জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২২৭

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২২৭
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে 
চিত্র গ্রাহক: কণিষ্ক মন্ডল

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই? আজ  কালী পুজো। গতকাল কি ছিলো বলোতো ? গতকাল ছিলো ভূত চতুর্দশী। দিনের বেলায় প্রায় সবার বাড়িতেই নিশ্চয়ই চোদ্দ শাক রান্না হয়েছিল, খেয়েছিলে তো সবাই? আর সন্ধ্যায় নিশ্চয়ই ১৪ টা প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল? আর  রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে, একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দরজার বাইরে রেখে সোজা ঘরে ঢুকে পেছনে না তাকিয়ে দরজা বন্ধ করেছিলে ? আসলে কি জানো এগুলোই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের কালচার। নিশ্চয়ই তোমরা ভাবছো , এ আমার কি , ভূত নিয়ে আবার এ কি সংস্কৃতি? আরে শোনো শোনো, এই সংস্কৃতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে।  হ্যালোউইন তো নিশ্চয়ই জানো তোমরা। বলো তো হ্যালোউইন কি ? আচ্ছা এই সপ্তাহে তোমরা সবাই খুঁজে বার করো সারা পৃথিবীতে ভূতেদের নিয়ে কি কি উৎসব পালন করা হয়। পরের সপ্তাহে আমি তোমাদের সারা পৃথিবীর ভূতেদের উৎসব নিয়ে চিঠি লিখবো। ভালো থাকো সবাই। সন্ধ্যায় কালী পূজো দেখতে যেও। অনেক ভালবাসা নিও। 
ইতি তোমাদের স্বাগতাদি।

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ 

চল্লিশ পর্ব

রতনতনু ঘাটী

আজ টিফিন ব্রেকের পর স্কুলে দেখা গেল মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিকে। তিনি নাওয়া-খাওয়া সেরেই সটান গগনজ্যেতি স্কুলের দিকেই আসছিলেন। আসার পথে লোকনের বাড়ি হয়ে আসতে গেলেন। দেখে আসতে গেলেন পারুলমণিকে, তার জ্বর কমল কিনা। উনি লোকনের বাড়ির উঠোনে এসে সাইকেল থেকে নেমে তো অবাক। পারুলমণি উঠোন থেকে শুকনো নারকোল পাতাগুলো আঁটি বেঁধে রাখছে। 

   মুকুলকৃষ্ণবাবু প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এ তুমি কী করছ পারুল? হাতড়ে হাতড়ে নারকোল পাতাগুলো আঁটি বাঁধতে বসে গেছ। না না। এই কাজটা তুমি মোটেও ভাল করোনি পারুল! তুমি রাধাকে আসতে দাও। রাধাপিসিকে তো আজ থেকে বিকেলবেলা তোমার কাছে থাকতে বলেছি? তুমি জ্বর একটু কমেছে বলেই অমনি উঠে কাজে লেগে পড়েছ? যাও, উঠে ঘরে যাও! লোকন কোথায়?’

   পারুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মুকুলকৃষ্ণস্যার, আপনি বসুন! না না। আমার ভুল হয়েছে। আসলে, সন্ধের মুখে যদি আকাশ থেকে বৃষ্টি ফোঁটা ধরতে শুরু করে, তা হলে কতদিন ধরে শুকিয়ে থাকা নারকোল ডাঁটাগুলো ভিজে জাউ হয়ে যাবে। রাধাপিসির উনুন ধরাতে কষ্ট হবে। তাই আমি ওগুলো তুলে রাখছিলাম স্যার।’

   ‘তুমি একাহাতে যদি পৃথিবীর সব কাজ করবে, তা হলে আর লোকজন পৃথিবীতে থাকার দরকাক কী শুনি? আর লোকজন পৃথিবীতে থেকে কী করবে শুনি? লোকনকে দিয়ে নারকোল পাতাগুলো তুলিয়ে রাখলে পারলে না?’

   ‘না স্যার! লোকন তড়িঘড়ি করে ছুট লাগাল গগনজ্যোতি স্কুলের দিকে। আজ থেকে তো ক্রিকেট কোচিং শুরু হবে। ওকে ধরেবেঁধে রাখা কঠিন স্যার !’

   মুকুলবাবু মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন, ‘সত্যি! ভাইটা তোমার ক্রিকেট পাগল! আসলে কী জানো তো পারুল, সংগ্রামী জীবনে মানুষকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য ক্রিকেট খেলার মতো পৃথিবীতে আর কিছুই হয় না। দেখো তোমার ভাই একদিন খুব বড় ক্রিকেটার হবে।’

   পারুল দুঃখী মুখে বলল, ‘স্যার, গরিবের ঘরের ছেলের কি অমন কপাল হবে? আমার বাবা যদি বেঁচে থাকত, তা হলে দেখতেন, লোকনকে কত দূরে পোঁছে দিত!’ হাত তুলে ধরল আকাশের দিকে, ‘ওই দূর আকাশের কিনারে!’

   ‘তুমিও তো ভাইয়ের জন্যে কম করছ না পারুল! যার ঘরে লোকনের মতো অমন ক্রিকেট সম্ভানাময় ভাই আছে, সে আমাদের সংসারে গরিব হতে পারে না। তুমিও গরিব নও পারুল।’

   ‘জানেন তো স্যার, আমি কতদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ভাইয়ের মুখে-চোখে হাত বুলিয়ে দিতে গিয়ে দেখি, ভাই চোখ পিটপিট করে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে জেগে আছে। জিজ্ঞেস করলে ভাই বলে, সে নাকি একটা দারুণ ক্রিকেটের স্বপ্ন দেখছিল। আমাকে বকে দিয়ে বলে ওঠে, ‘দিদি, তুই দিলি তো আমার অমন চমৎকার ক্রিকেটের স্বপ্নটা ভাঙিয়ে? আমি সেঞ্চুরির সামনে দাঁড়িয়ে আছি! আর মাত্র দুটো রান বাকি। এই বলটা ব্যাটে লাগাতে পারলেই একখানা যা বাউন্ডারি হাঁকাতাম না। সেঞ্চুরি পেরিয়ে যেত।’ এরকম কত যে স্বপ্নের কথা ভোররাতে আমাকে জাগিয়ে তুলে শোনায়, সে আপনাকে কী বলব?’

   ‘যাও যাও! আর বকবক করতে হবে না। এখন উঠোন থেকে উঠে গিয়ে গায়ে একখানা চাদর গায়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাকো! এক্ষুনি রাধাপিসি চলে আসবে। আমি এখন সাঁইসাঁই করে যাই, এতক্ষণে হেডস্যার আমার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে পথে দাঁড়িয়ে আছেন। আজ কোচিং শেষ হয়ে গেলে আমি লোকনকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি! তুমি চিন্তা কোরো না পারুল!’

   সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। সাইকেল বাঁইবাঁই করে ছুটল গগনজ্যোতি স্কুলের দিকে। হ্যাঁ, নবনীতস্যার এক পা এক পা করে সত্যিই বড় রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে চলে এসেছেন। হেডস্যারকে দেখে সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন মুকুসকৃষ্ণবাবু। বললেন, ‘জানি আপনি চিন্তা করছিলেন আমার জন্যে। আমি এক্ষুনি আসার পথে একবার পারুলমণিকে দেখে এলাম। ওর জ্বরটা এখন কমেছে।’

🍂

   এবার দু’জনেই খেলার মাঠে এসে দাঁড়ালেন। নবনীতস্যার ভরাট গলায় বললেন, ‘জানেন তো মুকুলবাবু, কোনও কালে নবীনগঞ্জে কোনও রাজা ছিলেন কিনা জানি না আমি সে ইতিহাস আমার পড়া নেই! তবে এখন নিজেকে নবীনগঞ্জের সম্রাট বলেই মনে হচ্ছে। আর আমাদের মাথার উপর আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাথার উপরের যে নীল রঙের রঙিন শেডের মস্ত একটা রাজছত্র!’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনি হেডস্যার না হয়ে যদি লেখক হতেন, তা হলে অনেক সেরা সেরা লিখে ফেলতে পারতেন! আপনার মনে অনেক কিহিনি ছিল, আপনার লেখার হাত ছিল আর দেখার চোখও ছিল!’

   ‘লেখক হতে কখনওই পারতাম না মুকুলবাবু। আমার সে প্রতিভা নেই। তবে আমি যদি লেখকই হতাম, তা হলে গগনজ্যোতি স্কুলের হেডসাস্টারগিরি কে করত শুনি? এই স্কুলটা যে আমার স্বপ্নের স্কুল মুকুলবাবু?’

   ‘সে তো জানি! এমন করে কাউকে স্কুলকে ভালবাসতে দেখিনি আমি নবনীতস্যার। আপনার আর আমার চেষ্টায় যদি এই স্কুল থেকে আমরা একজনও সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার তৈরি করতে পারি, সেটাই হবে আমাদের স্বপ্নের সফর।’

   ‘সে আপনি আছেন। আমি বড়জোর আপনার পাশে ছাতা উঁচিয়ে ধরে রাখতে পারি। সেরকম স্বপ্নের কথা ভেবেই তো একদিন এই স্কুলে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিলাম। তারপর ভগবান আপনাকে আমাদের সঙ্গে জুটিয়ে দিলেন!’

   ‘আমিও কলকাতা থেকে রিটায়ারমেন্টের পর গ্রামে চলে এলাম। আসার সময় ভাবছিলাম, গ্রামে ফিরে কী নিয়ে বাঁচব? এ নিয়ে বাড়িতে নন্দুকে বলেও ছিলাম, ‘দ্যাখো নন্দু,

কলকাতা ছেড়ে চলে এলাম। কিন্তু এখানে সময় কাটাব কী নিয়ে? কবে বলতে কবে দেখবে, আমি কলকাতার ট্রেনে চড়ে বসেছি!’

   মন্দু হাসতে হাসতে বলল, ‘আর আমি? আমি কী করব? পড়ে থাকব এই শাঁখাপোতা গ্রামে? এতদিন যেমন করে তোমার বাড়ি-ঘরদোর আগলে রেখেছি, তুমি কি ভাবছ, আমি এখনও অমন করে সব আগলে রাখব নাকি? আমিও গ্রামের পাট গুছিয়ে...’

   আমি মন্দুকে বলেছিলাম, ‘তুমি কি ভাবছ, তোমাকে এই গ্রামদেশে ফেলে রেখে যাব নাকি? তোমাকেও পোঁচলা বেঁধে কলকাতা নিয়ে যাব!’

   ‘তারপর আমাকে নিয়ে গিয়ে ওই ভবানীপুরের দেবেন্দ্র ঘোষ রোডের মেসবাড়িতে তুলবে নাকি? তা হবে না! আমি জানি, তোমার ক্রিকেটে নেশা কিছুতেই কাটবে না। একখানা ছোট ফ্ল্যাট কিনে নাও। তুমি তোমার ক্রপিকেট বিস্ব ন ইয়ে ডুবে থারবে। আর আমি সে ফ্ল্যাটের এক টুকরো বারান্দার কোণে একটা ছোট্ট খাঁচায় একটা কথা-বলা পাখি পুষব! আমাদের পুব পাড়ার আমিনুলচাচা তো আঠা পেতে পাখি ধরে বেড়ায়! শুনেছি, ওর নাকি একটা কথা-বলা শালিখ পাখি আছে? ওর ঘরে সে ছাড়াই থাকে। পোষ মেনেছে। পাখিটাকে কিনে নিয়ে যাব।’

   ‘মন্দাকিনী, ও পাখি তোমার কাছে পোষ মানবে এমন কথা কী?’

   এমন সময় কারও একটা বল ছক্কা হয়ে উড়ে এল উঁচুতে শেডে ধাক্কা খেয়ে একদম মুকুলকৃষ্ণবাবুর কাছে। মুকুলবাবু এই সহজ ক্যাচটা মিস করলেন না। বলটা ধরেই চিঞকার করে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ক্যাচ! ক্যাচ!’ 

   এ-সেকশানের একজন ফিল্ডার কাহ্ন ব্যানার্জি দৌড়ে এল। বলল, ‘স্যার লোকন ছয় মেরেছে!’

   বলটা কাহ্নকে দিয়ে মুকুলবাবু বললেন, ‘চলুন নবনীতস্যার, এই আষাঢ়ে গল্প আর একদিন না হয় জমিয়ে শোনানো যাবে! চলুন, এখন ক্রিকেট আমাকে ডাকছে!’

   দু’জনে আম্পায়ারের ভঙ্গিতে এসে দাঁড়ালেন। ব্যাট করছিল সি-সেকশান। ব্যাট হাতে পিচে দাঁড়িয়ে লোকন দাস। মুকুলবাবু লোকনের কাচে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত রান হল লোকন তোমার?’

   লোকন লজ্জিত মুখে বলল, ‘আমি তো মাত্র সাতটা বল খেলেছি। আমার রান পঁচিশ।’

   দেবোপমস্যারের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আম্পায়ারস্যার, আমি এক ওভার বল করতে পারি লোকনকে? আপনাদের তো তিন বলের ওভারের খেলার নিয়ম? তিনটে বল করি?’

   এ-সেকশানের মহিন দত্ত বল করছিল। দেবোপমস্যার তাকে বললেন, ‘মহিন, মুকুলস্যারের শখ হয়েছে লোকনকে এক ওভার বল করার। দেখি ইডেন মাঠের ক্রিকেট-বোদ্ধা কেমন বল করেন?’

   এবার লোকনের উদ্দেশে দেবোপমস্যার বললেন, ‘দেখি লোকন, এই তিন বলে তুমি তিনটে ছক্কা হাঁকাতে পারো কিনা? একটাও বল ছাড়া চলবে না কিন্তু!’

   দেবোপমস্যার এমনি করেই তাতিয়ে দিতে পারেন ক্রিকেটারদের। এখনও তাই করলেন। ধুতির কোঁচা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে মুকুলবাবু পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিলেন। হেডস্যার ঘণ্টিদাদুকে ডেকে বলে দিলেন, ‘এই খেলার পর বোলারের সেই দার্জিলি চা না খেলে জমবে না কিন্তু সম্মতিচরণ! তুমি রেডি হয়ে নাও!’

   প্রথম বল করলেন বেশ খানিকটা দৌড়ে এসে মুকুলবাবু। কিছুটা পায়ে-পায়ে জড়িয়ে প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। কোনও রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে হাত ফসকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলটা ছুড়ে দিলেন। লোকনের দিকে ছুটে গেল বলটা। ফুলটস হয়ে গেল বলটা। লোকন তৈরিই ছিল। সুযোগ হাতছাড়া করল না। বল চলে গেল বড় রাস্তার দিকে ফিল্ডারদের নাগালের বাইরে দিয়ে।

   হেডস্যার হাততালি দিয়ে উঠলেন। যেন তিনি মুকুলবাবুর প্রবল প্রতিপক্ষ! এবার ধুতির কোঁচাটা পাকিয়ে কোমরে জড়িয়ে নিলেন। নেক্সচ বল করলেন মুকুলবাবু। এবারের বলটা স্পিন করলেন। সামান্য লাফিয়ে বলটা উইকেট ঘেঁষে টুপুরটুপুর করে লাফাতে লাফাতে উইকেট কিপারের হাতে উঠে এল। বলটা ব্যাটেই লাগেনি। এ বলে কোনও রান পেল না লোকন।

   এবার দেবোপমস্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এটা ওভারের লাস্ট বল করছেন মুকুলবাবু। লোকন, তোমার ব্যাটের কেরামতি দেখতে চাই! এবার ছক্কা চাই।’

   মাঠ ভরতি ক্লাস এইটের চারটে সেকশানের ছেলেমেয়েরাও চিৎকার করে উঠল, ‘ছক্কা...ছক্কা...ছক্কা!’

এবারের বলটা সর্বশক্তি দিয়ে উইকেট লক্ষ করে পাঠালেন। না, লোকনকে চট করে অমন আউট করা যায় না। বলটা আউট সুইং ছিল। কেমন করে যেন হঠাৎ ইন সুইংয়ে পালটি খেয়ে বলটা ধেয়ে এল উইকেটের দিকে। লোকন ছাড়ার পাত্র নয়। চোখ বন্ধ করে সপাটে ব্যাট চালাল লোকন। নিশানা ঠিক ছিল। বল ব্যাটের কানায় লেগেছিল ঠিকই। তবু কবজির জোরে বলটা লোকন পাঠিয়ে দিল কর্পূর গাছের দিকের বাউন্ডারি সীমানার বাইরে। চার রান!

   হেডস্যার এগিয়ে গিয়ে মুকুলস্যারের হাত থেকে ব্যাটটা প্রায় কেড়ে নিলেন। বললেন, ‘একজন বৃদ্ধ মনুষের অনেক তোম্বা দেখলাম। আর নয়। প্রথম বলটা করতে গিয়ে তো প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন! আর আপনাকে খেলতে দেব না! সামনে আমাদের স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল আছে।’

   খানিকটা লজ্জিত মুখে মুকুলস্যার বললেন, ‘এক সময় ইডেনে অনূর্ধ সতেরো দলে প্রাকটিস করতাম। সে আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের গল্প!’ লোকনের কাছে গেয়ে ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘লোকন, তোমাকে কিন্তু আউট করতে পারলাম না! আর একদিন চেষ্টা করা যাবে! কী বলো লোকন?’

   লোকন কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘আপনার লাস্ট বলটা বেশ কঠিন ছিল। তবু চেষ্টা করেছি বাউন্ডারি লাইনে পাঠাতে। কিন্তু ছয় মারতে তো পারিনি! ’

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘লাস্ট বলটায় ছয়টাই ছিল আমার প্রত্যাশা। তবু বাউন্ডারি তো হল। তবে আমি খুশি নই। জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মাত্র উনিশ বলে পঞ্চাশ রানের ইনিংস খেলার সময় যখন বৈভব এক হাঁটু মাটিতে গেড়ে অবিশ্বাস্য ছক্কাটি হাঁকিয়েছিলেন, অমন চাই আমি তোমার কাছ থেকে! তাই খেলার বাঁধন আলগা রাখলে হবে না লোকন!’

   লোকন ঘাড় নাড়ল বিনয়ের সঙ্গে। হেডস্যার বললেন, ‘দেবোপম, তোমরা আরও কয়েকটা ওভার খেলে আজ ছুটি করে দাও। ক্লাস এইটকে বলে দাও, কালও আমাদের মাঠেই ক্রিকেট কোচিং হবে। শেষ দুটো পিরিয়ড ছুটি!’

   এবার মুকুলবাবুকে বললেন হেডস্যার, ‘আপনি সর্বগুণান্বিত একজন মানুষ। আপনাকে যতই দেখছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি।’

   মুকুলবাবু হেসে বললেন, ‘তবে আমার দ্বারা নাটক-নভেল লেখা সম্ভব হবে না! সে হয়তো আপনি চেষ্টা করলে পারবেন! আমি বরং আমি আপনার জন্যে এক দিস্তে সাদা কাগজ কিনে দেব। কোনও সময় অবকাশ পেলে একটা নভেল লিখবেন! এই ক্রিকেট নিয়েই লিখবেন না হয়!’

   মাঠে তখনও সেভাবে বিকেল নামেনি। দুই ক্রিকেট-পাগল হেঁটে-হেঁটে হেডস্যারের রুমের দিকে চললেন। ঘণ্টিদাদু দার্জিলিং চা বানিয়ে রেডি! দু’জনে দুটো চেয়ারে বসলেন। চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে মুকুলস্যার বললেন, ‘আমি আপনাকে ক্রিকেটের নানা সত্যি গল্প বলব, আর আপনি সে সব গল্প নিয়ে একটা জয়ের গল্প লিখে ফেলুন! একটা ঘটনা ক্রিকেটে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা হয়ে আছে। আপনাকে বলি--ক্রিকেট দারুন এক অনিশ্চয়তার খেলা, তা আপনিও মানেন৷ কিন্তু এত অনিশ্চয়তার ভিতরে মাঝে-মাঝে এমন কিছু কাকতালীয় ঘটনা ঘটে যায় যার হিসেব মেলানো সত্যিই ভীষণ মুশকিল৷’

   হেডস্যার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘বলুন একটা চমৎকার গল্প!’

   মুকুলবাবু শুরু করলেন, ‘ভারতের তিন ব্যাটিং লিজেন্ড সন তেন্ডুলকর, বীরেন্দর শেহবাগ এবং রোহিত শর্মা, তিনজনেরই একদিনের ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি করবার রেকর্ড আছে৷ দু’ হাজার দশ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক ওয়ানডে ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরি করে সচিন তেন্ডুলকর নিজের নামের পাশে একদিনের ম্যাচে সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড তৈরি করেন ৷ সচিনের এই বিশ্বরেকর্ড বীরেন্দ্র শেহবাগ তার পরের বছরই ভেঙে দিলেন ৷ সচিনের ডাবল সেঞ্চুরির রানের রেকর্ড ভেঙে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দু’শো উনিশ রানের ইনিংস খেলে শেহবাগ নতুন বিশ্বরেকর্ডের মালিক হয়ে গেলেন! কী মজা দেখুন, তার তিন বছর পর, দু’ হাজার চোদ্দো সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে এক ওয়ানডে ম্যাচে দু’শো চৌষট্টি রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলে ফেলেন সচিন-শেহবাগের সতীর্থ ব্যাটিং জিনিয়াস রোহিত শর্মা৷’

   নবনীতস্যার চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন, ‘এ তো এক রূপকথার গল্প মুকুলবাবু! দেখি, আমাদের স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচটার ফাইনাল হয়ে গেলে একদিন বসে পড়তে পারি কিনা!’

   কিছুক্ষণ আগেই ক্রিকেট কোচিং থেমে গেছে। ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরে গেছে। মুকুলকৃষ্ণবাবু দেবোপমস্যারের মুখে শুনলেন, শেষ ওভারটা না খেলেই দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে লোকন বাড়ি ফিরে গেছে! 

   তখন একফালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে আকাশের গায়ে। হেডস্যারের রুম থেকে বেরিয়ে দু’জনে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়ালেন। মুকুলবাবু বললেন, ‘জানেন তো, নবনীতস্যার, এরকম একটা চাঁদকে আমি দেখতে পেতাম আমার ভবানীপুরের মেস বাড়ির পুবের জানলা থেকে। চাঁদটা বড় মায়াময়!’

   (এর পর ৪১ পর্ব)


শুভ বিজয়া       

রবীন্দ্রনাথ সরকার


এইতো সবে এলি মাগো , আজই যাবি চ'লে,

আর কটা দিন যায়না থাকা শিবকে একটু ব'লে?

 শ্বশুরবাড়ি কেমন থাকিস কখন কিযে খাস

 স্বামী যে তোর শ্মশান মশান ঘোরে বারোমাস।

 রাজার মেয়ে হয়ে ও তুই বাছলি পাগল বর,

 ভোলানাথের সঙ্গে যে তুই বাঁধলি সুখের ঘর।

 নিজের খেয়াল রাখিস মা তুই শ্বশুরবাড়ি গিয়ে

 ঠিক সময়ে আসিস আবার ছেলে মে কে নিয

 যাবার আগে একটি কথা বলি মাগো তোরে

 সুখ শান্তি ভালবাসায় উঠুক ভুবন ভোরে।।


Arkobrata Dey, class 6, Sodepur High School.

ক্যুইজ ২৬ 

১. কুচিপুরি কোন অঞ্চলের নৃত্য? 
2. শ্বেতপাথরের তৈরী পৃথিবীর বিখ্যাত ভাস্কর্য "ডেভিড" কে তৈরী করেন ? 
৩. পৃথিবীর কোন দেশ ১৪ টি দেশের সীমানা স্পর্শ করে আছে? 
৪. মিজোরাম এর রাজধানীর নাম কি? 
৫. ISRO  ভারতে কে এবং কবে প্রতিষ্ঠিত করেন? 


গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 

১. ইনকা রা 
2. গ্রীসের এথেন্সে 
৩. কটক 
৪. গুজরাটের কচ্ছ 
৫. টেরাকোটা

Post a Comment

0 Comments