবা কী তোমায় আজ আবার বকেছে?" সুভাষিনী বোধ হয় অজান্তে কোন অবলম্বনই খুঁজছিল। মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছে হু হু করে কেঁদে উঠলো সে।তার কিছু পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে সুভাষিনী ফোন হাতে বাড়ির বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। ঘড়িতে তখন সময় প্রায় বিকেল চারটের কাছাকাছি। আর তো বেশি সময় তার হাতে নেই- নিজেকে প্রমাণ করারই হোক বা সংসারকে টেনে তোলারই হোক।
 
ক্রমশ

Post a Comment

0 Comments