সৌমী ঘোষের “ছোটোগল্প পরিক্রমা”
সালেহা খাতুন
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক সৌমী ঘোষের “ছোটোগল্প পরিক্রমা” গ্রন্থটি সাহিত্য অনুসন্ধিৎসু গবেষক-পাঠক এবং শিক্ষার্থী সমাজে সাদরে গৃহীত হবে এ আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়। সৌমীর খোলা মনের আলোচনা বলা ভালো মননের জানালা খুলে রাখা ছোটোগল্পের আলোচনায় আলো বাতাস দুই-ই এনে দিয়েছে। গল্প বলা বা শোনা নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। আর সেই মানুষের মনে যখন এরই গঠন নিয়ে গড়ন নিয়ে, বয়ন নিয়ে, বিষয় নিয়ে, উপস্থাপন নিয়ে বিবিধ প্রশ্ন ওঠে তখনই তিনি পাঠকসত্তা অতিক্রম করে সমালোচক হয়ে ওঠেন।
সমালোচক সৌমী "ছোটোগল্প পরিক্রমা" গ্রন্থে আলোচনা করেছেন মোট এগারো জন গল্পকারের গল্প নিয়ে। এঁদের মধ্যে আছেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, আশাপূর্ণা দেবী, কমলকুমার মজুমদার, অসীম রায় ও নরেন্দ্রনাথ মিত্র। সৌমী রবীন্দ্রনাথকে এখানে রাখেননি বলে একটু অবাকই হয়েছিলাম। তবে আলোচনার শুরুতেই রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে নিয়েছেন তিনি। ত্রৈলোক্যনাথের "নয়ানচাঁদের ব্যবসা" গল্প পর্যালোচনার শুরুতেই গল্পকারের গল্পের মেজাজ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বলা কথাকেই উদ্ধৃত করেছেন - " অসম্ভব অমূলক অদ্ভুত রসের কথা"।
ত্রৈলোক্যনাথের গল্পের পাঠক রূপে "লুল্লুভূত" এবং "যমালয়ে জীবন্ত মানুষ"-এ এখনও যেভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আছি তাতে সৌমীর উচ্চারণ যথার্থই - " কথাসাহিত্যিক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪৭-১৯১৯) নাম উচ্চারিত হলেই পাঠক-হৃদয়ে বিশিষ্ট রসানুভূতির সৃষ্টি-সংবেদ জেগে ওঠে।"
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের গল্প পরিক্রমার নিদর্শন একটি মাত্র গল্প পর্যালোচনায় অতোটা পরিলক্ষিত না হলেও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের "খালাস" গল্প আলোচনায় সৌমী বেশ সামগ্রিক একটি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন গল্পকারের অন্যান্য রচনাগুলির সংক্ষিপ্ত উল্লেখের মাধ্যমে। এতে গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পকারসত্তার স্বরূপ অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।
🍂
ছোটোগল্প রচনা শরৎচন্দ্রের ক্ষেত্রে একটি প্রক্ষিপ্ত ঘটনা হলেও "মহেশ" গল্পের কথা সমগ্র বাঙালি পাঠক মাত্রই অবগত আছেন। অবশ্য ইদানীং এ উচ্চারণ বদলে, ওয়াকিবহাল সাহিত্য পাঠক বলাই ভালো। সৌমী "মহেশ" গল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন সামাজিক-আর্থিক প্রতিকূলতায় এমন নির্মম অথচ বাস্তব জীবনচেতনার নির্মাণ শরৎচন্দ্রের পক্ষেই সম্ভব।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "মেঘমল্লার" বন্দিনী দেবী সরস্বতীর মুক্তির গল্প। এ গল্পের সঙ্গেও পাঠকরূপে এমন এক রোমান্টিক মধুর স্মৃতি বিজড়িত হয়ে আছি যে সৌমীর গল্প নির্বাচনে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। ওর পাঠক সত্তা আর সমালোচক সত্তার সাথে গভীরভাবে একাত্মতা অনুভব করতে পারি। গল্পের আখ্যান, পটভূমি, কেন্দ্রীয় চরিত্র, নামকরণ প্রভৃতি প্রসঙ্গ আলোচনা করে সৌমী এখানে কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণের শিল্পীসত্তার এক নিরাসক্ত শান্ত মূর্তিকে ধরে দিয়েছেন।
গল্পকার তারাশঙ্করের অজস্র গল্প থেকে সৌমী বেছে নিয়েছেন পশুকেন্দ্রিক গল্প "কালাপাহাড়"কে এবং প্রাসঙ্গিক ভাবে তিনি বাংলা ছোটোগল্পে অবলা মনুষ্যেতর জীবের উপস্থিতিকে তুলে ধরেছেন তাঁর আলোচনায়। "আদরিণী", "মহেশ", "বুধীর বাড়ি ফেরা", "গবিন সিংয়ের ঘোড়া", "সৈনিক" প্রভৃতি এই শ্রেণির বিখ্যাত সব ছোটোগল্পের উল্লেখ করেছেন। মানব ও মানবেতর সম্পর্কের পারস্পরিক মানসিক সংযোগ তাঁর আলোচনায় সম্যক ভাবে পরিস্ফুট হয়েছে।
টেকনিক বিশারদ, পরিহাস শিল্পী গল্পকার বনফুলের ভাব-বিশ্বের পরিচয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে এ গ্রন্থের লেখক সৌমী বেছে নিয়েছেন "পাশাপাশি" গল্পটিকে। তিনি দেখিয়েছেন বনফুলের গল্পে কীভাবে সত্যের অনুপম চেতনা উৎসারিত হয়।
কল্লোলের অন্যতম অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের মনোবিকলনের আবহে নির্মিত "ধরা বিয়ে" গল্পটি আলোচনার মাধ্যমে সৌমী দেখিয়েছেন অচিন্ত্যকুমারের গল্পবিশ্বের তথা লেখন শক্তির ভিত্তিমূল হলো জীবন সচেতন মানবিক অনুভূতি।
আশাপূর্ণা দেবীর "তাসের ঘর" গল্প বিশ্লেষণের শিরোনামায় "মেয়ে মানুষের সংসার" অভিধা প্রয়োগ করে সৌমী বুঝিয়ে দিয়েছেন এর মূল ভাবনাকে। তাসের ঘর যেমন ক্ষণস্থায়ী, যেমন সহজেই ভেঙে যায় তেমনই গল্পের নায়িকা মমতার সাজানো সংসারও সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে নিমেষেই ভেঙে গেছে।
সৌমীর এই "ছোটোগল্প পরিক্রমা"য় পাঠকের সবথেকে বড়ো প্রাপ্তি হলো কমলকুমার মজুমদারের পাঁচটি গল্প - "লাল জুতো", "প্রিনসেস", "মধু", "মহামানবের জন্ম" এবং "সমাহিত" গল্পের বিশ্লেষণের মাধ্যমে কথকতার অন্য এক ভুবনে যাত্রার সুযোগ। কমলকুমারের রচনারীতি এবং প্রকাশভঙ্গির বিশিষ্টতা সাধারণ পাঠককে কিছুটা দূরে ঠেলে ঠিকই কিন্তু সৌমী অনায়াসে সেই দুর্ভেদ্যতার বর্ম থেকে গল্পগুলির মূল সুর চিনিয়ে দিয়েছেন। "লালজুতো"র বাৎসল্যের নিবিড় রস , "প্রিনসেস"-এ মানব মানবীর প্রেমজ আকর্ষণ, "মধু" গল্পে শহুরে কথক এবং দেহাতি বিবাহিতা যুবতীর মানসিক টানাপোড়েন, আত্ম-অন্বেষণ এবং "মহামানবের জন্ম"-এ মহামানবের জন্মের আড়ালে নিষ্ঠুর ও বিধ্বংসী মারণসত্যের উন্মোচন, "সমাহিত" গল্পে আত্মবোধের সংকট দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে চমৎকার বুঝিয়েছেন সৌমী।
এই গ্রন্থের সর্বশেষ প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে "নরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং অসীম রায়ের ছোটোগল্পে সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা ও উত্তরণের মনোভূমি"। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের "কেরামত","জৈব" এবং "পালঙ্ক" আর অসীম রায়ের "গড়ালবাড়ি", "করিমের জাগরণ", "পদযাত্রা", "খোকনের জীবনযাত্রা", "সল বেলো বাড়িওয়ালা বাংলাদেশ", "শৈলবাসে একা" গল্প বিশ্লেষণ করে সৌমী দেখিয়ে দিয়েছেন উত্তরকালের ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতার পরিসরে এই গল্পগুলি একই সঙ্গে দৃষ্টান্ত ও হাতিয়ার রূপে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সার্বিক প্রতিরোধে ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ্রন্থ : ছোটোগল্প পরিক্রমা
গ্রন্থকার : সৌমী ঘোষ
প্রকাশক : পুস্তক বিপণি, কলকাতা ৯
প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর ২০২৪
0 Comments