জ্বলদর্চি

সংক্ষিপ্ত মহাভারত- ৮/সুদর্শন নন্দী

সংক্ষিপ্ত মহাভারত
পর্ব ৮
সুদর্শন নন্দী

যুদ্ধ হয়ে উঠল অবশ্যম্ভাবী। কুরুক্ষেত্র নামে এক পুণ্যক্ষেত্রে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়। পাণ্ডব ও কৌরবদের উদ্যোগে সমস্ত আর্যাবর্তের রাজ্যসমূহ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কৃষ্ণ তথা দ্বারকার সাহায্য প্রার্থনায় অর্জুন ও দুর্যোধন উভয়েই একই সময়ে দ্বারকায় যান। কিন্তু কৃষ্ণের ভাই বলরাম যুদ্ধে অংশ না নিয়ে তীর্থযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। আর কৃষ্ণ উভয় দলের আবেদন রক্ষাহেতু অস্ত্রধারণ না করার প্রতিজ্ঞা করে পাণ্ডবদের পরামর্শদাতা রূপে নিজে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেন এবং কৌরবপক্ষে দ্বারকার দুর্জয় নারায়ণী সেনা দান করেন। ঘটনাটি এরকম। অর্জুন ও দুর্যোধন কৃষ্ণের ঘরে এলে কৃষ্ণ তখন দুপুরের সময় ঘুমের ভান করছেন। দুর্যোধন এসে ঘরে ঢুকলেন এবং দেখলেন কৃষ্ণ ঘুমোচ্ছেন। তাঁর পা প্রবেশপথের দিকে করা ছিল। দুর্যোধন দেখলেন তা এবং  ভাবলেন, আমি এক মহান সম্রাট! আমি  তাঁর পায়ের কাছে কেন বসবো?” এই ভেবে তিনি  কৃষ্ণের মাথার কাছে এসে বসলেন। ওদিকে অর্জুন এলেন - তিনি কৃষ্ণের ভক্ত।  তিনি কৃষ্ণের পা যেদিকে করা ছিল, সেখানেই বসলেন। কৃষ্ণ খানিক পরে চোখ খুলে দুজনকেই দেখলেন । জিজ্ঞাসা করলেন আসার কারণ। কৃষ্ণ কিন্তু সবকিছুই জানেন।
তখন দুজনেই বললেন যে তাঁরা যুদ্ধে তাঁর সাহায্য চাইতে এসেছেন। কৃষ্ণ বললেন, “তোমরা দুজনেই এসেছ এবং তোমরা দুজনেই একই জিনিস চাইছ। আমার বক্তব্য এটা – তোমাদের মধ্যে একজন আমার সৈন্যদল কে নিতে পারো, অন্যজন আমাকে নিতে পারো। তবে আমি লড়াই করব না, আমি কেবল সঙ্গে থাকব। যেহেতু আমার দৃষ্টি প্রথমে অর্জুনের উপরে পড়েছিল, সেই প্রথমে চাইবে!” দুর্যোধন বলে উঠলেন, “আমি এখানে প্রথম এসেছি!” কৃষ্ণ বললেন, “তাতে আমি কী করতে পারি? আমি অর্জুনকে প্রথমে দেখেছি।”
  তখন কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, "তুমি যেটা চাও, বেছে নাও।" অর্জুন বললেন, "ভগবান, আমরা আপনাকে চাই, আপনার সেনাবাহিনীকে নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমরা শুধু আপনাকে আমাদের সাথে পেতে চাই।” কৃষ্ণ সতর্ক করলেন, “আমি কিন্তু তোমাদের পক্ষে লড়াই করব না। আমি কেবল তোমাদের সঙ্গে থাকব।” অর্জুন বললেন, “আপনাকে কিছু করতে হবে না, আমরা কেবল আপনাকে আমাদের সাথে চাই”। এটা দেখে দুর্যোধন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাঁচলেন এবং খুব খুশি হলেন! দুর্যোধন নিলেন বিশাল সৈন্যবাহিনী। 
   এদিকে কৃষ্ণ যুদ্ধ না করলেও যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথির ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি পাণ্ডবদের শান্তিদূত রূপে কৌরবদের কাছে পাণ্ডবদের জন্য পাঁচটি গ্রাম ভিক্ষা করেন। কিন্তু দুর্যোধন ঐ প্রস্তাব অস্বীকার করে বললেন, “বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী”। 
   অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু যুদ্ধের প্রাক্কালে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের সাথেই সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হবে দেখে মহাবীর অর্জুন জাগতিক মোহের বশে পড়ে যুদ্ধ হতে বিরত হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্ত্রত্যাগ করেন। এমতাবস্থায় পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয়সখা অর্জুনকে পুনরুজ্জীবিত করবার জন্য কিছু মহান উপদেশ প্রদান করেন ও অর্জুন পুনরায় অস্ত্রধারণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই উপদেশগুলিই হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ ‘ভগবদ্গীতা’ হিসেবে গণ্য হয়। শ্রীকৃষ্ণ জানান, মহাযুদ্ধে অধর্মের বিনাশহেতু ভগবান নিজেই রয়েছেন, অর্জুন তার উপলক্ষ মাত্র। এরপর তিনি অর্জুনকে তাঁর দিব্য ‘বিশ্বরূপ’ প্রদর্শন করান।
প্রথমে যুদ্ধ পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষে যথাক্রমে
 ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ভীষ্মকে সেনাপতি পদে বরণ করা হয়। উভয়পক্ষই অস্বিকার করার উপায় নেই যে যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য উভয়পক্ষই নীতিভঙ্গ করতে থাকে। সাহায্য নেয় ছল চাতুরীরও, যদিও এটি ধর্মযুদ্ধ নামে পরিচিত। 
   কথিত আছে খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৮ অব্দে (আজও ভারতে কলিযুগাব্দ বলে আকটি কাল গণনা প্রচলিত আছে। কারো করো মতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরেই ঐ কাল গণনা আরম্ভ হয় অথবা কৃষ্ণের মৃত্যুর পর থেকে) বর্তমান ভারতের হরিয়ানায় এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১৮ দিন।
   প্রথম দিনে, এই দিনের যুদ্ধে পাণ্ডব পক্ষে ভীম ও কৌরব পক্ষে ভীষ্ম বীরত্ব প্রদর্শন করে পরস্পরের বহু সৈন্য হত্যা করেন। এই দিনের যুদ্ধে অর্জুন পুত্র অভিমন্যু অমিত বিক্রম প্রদর্শন করেন। ইনি একই সাথে ভীষ্ম, কৃতবর্মা, কৃপাচার্য ও শল্যের সাথে যুদ্ধ করেন। মদ্ররাজ শল্যের আক্রমণে বিরাটরাজের পুত্র উত্তর পরাজিত ও নিহত হন। এই মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বিরাটের অপর পুত্র শ্বেত ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রবলভাবে যুদ্ধ শুরু করেন। অশেষ বীরত্ব প্রদর্শনের পর ভীষ্ম কর্তৃক ইনি নিহত হন।
দ্বিতীয় দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। এই দিনের যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ভীষ্ম-অর্জুনের যুদ্ধ। প্রবল যুদ্ধের পরও কেউ জয়ী হতে সক্ষম হলেন না। এদিন ভীম কলিঙ্গরাজ শ্রুতায়ু, তাঁর পুত্র শত্রুদেব ও কেতুমান, ভানুমান, সত্য, সত্যদেব ও বিপুল সংখ্যক কলিঙ্গ সৈন্য হত্যা করেন। এরপরে ভীষ্ম ও ভীমের যুদ্ধ হয়। এ ছাড়া এদিনে অভিমন্যু, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও অর্জুন অশেষ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। এই দিন কৌরব পক্ষে ভীষ্ম ছাড়া আর কেউ তেমন বীরত্ব প্রদর্শন করতে পারেন নি।
   তৃতীয় দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। এদিন ভীমের সাথে যুদ্ধে দুর্যোধন পরাজিত হয়ে পলায়ন করেন। এছাড়া অর্জুন ও ভীষ্মের অশেষ বীরত্ব লক্ষ্যণীয়। এদিন ভীষ্মের প্রচন্ড সংহারমূর্তি দেখে তার প্রতি ক্রোধবশত কৃষ্ণ সুদর্শন চক্র উত্তোলন করেও পরে ভীষ্মের তোষণ ও অর্জুনের অনুরোধে তা প্রত্যাখ্যান করে নেন।
চতুর্থ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। এই দিনে ধৃষ্টদ্যুম্ন শল্যপুত্র সাংযমনিধিকে হত্যা করেন। ভীমের অসীম বীরত্ব প্রদর্শনের কারণে কৌরব সৈন্যের একাংশ পলায়ন করে। পরে ভীষ্ম ভীমের গতিকে রোধ করতে সক্ষম হন। এরপর ভীমের সাথে দুর্যোধনের যুদ্ধ হয়। দুর্যোধনের শরাঘাতে ভীম সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। পরে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে ভীম পুনরায় আক্রমণ করলে শল্য আহত হয়ে রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করেন। এরপর ধৃতরাষ্ট্রের ১৪ জন পুত্র একসাথে আক্রমণ করলে- ভীম জলসন্ধ, সুষেণ, উগ্র, অশ্ব, কেতু, বীরবাহু, ভীম ও ভীমরথকে হত্যা করেন। ধৃতরাষ্ট্রের অন্যান্য পুত্ররা পরে পালিয়ে যায়।
   পঞ্চম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। এদিনে যুদ্ধে উভয় পক্ষে বহু সৈন্য নিহত হলে- বড় কোন বীরের পতন হয়নি।
ষষ্ঠ দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। নকুলের পুত্র শতানীক ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুষ্কর্ণকে হত্যা করেন।
   সপ্তম দিন কৌরব পক্ষে সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম। পাণ্ডব পক্ষে ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। দ্রোণ কর্তৃক বিরাট পুত্র শঙ্খ নিহত হন। এ দিনে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বড় বড় কিছু যোদ্ধা প্রাণে রক্ষা পেলেও পরাজিত হন। এঁরা হলেন-ভীমের পুত্র ঘটোত্কচ : ভগদত্তের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন। শল্য : নকুল সহদেবের কাছে পরাজিত। শ্রুতায়ু : যুধিষ্ঠিরের কাছে পরাজিত।

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন


Post a Comment

0 Comments