অক্ষয়কুমার দত্ত /রাজর্ষি রায়



রা জ র্ষি  রা য় 


অক্ষয়কুমার দত্ত : তাঁর অভিমত ছিল, প্রার্থনা = শূন্য 

বাংলার নবজাগরণে যে ক'জন মানুষ উপেক্ষিত থেকেও মানুষের যুক্তি ও বুদ্ধিকে শানিত করবার চেষ্টা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। তিনি বিদ্যাসাগরের সঙ্গে একই বছর ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন এবং রামকৃষ্ণদেবের সাথে ১৮৮৬ তে গত হন। তিনি জন্মেছিলেন বর্ধমানের অন্তর্গত চুপী গ্রামে,১৫ই জুলাই ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন আদিগঙ্গার নিকটবর্তী কুদঘাটার ক্যাশিয়ার ও 'দারগা' পীতাম্বর দত্ত ও তাঁর স্ত্রী দয়াবতীর একমাত্র সন্তান। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় চুপী গ্রামে,সংস্কৃত ও ফার্সী শিক্ষা দিয়ে।প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি দশ বছর বয়সে কলকাতায় চলে আসেন ইংরেজি শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি তাঁর ইংরেজি শিক্ষক 'জয় মাস্টারে'র শিক্ষায় খুশি না হয়ে নিজেই এক ইংরেজ পাদ্রীর কাছে ইংরেজি চর্চা শুরু করেন। এই সময় তাঁর খৃষ্ট ধর্মের প্রতি অনুরাগও দেখা যায়। তখন তাঁর অভিভাবক হরমোহনবাবু নিজের কাছেই ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। অবশেষে তাঁকে ১৮৩৭ সালে 'ওরিয়েন্টাল সেমিনারি'তে ভর্তি করা হয়। এখানে তিনি তিন বছর পড়াশোনা করেন। সেই সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ হলে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে   মায়ের আদেশে পড়া ছেড়ে অর্থ উপার্জনে মনোযোগী হন। তিন বছর এই শিক্ষা কালে নিজের স্কুলের পড়ার বাইরেও সকাল-সন্ধ্যায় গ্রিক, লাতিন, হিব্রু ও জার্মান ভাষা শিখেছিলেন সেই স্কুলেরই শিক্ষক হাডম্যান জিফ্রয়ের কাছে। এই সময় থেকেই তিনি প্রচলিত হিন্দু ধর্মের প্রতি বীতরাগ হন। প্রায় কারো সাহায্য ছাড়াই তিনি  পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, জ্যামিতি, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি ,মনোবিজ্ঞান এবং ইংরেজি সাহিত্যের ভালো ভালো গ্রন্থ পাঠ করেন। চিরকালই পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ অনুরাগ এবং প্রবল মানসিক ক্ষুধা।

১৯৩৯ সালে স্কুল ছাড়ার কিছুদিনের মধ্যেই ঈশ্বরগুপ্তের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটে। তাঁর মাধ্যমেই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি তত্ত্ববোধিনী সভার সদস্য হন। সেখানেই তাঁর শিক্ষকতা শুরু এবং পরে দ্বারকানাথের ছোট ছেলে নগেন্দ্রনাথের গৃহশিক্ষক রূপে নিযুক্ত হন।১৮৪৩ সাল থেকে তিনি ১২ বছর 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকার সম্পাদক রূপে কাজ করেন। এই পত্রিকা সম্পাদনা কালে ধারাবাহিকভাবে ও পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় 'বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার'(প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড) ১৮৫১ ও ১৮৫৩ সালে। তাঁর রচিত ধর্মনীতি, পদার্থবিদ্যা, চারুপাঠ(১৮৫৪)- প্রভৃতি গ্রন্থ এই সময়ে প্রকাশিত হয়।এই 'চারুপাঠ' তিন খণ্ডে অন্তত তিন পুরুষ ধরে প্রতিটি বাংলা স্কুলের ছেলেমেয়েদের পড়তে হয়েছে একসময়।
একথা ভাবা যায় না যে, উনিশ শতকে একজন মানুষ শুধু বাংলায়  বিজ্ঞান আর সমাজনীতির বই লিখে সচ্ছন্দে মাথা উঁচু করে জীবন ধারণ করেছিলেন। তাঁর প্ল্যান ছিল ওই বইয়ের টাকায় তিনি বালির বাগানবাড়িতে এক বিজ্ঞান চর্চার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। তাঁর সেই বাড়ি একসময় বোটানিক্যাল গার্ডেনে পরিণত হয়েছিল। তিনি বাড়ির দেয়ালে পাঁচজন মহাত্মার ছবি টাঙ্গিয়ে রাখতেন--রামমোহন, নিউটন, ডারউইন, হাক্সলি এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের। যেন তাঁরা এই আধুনিক শিষ্যের কাজ তদারকি করতেন দেয়ালে থেকে।

তাঁর বিজ্ঞান তাঁকে বুঝিয়ে ছিল যে ধর্ম মাত্রেই সর্বনাশা। ধর্মের জন্য মানুষকে ভয়ানক মূল্য দিতে হয়েছে। তিনি বলতেন -
প্রকৃতি চলে প্রকৃতির নিয়মে তার জন্য ঈশ্বরকে ধরে টানাটানি করা মূর্খামি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার মূল্য নিয়ে কয়েকজন ছাত্রের উত্তরে তিনি লিখেছিলেন-
কৃষকের শ্রম= শস্য
কৃষকের শ্রম+ প্রার্থনা=শস্য
অতএব প্রার্থনা = ০
কলকাতার তৎকালীন পণ্ডিতসমাজ তখন কেঁপে উঠেছিল এই ইকুয়েশন শুনে ।
১৮৫২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'আত্মীয় সভা'। সেই সভায় যেমন ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তেমনি ছিলেন রাখালদাস হালদার ,অনঙ্গমোহন মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিগণ। সেই সভার একমাত্র কাজ ছিল যুক্তির সাহায্যে বুদ্ধির বিচার। পরে দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ব্রাহ্মধর্ম নিয়ে মতবিরোধ হয়। তিনি তাঁর উমুক্ত চিন্তা-চেতনা নিয়ে সেই সভা পরিত্যাগ করেন।
তাঁর মতে ভারতবর্ষ= আধ্যাত্মিকতা--এই চালু ইকুয়েশনটা ভুল। আসলে আস্তিক-নাস্তিক নানা মতের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল আমাদের বহুমাত্রিক সভ্যতা। পরে ম্যাক্সমুলার মনিয়র-উইলিয়মসের মতো পণ্ডিতরা বাংলায় লেখা তাঁর গবেষণার মৌলিকতায় চমৎকৃত হন। রতনে রতন চেনে।
অক্ষয়কুমার রামমোহনের ভাবশিষ্য হলেও শাস্ত্রের ব্যাখ্যায় তিনি রামমোহনকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন। জ্ঞানের সাহায্যে মহাবিশ্বের বস্তুজগত, জীবজগত ও মানবজগত সম্বন্ধে সমস্ত তত্ত্বই জ্ঞেয় এবং পঠনীয় --এই ছিল তাঁর অভিমত। বস্তুতপক্ষে মানুষের প্রজ্ঞা বা বুদ্ধির যে ধর্ম সেই ধর্ম ছিল তাঁর উপজীব্য ধর্ম। আমৃত্যু তাঁর কাছে এর কোনো বিকল্প ছিল না।ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শাস্ত্রনিরপেক্ষ এবং যুক্তিপ্রথাবলম্বী ব্রাহ্ম।
তাঁর মৃত্যুদিনে তাঁর মতো যুক্তিবাদী মানুষ হয়ে ওঠাই হবে আধুনিক মানবমনের একমাত্র লক্ষ্য।

১৮৮৬ সালের ১৮ মে তাঁর প্রয়াণ ঘটে।
----------

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি