ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -৪৫



সম্পাদকীয়, 
তোমরা কে কে ক্ষীরের পুতুল, বুড়ো আংলা পড়েছো জানিও। আচ্ছা বুঝেছি পড়োনি ইউ টিউবে শুনেছো। আসলে রূপকথার গল্প যতনা পড়তে তার থেকেও বেশি ভাল লাগে শুনতে। আর বাড়িতে গল্প শোনানোর জন্য যদি না কেউ থাকে তবে তো মোবাইল আছে। তাইনা? কিন্তু আমাদের সময় গল্প শোনাতেন আমাদের ঠাম্মা দিম্মা আর পিসি মাসিরা। এমন একজন গল্প বলা মানুষ ছিলেন অবন ঠাকুর। তিনি এত অসাধারণ গল্প বলতে পারতেন যে তাকে সকলে কথক ঠাকুর বলতেন। শুধু গল্পই বলাই নয় তিনি কাহিনী লিখতেন ও ছবি আঁকতেন।  ৭ই আগস্ট ছিল তাঁর দেড়শততম জন্মদিন। পীযূষ প্রতিহার আঙ্কেল আমাদের সকলের হয়ে তাঁকে স্মরণ করেছেন। কিন্তু এখন রূপকথার গল্প পালটে গেছে।  আর সেটা আমাদের তরুণ গল্পকার অনন্বয় তার গল্প লিখে জানিয়ে দিয়েছে। তবু বলব প্রগতি মাইতির জেঠুর গল্পের টুয়ার মতো এখনও ছোটোরা পশুপাখিদের দেখলেই বন্ধু করতে চায়। সোমা আন্টির টাপুর টুপুরের মতো পাড়াতেও অনেকের খেলার সঙ্গীরা থাকে। কিন্তু এই লকডাউনের গেরোয় বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা বন্ধ, বেড়াতে যাওয়াও বন্ধ। অয়ন আঙ্কেলের ছড়ায় চলো আমরা উত্তরবঙ্গ বেড়িয়ে আসি । তাছাড়া সুদীপ পাত্র আঙ্কেলের ছবির মধ্যে দিয়ে আমরা পুরুলিয়ায় আযোধ্যা পাহাড়েও ঘুরে আসতে পারি। দেখো মন খারাপ ভাল হয়ে যাবে। তবু যদি বানীয়া দিদির রথের কবিতা পড়ে আবার মন খারাপ করে কিংবা শতভিষার বৃষ্টির ছড়া পড়ে মন খারাপ বেড়ে যায়, তবে কাঁদনের স্রষ্টা শতদ্রু মজুমদারের মজার গল্পটি পড়ে নিও। শেষে বলি আজ বাইশে শ্রাবণ, শ্রেয়ানের আঁকা দিয়ে আমরা রবি ঠাকুরকে স্মরণ করলাম। প্রণাম রবি কবি, প্রণাম অবন ঠাকুর।  -- মৌসুমী ঘোষ।



টুয়ার কাকপ্রেম
প্রগতি মাইতি

কাকলি খেয়াল করেনি তার মেয়ে টুয়া ক 'দিন ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট করছে না। খেয়াল করেছে টুয়ার ঠাম্মি। কিন্তু ঠাম্মি আর ব্যাপারটা তার বৌমাকে বলেনি। কাকলি টুয়াকে একটা মিস্টি দেবে বলে ডাইনিং স্পেসে এসে দেখে টুয়া ওখানে নেই। টুয়ার ঘর ভেতর থেকে লক করা। কাকলির ডাকাডাকিতে ঠাম্মি বেরিয়ে এসে বউমাকে চুপ করতে বলে নিজের ঘরে আসতে বললো। কাকলি শাশুড়ির ঘরে ঢুকল। ঠাম্মির ঘরের জানলা দিয়ে টুয়ার পড়ার ঘর দেখা যায়। কাকলি দেখতে পেল, টুয়া পাউরুটির টুকরো হাতে নিয়ে জানলার কার্ণিশে বসা একটা কাককে খাওয়াচ্ছে। কাকটা টুয়ার হাত থেকে নির্ভয়ে পাউরুটি খাচ্ছে। কাকলি তার শাশুড়িকে বললো, মা, এটা ক'দ্দিন ধরে চলছে ? ঠাম্মি বললো, তা প্রায় দিন দশ বারো। আমি তো রোজ দেখি, দিদিভাই কিভাবে যত্ন করে ওকে খাওয়ায়। আর জানো তো, কাকটা ঠিক এইসময় ওর জানলার পাশে আসবেই আসবে। কাকলি রেগে গিয়ে বললো, নিজে না খেয়ে কাককে খাওয়ানো হচ্ছে? কাক কত নোংরা জিনিস খায়। আর ও কিনা ঐ হাতে...। বলেই কাকলি জানলার গ্রিলের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বললো, টুয়া? আদিখ্যেতা হচ্ছে ? ছিঃ ছিঃ ছিঃ। তোর হচ্ছে দাঁড়া। টুয়া হকচকিয়ে গেল আর তার হাত থেকে পাউরুটির প্লেটটা মেঝেতে পড়ে গেল। স্টিলের প্লেটটা বনবন করে ঘুরছে। ঘুরছে টুয়ার মাথাও।



ইচ্ছে ভ্রমণ 
অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

সমস্তদিন টিপির টিপির
বৃষ্টি ইলশেগুঁড়ি
ছাতামাথায় চল্‌না পালাই
কালকে শিলিগুড়ি

ওখান থেকেই গরুমারা,
মূর্তি নদীর ধার
ফাঁসিদেওয়া, খুঁটিমারি,
আলিপুরদুয়ার—

ইচ্ছে হলে আসাম আরও,
কাজিরাঙাও যাব...
গণ্ডারভাই, পিঠে চড়ে
সেলফি তুলেই তাবড়—

এফ-বি আছে, দিলেই হবে
মুহুর্মুহু লাইক—
নিজের ঢাক তো নিজেই পেটাই
লাগছে না চোঙ, মাইক...

যেখান খুশি সেখান যাব
নেই কোনও সংঘাত—
মেঘ সরিয়ে ডাক দিয়েছে
কাঞ্চনজঙ্ঘা!



লকডাউনে মজা 
সোমা কাজী

টাপুর আর টুপুর দুই বোন। একবছরের মাত্র বড় টাপুর। ঐ যে দোতলা গোলাপি সাদা ইঁটের নকশার দেওয়াল ওয়ালা বাড়িটা, তার একতলায় থাকে টাপুর, ওর তিন বছরের ভাই গুড়ুম আর ওদের বাবা-মা।  
দোতলায় থাকে টাপুরের কাকাই, কাম্মী আর টুপুর। টুপুরের বাবা টাপুরের বাবাকে দাদা ব'লে ডাকে। অর্থাৎ টাপুর টুপুর দুই খুড়তুতো বোন।
দু বোনে যত ভাব তত আড়ি। এই তো সেদিন টুপুরকে ভাগ না দিয়ে একটা চকলেট গোটাই খেয়ে ফেলেছে টাপুর ভুল করে। জানতে পেরে টুপুরের কি রাগ! সেদিন সে আর দোতলা ছেড়ে নিচে এলেই না সারাদিন! শেষে টাপুর একবাটি গুড় আম নিয়ে টুপুরের মান ভাঙাল। দুবোন মিলে টাকরায় টকাসটকাস আওয়াজ তুলে আচার খেতে খেতে বুড়ো আঙুল ঠেকাঠেকি করে কখন যে ভাব হয়ে গেল... বুঝতেই পারলো না! 
           তারপর একদিন হয়েছে কি, দু'বোন মিলে ছাদে এক্কা দোক্কা খেলার ঘর কেটেছে, ওমা! কি খেলা এটা, তা জানোনা বুঝি?  তা তোমাদের মা'দের জিগ্যেস করে নিও বাপু! খেলা খুব জমে উঠেছে যখন, তখন হঠাৎ টাপুরের চোখ গেল উল্টো দিকের ছাদে। টুপুরকেও একটা হাল্কা খোঁচা মারল। বিট্টু তাদের ছাদে কিসব করছে গাছপালা নিয়ে। বিট্টু আর টাপুর একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। ক্লাস ফাইভে।লকডাউন না থাকলে টাপুর টুপুর, বিট্টু আর তাদের পাড়ার আরো অনেকে মিলে ক্রিকেট থেকে ঘুড়ি ওড়ানো, লাট্টু ঘোরানো, লুকোচুরি... কতরকম যে খেলে! যা বলছিলাম, টুপুর চেঁচিয়ে বললো - কি করছিস রে বিট্টু? 
- বাগান করছি। বাবা বলেছে, গাছ আমাদের অনেক উপকার করে। বিট্টু বলল।
টুপুর- জানি তো! ফুল দেয়, ফল দেয়।
টাপুর- আর বাতাস মানে অক্সিজেনও দেয়।
বিট্টু - জানিস কি, গাছেরা রোদ ধরতে পারে? 
টপুর- হিহিহি! চোর ধরার মতো? 
বিট্টু - অত হাসির কিছু নেই। মা বলেছে গাছের সবুজ পাতারা হল তাদের হাঁড়িকুড়ি। আর সূর্যের রোদ হলো আগুন। আর জল, বাতাস এসব মিশিয়ে গাছেরা নিজেরাই রান্না করে। 
টাপুর- ঠিক বলেছিস বিট্টু। আমিও শুনেছি। মা বলছিল উঁচু ক্লাসে উঠে এ নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারব। 
টুপুর- তাহলে আমরাও বাগান করি? কি মজা হবে!
বিট্টু - আগে মাটি তৈরি করতে হবে। সাধারণ মাটি, বালি, জৈব সার এসব মিশিয়ে মাটিকে রোদ খাওয়াতে হবে দিনকয়েক। কাকুকে বলবি, সব যোগাড় করে দেবেন।
পরের রোববার বিট্টু উঠছে ছাদে,  টাপুরটুপুর দুই বোনেও তাদের ছাদে। সঙ্গে ওদের সবার  বাবা-মা। সবাই যেন বিট্টুদের মতো ছোট্ট হয়ে গেছে! 
জবা,রঙন, নানা রঙের পোর্তুলিকা, বারোমেসে গোলাপ, রজনীগন্ধা এসবের গাছ লাগানো হলো দুই ছাদে। 
টাপুর টুপুর আর বিট্টু রোজ সকাল - বিকেল গাছগুলো দেখতে আসে। ওদের দরকার মতো জল দেয়, শুকনো পাতা ফেলে দিয়ে টব পরিস্কার করে দেয়। 
তিন-চার মাসের মধ্যে গাছপালা সব বড়ো হয়ে উঠলো। জবা গাছগুলো বেশ ঝাড়ালো হয়েছে। তাতে কুঁড়ি এসেছে, বিট্টুদেরও।
একদিন টাপুরটুপুর ছাদে উঠে দেখে টুনটুনি পাখি  বাসা বেঁধেছে জবার ডালে। ওরা আনন্দে লাফাচ্ছিল হাততালি দিয়ে। তাই দেখে টুনটুনি ফুড়ুৎ করে উড়ে পালাল! দুজনে ঠিক করল আর চেঁচামেচি করবে না! 
মাস ছয়েক বাদে ওদের স্কুল খুলল। বন্ধুদের সঙ্গে  দেখা হবে বলে আনন্দ যেমন হল, মনও খারাপ হলো বিট্টু আর টাপুর টুপুরেের। কেন জানো? গাছেদের ছেড়ে যেতে হবে যে! 
তবে ওরা বন্ধুদের বলবে কেমন মজায় কাটিয়েছে  তারা লকডাউনে! ওদেরও বলবে গাছদের বন্ধু বানিয়ে নিতে। 
এই যাঃ, একটা কথা এক্কেবারে ভুলে গেছি বলতে! বিট্টুর মামাদাদু বলেছেন যার বাগান বেশি  সুন্দর হবে তাকে পুরস্কার দেবেন! 
মজার কথা হলো টাপুররা আর বিট্টু যৌথভাবে ফার্স্ট হয়েছে! 
লকডাউনে শুধু মনখারাপ নয়, চাইলে আনন্দও করা যায়। কি বলো তোমরা, আমার ছোট্ট বন্ধুরা?



আবদার
বানীয়া সাহা

যত্ত নিয়ম, মানামানি 
ভাঙি না আজ একটুখানি!

বাইরে এমন কাঁসর বাজে
মন বসে কী ঘরের মাঝে?

সবাই মিলে ধরাধরি,
টান জোড়ে টান রথের দড়ি।

মুচমুচে ওই তিলের খাজা
জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা!

ওই যে দেখো, ওই তো ওরা!
কাঠের পুতুল, মাটির ঘোড়া।

দারুণ মজা, হুটোপুটি 
থাকুক না আজ পড়ার ছুটি!

চলো না আজ বিকেল বেলায়,
ঘুরে আসি রথের মেলায়!


কাঁদন ও ভাইরাস 
শতদ্রু মজুমদার 

 কী  দিনকাল পড়ল। মুখে মাস্ক। মাথায় টুপি। কেবল চোখ দেখিয়ে দেদার ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষজন। কিন্তু   শুধু চোখ দেখে যে মানুষ চেনা দায় এখন দরকারি বা কি আছে? মানুষ চেনার হক কথা তবে কি এই পৃথিবীতে এমন অনেকেই আছে যাদের চোখে চোখে রাখতে হয় তাহলে এই অবস্থায় চোখে চোখে রাখবে কি করে ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলেছে  মনসা দারোগাকে। সত্যি বলতে কি আজ অব্দি তিনি যত ভেঙেছেন --- ভেবেছেন  ---- ---ঘেমেছেন ----  হাঁপিয়েছেন ----সবের মূলে ওই  কাঁদন পরামানিক।  কতবার যে ধরা পড়েছে গুনে শেষ করা যাবে না।

আজ চড়ক।
পুবপাড়ার চড়ক মেলা খুব বিখ্যাত। করোনার জন্য গেল বার হয় নি। পাবলিকের বিশেষ অনুরোধে মাত্র দু শ  জনের পারমিশান পাওয়া গেল। কিন্তু মাঠ ভরতি লোক দেখে মনে হচ্ছে দু হাজার। তার মানে চার হাজার চোখ খোলা মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এদের মধ্যে পুলিশ দারোগাও l 
---- স্যার চা খাবেন ?
মনসা দারোগা চুপ। ফের একই কথা বলল হাবিলদার !
--- আমি কি চা খেতে এখানে এসেছি ?
হাবিলদার আর কী বলবে !মনসা দারোগা ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন :তুই কি হারামজাদাটা কে দেখেছিস ?
--- কাঁদনকে ?
--- হ্যাঁ l 
--- বিলকুল দেখেছি --- কিন্তু কেবল চোখ দেখে যে চেনা খুব শক্ত কাজ স্যার ?
মনসা দারোগা মুন্ডু দোলালেন l মানে তা অবশ্য ঠিক।

মাঠের মাঝ মধ্যিখানে আকাশছোঁয়া চড়কগাছ।  সবাই এখন ওপর মুখো। এবার সন্ন্যাসী ঘুরপাক খাবে  বনবন  আর মুঠো মুঠো বাতাসা ছড়াবে। কিন্তু দারোগা বাবুর মন সেদিকে নেই। তার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে একজন কেউ। এরই মধ্যে দুটো লেডিস সাইকেল চুরি গেছে।  রানিবালা ইস্কুলের দুটো মেয়ে দারোগা বাবুর কাছে এসে কান্নাকাটি করে গেছে।  তিনি বলেছেন দেখছি।
অনেক উঁচু থেকে চিৎকার ভেসে এলো : বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগে মহাদেব।
পেটে বুকে দড়ি বাঁধা ঘুরতে শুরু করেছে একজন। অমনি বাতাসা বৃষ্টি l দারোগাবাবুর মাথায় দুটো বাতাসা পড়লো l তুলে নিয়ে একটা মুখে দিলেন।
বেমক্কা হাবিলদার চিৎকার করে ওঠে :স্যার স্যার ওই যে কাঁদন।
---কোথায় ?
---ওই যে ঘুরছে।
---আরে ও তো সন্ন্যাসী।
--হ্যাঁ স্যার --যে সন্ন্যাসী সে ই কাঁদন। ঘোরাটা থেমে গেলে ঠিক চেনা যাবে।
ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন দারোগাবাবু। চোখের সামনে সব টালমাটাল। শরীরের সব রক্ত মাথায় উঠে ঘুরপাক খাচ্ছে। মুখে কথা নেই l 
---স্যার, একটা বাতাসা খান।
--না।
--- কেন স্যার? ঠাকুরের প্রেসাদ তো !
--তাতে কী হলো? ওতে ভাইরাস থাকতে পারে না।
খুব ভয় পেয়ে গেল হাবিলদার।
--- কিন্তু স্যার আমি যে দুটো খেলাম।
দারোগাবাবু ভাবছেন অন্য l মুখে বললেন : কী আর করবি --একটু গরমজল খেয়ে নে।


শ্রাবণ-ধারা
শতভিষা মিশ্র
অষ্টম শ্রেণী, জ্ঞানদীপ বিদ্যাপীঠ, এগরা, পূর্ব মেদিনীপুর

আকাশ কালো,ঝরছে ধারা
বইছে বাতাস পাগলপারা।
রামধনু সাত রং মিলিয়ে
আঁকছে শ্রাবণ মেঘ সরিয়ে।
কেউ বা করে তারে বরন 
কারো বা হয় জীবন হরণ।
দুঃখ সুখের মাঝেই শ্রাবণ
বন্ধ্যা ভূমে আনে জীবন।
শুষ্ক তরু সবুজ সাজে
গান যে জাগায় মনের মাঝে।
মন মাতিয়ে ময়ূর নাচে
মেঘ বালিকা হাসছে লাজে।


পয়লা বৈশাখ
অনন্বয় গোস্বামী
নবম শ্রেণি, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ পাবলিক স্কুল, চুঁচুড়া, হুগলি

    ২১২১ সাল।
    রুপু অর্থাৎ রূপময় সেন মনমরা হয়ে বসে আছে তার ক্যাপসুলে। ক্যাপসুলের চারিদিক কাঁচ দিয়ে ঢাকা। ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে বাইরের কালো আকাশ আর তার মাঝে উজ্জল সব তারা। ক্যাপসুলের ভেতরটা খুব আরামদায়ক - গরমও নয় ঠান্ডাও নয়। তার বসার চেয়ারটা কখনো ইজিচেয়ারের মত কখনো বা বিছানার মত হয়ে যায়। এই পরিবর্তনগুলোর জন্য তাকে কোনো কষ্ট করতে হয়না। শুধু বোতাম টিপলেই হয়। কিন্তু ক্যাপসুলের আরাম বা তার বাইরের দৃশ্য কোনটাই রূপুর ভালো লাগলো না। কারণ তার সামনে তার পার্সোনাল মনিটরের স্ক্রিন সেভার হিসেবে যে ক্যালেন্ডার সেভ করা আছে, তাতে দেখাচ্ছে আগামীকাল পয়লা বৈশাখ।
    যতবার সে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাচ্ছে তার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বহুকাল আগে ফেলে আসা বাবা-মা-ঠাকুমার মুখ খালি তার মনে ভেসে উঠছে। এখানে তার কাছের মানুষ কেউ নেই। গত তিন বছর যাবত সে ইন্ডিয়ান স্পেস স্টেশনে কাজ করছে। তার গবেষণার বিষয় স্পেস এন্ড টাইম। এই গবেষণা করতে গিয়ে সে জানতে পারে, মানুষ ইচ্ছে করলেই সময়ের গাড়িতে চেপে বর্তমান থেকে অতীতে অথবা ভবিষ্যতে ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু এগুলো সবই পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্তরে আছে। কিছুই এখনো প্রমাণ হয়নি। আপাতত যেটুকু কাজ শেষ হয়েছে, তাতে সশরীরে সেখানে না যাওয়া গেলেও, অতীতের যেকোনো সময়ের স্পষ্ট ছবি ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে তুলে আনা যায়। তাই রুকু মাঝে মাঝেই অতীতে ফিরে যেতে চায়। যেমন আজ রুপুর ইচ্ছে করছে, অতীতে ফিরে গিয়ে মা বাবার হাত ধরে নতুন জামা পড়ে দোকানে দোকানে হালখাতা করে বেড়াবে আর ক্যালেন্ডার জমাবে। এমন সময় হঠাৎ টেলিকমিউনিকেটর বেজে উঠলো। খুব বিরক্ত হয়ে রূপু বলে, কি ব্যাপার? উল্টোদিক থেকে আরিয়ান চিন্তিত গলায় বলে, কী হলো কী তোর? সকাল থেকে কোন পাত্তাই নেই। আজকে তোর যে ডেইলি স্ট্যাটাস দেবার কথা সেটা তো এখনো জমাই পড়েনি। তুই কি সে কথা ভুলে গেছিস? রুপু নিরুৎসাহিত হয়ে বলে, আমাকে আজ ছেড়ে দে ভাই, আমার মন ভালো নেই। আরিয়ান বলে, মন ভালো নেই বললে চলবে? তোর ডেইলি রিপোর্ট তো আর অন্য কেউ জমা দিয়ে দিতে পারবে না।
    কিছু না বলে রুপু কথা কেটে দেয়। মনে মনে বলে, আজকে আরো একটু দূর অতীতের পরিবেশ থেকে ঘুরে এলে কেমন হয়। ভাবা মাত্র সে মনিটরে সেট করে ১০০ বছর আগের সময়। লোকেশন সেট করে ওয়েস্টবেঙ্গলের এক ছোট্ট শহর, যেখানে থেকে তার ঠাকুরদার বাবা পড়াশোনা করেছিলেন - বড় হয়েছিলেন। টাইম সেট করে 15 ই এপ্রিল সন্ধ্যে ছটায়। আশা করে থাকে রুপু রাস্তাঘাট গমগম করবে, দোকানপাট ফুলমালায় সেজে উঠবে, লোকজন ঘুরে বেড়াবে হাতে মিষ্টির প্যাকেট ও ক্যালেন্ডার নিয়ে।
    কিন্তু একি! মেশিনে কিছু গন্ডগোল হলো নাকি! এ কেমন শহরের ছবি ভেসে উঠছে মনিটরে! রাস্তাঘাটে ভিড় নেই, দোকানপাট সাজেনি! আর যে ক'টা মানুষ রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের মুখে ওগুলো কী বাঁধা! সঙ্গে সঙ্গেই রুপোর মনে পড়ে গেল ২০২১এর প্যানডেমিক-এর কথা। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আর বইতে পড়া তথ্যগুলো মনে পড়তেই, দ্রুত মেশিন থেকে সে লগ আউট করে নিল নিজেকে।     
   আর যেকোন সময় হোক দুই হাজার কুড়ি 21 সালে সে আর কখনোই ফিরতে চায় না।


 
স্ম র ণী য়
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কলমে - পীযূষ প্রতিহার


কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ৭ই আগষ্ট ১৮৭১, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। ঠাকুরবাড়ির রীতি অনুযায়ী গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। ঠাকুরবাড়িতে শিল্প চর্চা ছিল শিক্ষার অঙ্গ। বাবা গুনেন্দ্রনাথের শৌখিন রুচি ও বিলাস তাকে শিল্প বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। ইটালিয়ান গিলার্ডি ও ইংরেজ শিল্পী পার্মারের কাছে প্যাস্টেল, জল রং, তেল রং ও প্রতিকৃতি অঙ্কনের পাশ্চাত্য শিল্পরীতির শিক্ষা লাভ করেন।‍‍‍‍যদিও এই ধরণের চিত্রাঙ্কনে তাঁর তৃপ্তি ছিল না। 



১৮৯৮ সালে কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ হ্যাভেল সাহেবের উৎসাহে ঐ কলেজের উপাধ্যক্ষ হতে রাজি হন। ঐ সময় ভারতীয় শিল্পরীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক চিত্রাবলী অঙ্কণ করেন। এই ধরণের বিখ্যাত কিছু চিত্র হল বজ্রমুকুট, ঋতুসংহার, বুদ্ধ ও সুজাতা প্রভৃতি। টাইকান নামের জাপানি শিল্পীর কাছে জাপানি শিল্প রীতি শেখেন এবং তাকেও পরিবর্তে ভারতীয় শিল্প রীতি শেখান। এইসময় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় শিল্পের নবজন্মদাতা রূপে স্বীকৃতি লাভ করেন। ভগিনী নিবেদিতা,জন উডরফ, হ্যাভেল প্রভৃতি সুধী ব্যক্তিরা অবনীন্দ্রনাথের শিল্পাদর্শ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'ওরিয়েন্টার আর্ট সোসাইটি'(১৯০৭) স্থাপন করেন।১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে লণ্ডনে ও প্যারিসে তাঁর অনুগামীদের বিরাট বিরাট শিল্প প্রদর্শনী হয়। ১৯১৯ সালে ঐরকম আরো একটি শিল্প প্রদর্শনী হয় টোকিও শহরে।এরপরই‌ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খ্যাতি বিশ্বজোড়া হয়ে ওঠে। এইসময় তাঁর ওমর খৈয়াম চিত্রাবলী প্রশংসা লাভ করে।১৯২১ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আগ্রহে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগেশ্বরী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯৪২ এ বিশ্বভারতীর আচার্য হন তিনি। একরকম আঁকা তার আর ভালো লাগছিল না। তখন গাছের শিকড়, ভাঙ্গা ডাল, নারকেলের মালা, আমড়ার আঁটি, কাঠের টুকরো এসব নিয়ে অসাধারণ 'কাটুম-কুটুম' শিল্প নির্মাণ করেন।যা আজও বিষ্ময়। 
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ছোটদের জন্য লিখতে বললে তিনি তাঁর রবিকার কথামতো 'শকুন্তলা' লেখেন। লেখাটি রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা পেতেই তিনি ছোটদের জন্য একে একে 'ক্ষীরের পুতুল', 'রাজকাহিনী', 'ভূতপরীর দেশ', 'নালক', 'বুড়ো আংলা' প্রভৃতি কালজয়ী লেখাগুলো লেখেন এবং ছোটদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
৫ই ডিসেম্বর ১৯৫১, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।



ফুলকুসুমপুর খুব কাছে ১৮
রতনতনু ঘাটী


দু’ দিন হয়ে গেল ছড়াপিসিরা এসেছেন। খুব আনন্দে আর হট্টগোলে দুটো দিন কেমন করে যে ফুস হয়ে গেল বিন্নিরা হিসেব পায় না। 
   কুয়াশামাসি যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘বড়মা, আমার হয়ে গেছে। আমি এখন আসছি।’ আজ ভোর-ভোর ইচ্ছেঠাকুরমা গান গাইতে-গাইতে সামনের বাগানে পুজোর ফুল তুলছিলেন: ‘প্রভাত হইল জগৎ জাগিল, চেতনে চাহিল নারী-নর।’
   আজ ওদের সঙ্গে বড় পালঙ্কটায় ঘুমিয়েছিল লিমেরিক আর হাইকুও। পাঁচজনে অনেক রাত অবধি আগড়ম-বাগড়ম গল্প বলেছে লিমেরিক। সে সব গল্প দুমকারই।
   লিমেরিক বলল, ‘তিন্নিদি, তোমরা যেদিন দুমকা আসবে, তোমাদেরকে বাবার গাড়িতে করে ম্যাসানজোড় ড্যাম বেড়াতে নিয়ে যাব। দেখবে, কত বড় ড্যাম, কত জল ধরে রাখা আছে।’
   বিন্নি বলল, ‘তোদের ওখানে আর কী দেখার আছে রে লিমেরিক?’
   হাইকু বলল, ‘কেন, আমাদের ওখানে ত্রিকুট পাহাড় আছে। তার তিনটে চুড়ো দেখা যায়! তোমাদের ওখানে নিয়ে যাব।’
   লিমেরিক হাত দিয়ে হাইকুর মুখ চাপা দিয়ে বলল, ‘তুই থাম তো। প্রথমদিন আমরা যাব শিবপাহাড়ের বিখ্যাত শিবমন্দির দেখতে। ওখান থেকে ফেরার পথে তটলই হটস্প্রিং দেখে নেব। দেখবি, তোদের দারুণ লাগবে।’
   বুম্বা জিজ্ঞেস করল, ‘আদিবাসীদের গ্রামে নিয়ে যাবে না? জানো লিমেরিকদিদি, আমি কখনও আদিবাসীদের গ্রাম দেখিইনি।’
   ‘ও, তুই আদিবাসীদের করুয়া গ্রামের কথা বলছিস? ওখানে তোদের নিয়ে যেতে বলব বাবাকে। দেখি, বাবার আবার সময় হয় কিনা!’
   তারপর কখন যে ওদের চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এসেছিল কে জানে?
   ইচ্ছেঠাকুরমার গানের সুরে ঘুম ভাঙল প্রথমে তিন্নির। তিন্নি ধড়ফড় করে উঠে বিন্নির গায়ে ঠেলা দিল, ‘অ্যাই বিন্নি, আজ তো আমাদের বিপদভঞ্জনদাদু আসবেন পড়াতে। ওঠ তাড়াতাড়ি! অ্যাই বুম্বা, উঠে পড়।
   বিন্নি চোখ ঘষতে-ঘষতে বলল, ‘না রে, আজ পড়াবেন না। আজ শুধু পরিচয় করার দিন!’
   ততক্ষণে লিমেরিকেরও ঘুম ভেঙে গেছে। সে বলল, ‘যাঁরা টিচার হন, তাঁরা সব সময়ই পড়া ধরেন। উনিও আজ তোদের পড়া ধরবেন, দেখে নিস।’
   তিন্নি বলল, ‘সে যা হয় হবে। আগে তো ব্রাশ করে পড়ার ঘরে বসে যাই!’
   লিমেরিক হাততালি দিয়ে বলল, ‘তোদের পড়া, আমাদের তো নয়! আমি আর হাইকু বরং ব্রাশ করে রাধাগোবিন্দর খাঁচার সামনে চলে যাই। দেখি ও ক’টা কথা বলতে শিখেছে।’
   একটু পরে একতলা থেকে কেউ ডাকলেন, ‘ইচ্ছেকুমার, বাড়ি আছ?
   ইচ্ছেদাদু তড়িঘড়ি করে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে গেলেন, ‘এসো, এসো! বিপদভঞ্জন!’
   হাতে ধরে তাঁকে দোতলায় তিন্নিদের পড়ার ঘরে নিয়ে এলেন দাদু। সাদা ধুতি আর সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা। একমাথা সাদা চুল। চোখে গান্ধী-চশমা! দাদু আগে থেকেই তাঁর জন্যে একটা চেয়ার আনিয়ে রেখেছিলেন বিলম্বদাদুকে দিয়ে। বসতে দিলেন। 
   বিপদভঞ্জনস্যার একবার তিন্নিদের সকলের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আমি যখন এ ঘরে ঢুকলাম, তোমরা কেউ উঠে দাঁড়ালে না কেন? সকলে উঠে দাঁড়াও! ক্লাসে মাস্টারমশাই এলে সকলকে উঠে দাঁড়াতে হয়, এটাই নিয়ম। এসব কি তোমাদের ‘নৈবেদ্য’ স্কুলে শেখায় না?
   ওরা সকলে উঠে দাঁড়াল। স্যার হাসিমুখে বললেন, ‘বোসো, বোসো!’ তারপর ইচ্ছেদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসার সময় তোমাদের টিয়াপাখির খাঁচার সামনে দুটো মেয়েকে দেখলাম, ওরা পড়ার ঘরে এল না কেন?’
   দাদু লজ্জিত মুখে হেসে বললেন, ‘ওরা আমার দুই নাতনি, মেয়ের তরফের। ওরা থাকে দুমকায়। দু’ দিন হল বেড়াতে এসেছে।’ 
   বিপদভঞ্জনস্যার হাত তুলে বললেন, ‘আহা ইচ্ছেকুমার, লেখাপড়ার সঙ্গে দুমকা আর ফুলকুসুমপুর, বাধাটা কোথায় শুনি?’
   দাদু আমতা-আমতা করছিলেন, ‘না, মানে...’
   বিপদভঞ্জনস্যার বললেন, ‘যাকো ওদের।’
   ওদের ডেকে আনা হল। বিলম্বদাদুকে ডেকে দুটো চেয়ারও আনার ব্যবস্থা হল। ইচ্ছেদাদু পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
   বিপদভঞ্জনস্যার শুরু করলেন, ‘আমি আজ তোমাদের পড়াব না।’ বলে একে-একে সকলের নাম আর ক্লাস জিজ্ঞেস করলেন। বাদ পড়ল না লিমেরিক আর হাইকুও। তারপর বললেন, ‘আমি কিছু কথা বলব, যে কথাগুলো সারাজীবন মনে রাখবে, কেমন?’
   বুম্বা হাত তুলে বলল, ‘মনে রাখব স্যার!’
   ‘বাঃ, বেশ!’ তারপর বললেন, ‘কখনও পড়তে-পড়তে বইয়ের পাতা বা লিখতে-লিখতে খাতা খোলা রেখে উঠে যেতে নেই! ওতে বইয়ের বা খাতার খুব কষ্ট হয়! বই-খাতা বন্ধ রেখে তারপর উঠে যেতে হয়।’
   ওরা সকলে মন দিয়ে শুনছিল স্যারের কথা। এর পর স্যার বললেন, ‘বই পড়তে-পড়তে কখনও পৃষ্ঠা মুড়ে, কোথায় পড়ছিলাম, সে চিহ্ন রাখতে নেই। ওতে বইয়ের চোখের জল পড়ে।’
   বুম্বা ফটাস করে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘স্যার, বইয়ের চোখের জল কি বইয়ের পাতাতেই পড়ে?’
   স্যার হেসে বললেন, ‘বাঃ, তোমার মনে তো বেশ কৌতূহল আছে। না, বইয়ের সে চোখের জল আমরা কেউ দেখতে পাই না! শুধু বিদ্যারদেবী একাই দেখতে পান। তখন তিনি পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর দেন!’
   বড়দিদিরা কেউ কোনও কথাই বলছে না। শুধু বুম্বা গালে হাত দিয়ে বলল, ‘ও মা! তাই?’
   বিপদভঞ্জনস্যার বললেন, ‘আরও একটা মনে রাখার মতো কথা বলি—সব সময় কলম খোলার সময় ঢাকনাটা কলমের পিছনে লাগিয়ে নিতে হয়। তা হলে কলমটা বন্ধ করার সময়, ‘কোথায় রাখলাম কলমের ঢাকনাটা---’ ভেবে খুঁজতে হবে না। আর-একটা কথা, কখনও কলম খোলা রেখে উঠে যেতে নেই। ওতে মনের দুঃখে কলমের কালি শুকিয়ে যায়।’
   ‘আজ আমি পড়াব না। তোমাদের গেস্ট লিমেরিক আর হাইকু দুমকা ফিরে গেলে তার পরের দিন থেকে শুরু হবে আমাদের পড়াশোনা, কেমন? আজ চলি?’
   পড়ার ঘর থেকে বেরোতেই ইচ্ছেদাদুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দাদু স্যারকে বসার ঘরে নিয়ে গেলেন বিপদভঞ্জনস্যারকে। ওরা সিঁড়ি দিয়ে নীচে খেলতে চলে গেল। নীচে গিয়ে বিন্নি চোখ দুটো গোল-গোল করে বলল, ‘জানিস তিন্নিদি, বিপদভঞ্জনস্যার কিন্তু খুব কড়া মানুষ!’
(এর পরে আগামী রোববার)




গল্পে গল্পে ক্যুইজ
রাজীব কুমার ঘোষ

পর্ব ৬

“যারা স্বর্গগত তারা এখনো জানে
স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি”

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছরটি থেকে সময়ের পথ বেয়ে আমরা ক্রমশ যত দূরে চলে আসছি, তত যেন একের পর এক প্রজন্ম ভুলে যেতে বসেছে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের রক্তাক্ত ইতিহাস। স্বাধীনতা আন্দোলন এখন যেন শুধু ইতিহাস বইয়ের কিছু অধ্যায়, যাতে লাল কালি দিয়ে ইম্পরট্যান্ট কোশ্চেন দাগানো থাকে। দাগানো থাকে সাল, তারিখ — যে সাল তারিখ হয়ত আজ তোমাদের বুকে দোলা লাগায় না। আগে একসময় ছেলে-মেয়েরা খবরের কাগজ থেকে ছবি কেটে খাতায় আঠা দিয়ে আটকাত। সেই খাতায় যেমন খেলোয়ারদের ছবি, সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবি আটকানো থাকত তেমনি কিন্তু অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবিও আটকানো থাকত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনেকে আলাদা খাতা করত এই উদ্দেশ্যে। এছাড়া ক্লাসের সবারই কোনো না কোনো প্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিল। কারো সুভাষচন্দ্র, কারো ক্ষুদিরাম, কারো রাসবিহারী বসু, কারো বাঘা যতীন, কারো মাস্টারদা সূর্য সেন … কত নাম আর করব। 

পরবর্তীকালে আমি যখন আবাসিক স্কুলে ছেলেদের হোস্টেলে যেতাম, তখন খেয়াল করেছিলাম তাদের ডায়রিতে নতুন, দামী বাইকের আর স্পোর্টস কারের ছবির সংখ্যা বাড়ছে। দুই দশকের মধ্যে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল স্মার্ট ফোনের ছবি আর হরেক গ্যাজেটের ছবি। এখন তো ডায়রি কেউ রাখে কিনা সন্দেহ। একদিন দেখলাম, অনেকেই পর পর দশজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম বলতে পারছে না, চারটে নাম বলার পর ভাবতে হচ্ছে। 

তোমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত মনে মনে ভাবে, হ্যাঁ আমরা পরাধীন ছিলাম। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অনেক কষ্ট স্বীকার করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ কিন্তু এই পুরনো ইতিহাস এত বিশদ ভাবে স্কুলে পড়ানো কি খুব দরকার? তারা ভাবে, কিন্তু বলতে সাহস করে না। জানে বললে বকা খাবে। 
আসলে ভুলটা আমাদের বড়দের, আমরাই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ইতিহাসের বিষয় বলে দেগে, অতীতের বস্তু করে দিয়েছি। আসলে ইতিহাস যে আমাদের জীবনে হাতেনাতে কাজে লাগে সেই বোধটা আমাদেরও নেই তাই তোমাদের মধ্যেও জাগাতে পারিনি আমরা। যার জন্য সেই বিষয়গুলোকেই তোমরা গুরুত্ব দাও যেগুলো তোমরা ভাবো তোমাদের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে কাজে আসবে। আমরা বড়রা, বাড়িতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে কোনো বই পড়ি না, সিনেমা দেখি না, চর্চা করি না। এমনকি আমরা যে জায়গায় থাকি এও জানিনা সেই জায়গায় স্বাধীনতা সংগ্রামে লোকেরা কীভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। আমাদের বাড়িতে আর কি কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর ছবি থাকে? 

আমরা ধরে নিয়েছি আমরা আর পরাধীন হব না। সত্যিটা হল, যে জাতি নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বিস্মৃত হতে থাকে, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভুলতে থাকে অর্থাৎ লড়ার ইতিহাস ভুলতে থাকে সেই জাতির পক্ষে স্বাধীনতা ধরে রাখা শক্ত। আর বর্তমান পৃথিবীতে যুদ্ধ করে, দেশ দখল করে, অন্য দেশকে পরাধীন করতে হয় না। অন্যভাবে তাদের স্বাধীন সত্তাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। বড় হলে তোমরা এ সম্পর্কে আরো বুঝতে পারবে।
 আমাদের সৌভাগ্য দুই দশক আগে অনেক বিপ্লবীদের আমরা নিজের চোখে দেখেছি। আজাদ হিন্দ বাহিনীর ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সহগলের ভাষণ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশরা অনেককে বন্দী করেছিল আজাদ হিন্দ ফৌজকে টাকা দিয়েছিল বলে। তাদের যখন ধমকানো হল, কেন তারা টাকা দিয়েছিল, তারা বলেছিল, সাহেব — সুভাষচন্দ্রের সে ডাক তুমি শোনোনি, শুনলে তুমিও তোমার সব টাকা পয়সা দিয়ে দিতে। সেদিন ভাষণ শুনতে শুনতে ঠিক এই কথাটাই আমার মনে পড়েছিল। তখন ওনার অনেক বয়স কিন্তু বলা শুরু করা মাত্র মনে হল আমাদের শরীর দিয়ে তড়িৎ বয়ে চলেছে। সেদিন তার মধ্য দিয়ে সুভাষচন্দ্র নামক আগুনকে আমরা স্পর্শ করেছিলাম। 

প্রিয় বন্ধুরা, স্বাধীনতা দিনটি আমাদের কাছে যেমন আনন্দের দিন, আবার দুঃখেরও দিন। অনেক বলিদানের মাধ্যমে এই স্বাধীনতা এসেছে। কত বলিদান, তা তোমাদের কল্পনার বাইরে। যখন লাইব্রেরিতে বসে নানা তথ্য খুঁজতাম, ব্রিটিশদের এমন এমন অত্যাচারের ঘটনা পড়তাম যে কাজ করতে পারতাম না, অসুস্থ লাগত। বই বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসতাম। ভাবতাম এরা যে দেশের জন্য নিজেদের প্রাণ অবধি দিয়েছেন সেই দেশের নাগরিক আমি কি হতে পেরেছি? 
স্বাধীনতার সঙ্গেই আমরা রাজনীতির ফসল হিসাবে পেয়েছিলাম দেশ ভাগ আর জাতি দাঙ্গা। তা যে কী ভয়ঙ্কর তা বোঝানো যাবে না। রাতারাতি দলে দলে মানুষ নিজেদের জমি-জায়গা ছেড়ে সর্বস্ব হারিয়ে উদবাস্তু হয়ে হাজির হয়েছিলেন বর্তমান পাঞ্জাবে আর পশ্চিমবঙ্গে। এই স্বাধীনতা তাদের কাছে হয়ে উঠেছিল অভিশপ্ত। 

তবুও আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক। গোটা পৃথিবীর দিকে তাকালে নিজেদের ভাগ্যবানই মনে হয়। বহু দেশে নাম কা ওয়াস্তে স্বাধীনতা থাকলেও গণতন্ত্র সেভাবে নেই। অসহনীয় সেই সব দেশের নাগরিকদের জীবন। 

এসো আজ আমরা মনে মনে একটা শপথ নিই। প্রতি বছর আমরা অন্তত দু’জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবন সারা বছর ধরে ভালোভাবে পড়ব। তাদের সম্পর্কে কিছু বই কিনব। কিছু লিখব, বন্ধুদের বলব। স্বাধীনতার লড়াই কিন্তু এখনো চলছে। সেই লড়াই কখনো থামে না। আমরা এখনো দারিদ্র থেকে স্বাধীনতা পাইনি, এখনো সব বাচ্চা দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পায় না, এখনো উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকাঠামো আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেভাবে নিয়ে যেতে পারিনি, করোনা পরিস্থিতির সেভাবে মোকাবিলাও আমরা করতে পারছি না। অনেক কিছু আমরা পেরেছি আবার অনেক কিছু পারিনি। আমাদের না পারা কাজগুলো তোমাদের জন্য থাকবে। তোমরা তৈরি হচ্ছ তো, সেই পরিপূর্ণ স্বাধীনতা আনার জন্য?
শুরুতেই মোহিনী চৌধুরীর লেখা, কৃষ্ণচদ্র দে-র গাওয়া বিখ্যাত গানের পংক্তি দিয়ে শুরু করেছি, সেটি দিয়েই শেষ করা যাক। 

মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হলো বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে

কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা
বন্দীশালায় ঐ শিকল ভাঙা
তারা কি ফিরিবে আর
তারা কি ফিরিবে এই সুপ্রভাতে
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে

যারা স্বর্গগত তারা এখনো জানে
স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি
এসো স্বদেশব্রতের সহদীক্ষালোভী
সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণচুমি

যারা জীর্ণজাতির বুকে জাগালো আশা
মৌন মলিন মুখে জাগালো ভাষা
সাজি রক্তকমলে গাঁথা মাল্যখানি
বিজয়লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরি গলে
 
স্বাধীনতা ক্যুইজের বিষয় নয়। স্বাধীনতা নিয়ে ক্যুইজ হয় না, অনুসন্ধান হয়, খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কারের চেষ্টা হয়। চলো আজ তোমাদের কিছু অনুসন্ধানের রসদ দিই।

১।। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলে একটি চলচ্চিত্রের পুরনো ট্রেলার দেখতে পাবে। এই ট্রেলারে অগ্নিযুগের যে ঘটনাটি উঠে এসেছে সেটি কোন ঘটনা? এই ট্রেলারে আটজন প্রধান বিপ্লবীকে দেখতে পাবে, তারা কারা কারা।


২।। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলে যে চলচ্চিত্রের একটি গান দেখতে পাবে সেটি কোন চলচ্চিত্রের গান এবং এই গানে যে সাহেবকে দেখানো হয়েছে তার পরিচয় কী? যে গানটি গাওয়া হচ্ছিল, সেটি কার লেখা?



৩।। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলে যে দৃশ্য দেখতে পাবে, সেখানে দেখবে তিনজন বিপ্লবীকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই তিন বিপ্লবীর নাম কী? দৃশ্যটির শেষে বিপ্লবীরা কোন শ্লোগান বার বার দিয়েছিলেন? এই শ্লোগানের অর্থ কী?



৪।। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলে একটি ঘটনা দেখতে পাবে। কোন ঘটনা? কবে ঘটেছিল? 



৫।। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলে যে দৃশ্য দেখতে পাবে তাতে একটি স্টেশনে আন্দোলনরত জনতার ওপর লাঠি চার্জের জন্য ভারতবর্ষের অন্যতম এক সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী নেতার মৃত্যু ঘটে। লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত হবার পরেও তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমার শরীরে প্রত্যেকটি আঘাত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের কফিনে পেরেক হয়ে উঠবে। এই বীর দেশপ্রেমিকের নাম কী? বিক্ষোভটি কীসের জন্য হচ্ছিল? কোন শহরে হচ্ছিল?



পাঠ প্রতিক্রিয়া
( জ্বলদর্চির ৪৪ তম ছোটোবেলা সংখ্যা পড়ে অসীম হালদার যা লিখলেন)

ফোকলা হাসিমুখগুলির হাসি আর হাসতে হাসতে প্রায় মাটিতে পাক খেয়ে পড়ার মতো অবস্থা ওদের। কিন্তু কাদের? তা আর বলতে! ঋপণ আর্যের এবারের প্রচ্ছদে পাঁচটি 'ভেলকিরাম ভূতের ছানার' মতো বিচ্ছুর হাসি আর ধরে না! একটা সময়ে গ্রামগঞ্জে ঠাকুমা দিদারা গাছতলায় বসে গল্পের ঝুলি থেকে প্রতিদিন বিকেলবেলা একটা করে মজার মজার গল্প শোনাতেন ছেলে ছোকরাদের। তাঁরা এতোটাই জনপ্রিয় হতেন যে তাঁদের দেখামাত্রই কচিকাঁচারা এসে ভিড় জমাতো গোল করে তাঁদের কাছে। অনেকটা ঠাকুমার ঝুলির মতো বা গল্পদাদুর মতো ব্যাপার। তা কোন একদিনের বিকেলে সেই দাদু তাঁর বিরাট দাড়ি গোঁফ নাড়িয়ে নাড়িয়ে এমন মজার গল্প বলেছেন যে তাঁর বিপরীতে বসা পাঁচ পাঁচটি কচি মুখে হাসির বাঁধ ভেঙ্গে পড়েছে। ছোট্ট একটু পরিসরে কি সুন্দর গায়ে গায়ে বসে ওরা কতো খুশী! পায়ে চপ্পল কোথায় খুলে রেখেছে, কে জানে। গায়ে জামা গলাতেও ভুলে গেছে একজন। তা হবে না-ই বা কেন! দাদু চলে এসেছে বলে বন্ধুদের ডাকে দুপুরের ঘুম থেকে উঠেই এক দৌড়ে এসে হাজির মাঠের ঐ ছোট্ট জায়গায়। প্রচ্ছদে শুধু ওদেরকেই দেখতে পাচ্ছি; কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি বিপরীতে বসে দাদু ঠাকুমার গল্প শুনেই ওদের এখন মুখে হাসি আর ধরছে না। তোমরা যারা এখন অন লাইন অফ লাইন পড়া করে চলেছো, মন খারাপ লাগছে তো...ওদের দেখে! আর কটা দিন গেলে তোমরাও মাঠে ঘুরে বেরাতে পারবে ওদের মতো। মন খারাপ কোর না, কেমন!

ছোট্ট এবং একটু বড়ো বন্ধুরা, তোমাদের সৃজন দিয়ে এবারেও আমার প্রতিক্রিয়া শুরু করছি।

সবেমাত্র রথযাত্রার অনুষ্ঠান শেষে জগন্নাথদেব, বলরাম আর সুভদ্রাকে নিয়ে নিজেদের বাড়ি ফিরলেন। তাঁদের ঘিরে কতো আশা, আকাঙ্ক্ষা আমদের মনে, তাইতো। সাথে জিলিপি, পাঁপড় .... এসব পর্বও তো মিটলো। কিন্তু শেষ হইয়াও শেষ হইলো কি! না। অনুষ্ঠানের রেশ রয়ে গেছে ছোট্ট সান্নিভ ও মিহিকার হাতের জাদুতে। তোমাদের আঁকা ছবিতে কালো শ্যাম হয়ে উঠেছে মনোময়, প্রাণের পুরুষ! আমি ভক্তিশ্রদ্ধার সাথে প্রাণের ঠাকুরকে আবার প্রণাম জানাই। তাঁদের কাছে তোমাদের এবং সকলের জন্য মঙ্গলকামনা করি। 

একজন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রের মনে যখন কোন জাতীয় সমস্যা ধরা পড়ে যায়, তখন ভেবে দেখতে হবে বইকি। অভিকের সাথে আমিও একমত। সত্যি দেশে দুরাচার ভর করেছে, না হলে একটু অবসরে সবাই মিলে পিকনিকের মজা করা যাচ্ছে না কেন! তবে কথা আছে বাবু, 'সবুরে মেওয়া ফলে'। ধৈর্য্যের পরীক্ষায় তোমরা শুধু পাশই করো নি, রীতিমতো স্টার মার্কস পেয়েছো। তাই বলি, আর কটা দিন না হয় অপেক্ষাই করলে।

মাথার ওপর থেকে যখন ছাদটা সরে যায়, তখন ভরসা করতে হয় পরের ওপর। বাঁচার লড়াইএ সেইপথে সাথী হতে পারে বড়ো জোর কোন বন্ধু, যে বিনাস্বার্থে তার সাথে মিশতে পারে। কিন্তু ভাগ্যে না থাকলে জোটে না। তখন গোটা প্রকৃতি থাকে তার পানে চেয়ে। প্রকৃতির সেই খেলায় ভাসতে থাকে তার ছেলেবেলা, স্বপ্নে ভাসে মায়ের মুখ। মনে হয় শিমুলতুলোর মতো স্মৃতিগুলো স্বপ্নের দুয়ারে এসে ভিড় করে রূপাইএর সাথে সখ্যতা করতে চায়। স্বস্তিকার গল্প আমাকে উদাস করে দিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। 

আইসক্রিম খেতে কার না ভালো লাগে! আমাদের বাড়িতেও তিনটে বিভিন্ন বয়সের প্রাণী আছে। তাদের চোখে আইসক্রিমের গাড়ি পড়লে তো আর কথা নেই। যদিও এই বক্তা এইবিষয়ে একটু বেরসিকই। তবু মোহনাকে বলি, তোমার বন্ধুসংখ্যা কিন্তু কোন অংশেই কম হবে না, যদি এমন ছবি দেখে সবাই যেখানে আছে আইসক্রিমের গাড়ি। এছাড়া আত্রেয়ীর আঁকা ছবিটাও বেশ ফাটাফাটি লেগেছে। কথায় আছে না লজ্জা নারীর ভুষণ, সুসজ্জিতা সুন্দরী রমণী যেন তারই সাক্ষাৎ পরিচয়বাহী। ফ্রেন্ডশিপ করতে গিয়ে যদি কেউ ফ্রেণ্ড না হতে চায়, তাতে দুঃখ তো হয়ই। তবে কেউ যদি সেই দুঃখ ধরে রাখে, তাহলে তো জীবনে খেলা শেষই হয়ে গেলো। ইমনের ছবিতে ফুল শুকিয়ে যাওয়া এবং ব্যাজার মুখ করে যেমন মেয়েটি রয়েছে, তোমরা একদমই কিন্তু তেমন থেকো না। জানবে দুনিয়াটা অনেক বড়ো। তোমার পাশে আছে অনেক বন্ধু, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করেই ফেলো না হয়।

জগদীশ শর্মা রচিত 'নোনাজল' আর  'জলছুড়ি' বেশ গভীর অর্থবহ মনে হলো। তিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে ভুবনডাঙ্গার ছবি এঁকেছেন। সেখানে সাধারণ মানুষদের সুখদুঃখের জীবনপথ বর্ণিত হয়েছে। মহিলা আর শিশুদের রোদ, জল, ঝড়ে বেড়ে ওঠার এবং সংসার সাগরে ভেসে চলার সুন্দর রেখাপাত করেছেন বলে মনে হলো। 
আছে রাম-রাবণের কাহিনীও দীপ মুখোপাধ্যায়ের কলমে। জটায়ু, রাম, রাবণ, রাক্ষস, হনুমান ... এসব কাহিনী তো এখন অনেক শিশুদেরই পাঠ্যপুস্তকের বিষয় থেকে দূরে চলে গেছে। তাই তাদের কাছে এসব একটু অদ্ভুত রকমেরই। 

বাপ্ রে বাপ্...একটা তালের ওপর গবেষণাপত্র পেয়ে গেলাম শ্রীকান্ত অধিকারীর 'তাল ত্যালামো' গল্পে! কি নেই সেখানে! তালদীঘি, তালমারি দিয়ে তালের ফুলুরি, তালরুটি, তালের মালপোয়া, তাললুচি, পিঠে ... আরও কতো কি! রাঙাপিসির ঝুলিতে এক কথায় তাল মানেই তালের রসে মাখা বহু কাহিনী। মনে পড়ে মায়ের হাতেও আমরা তালের বড়া খেতাম, তালমারি দিয়ে সপাৎ সপাৎ করে জঠরের ভোজনপর্ব মেটাতাম। এছাড়া জলে ভরা তাল শাঁস ছিল বেশ আকর্ষণের। দুটো তালের মাঝে একটি কঞ্চি দিয়ে জোড়া লাগিয়ে দুই চাকা-ওয়ালা গাড়ি মনে করে একটা লম্বা লাঠি দিয়ে কতোই তো দেখেছি গ্রামের ছেলেদেরকে আনন্দ করতে...সেসব দিন কি ভোলার! যাক্ গে, তা তালের গল্পে পেলাম পুরুষ তালগাছে তাল ধরার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, সঙ্গে কতো অজানা ইতিহাস। ভূতেরও আনাগোনা পেলাম। তালগাছ আর ভূত না এসে পারে না কি! তবে সেই তালের মায়াতেই কচিমনে দুঃখ জমে থাকলো শেষে। কি আর করা যাবে, বাজ পড়ার শব্দে বাবা মায়েদের তোমাদের নিয়ে কি চিন্তা হয় না, বলো! তাই বর্ষার সময়ে একদমই বাইরে বেরোবে না কেউ, মনে থাকবে তো! তালের মরশুমে এখন না হয় তাল জমিয়ে উপভোগ করা যাক বাবা মায়েদের সান্নিধ্যে।

'টিকাকরণ কর্মসূচী' আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গেছেন কবি তথাগত বন্দোপাধ্যায় মহাশয়। তেমনি তুলে ধরেছেন করোনা নিয়ে দশদিকের দশকথা। তবু দুর্ভাগ্য এটাই যে আমাদের মনে ভয় পিছু ছাড়লো না টিকা নিয়ে। পাশে পরনিন্দার মতো শিল্পকলা আছেই। তবে তোমাদের জন্য বলি, এইসব লোকের ভুলভাবনায় কান না দিয়ে এই সুরক্ষা কবচটি পাওয়া গেলে নিয়েই নিও, কেমন!

শুভশ্রী সাহার 'উরম্বেটে কাক' কিন্তু সকল অলস বন্ধুদের জন্য একটা বার্তা দিলো। লক ডাউন একরকম তো লক আপের ব্যবস্থা করেই ছেড়েছে সবাইকে। খাওয়া আর ঘুমানোর বদ অভ্যেসও তাই হাড়ে মজ্জায় আমাদেরও কিছুটা বাসা বেঁধেছে, অস্বীকার করি কি করে। কিন্তু সব কথার এক কথা, বিনা পরিশ্রমে কোন প্রাপ্তিলাভ হয় না। কথায় আছে, আলস্য দুঃখের আকর। অতএব তোমাদের জীবন গড়ার সিঁড়িতে তার অবাঞ্ছিত প্রবেশকে কঠিন হাতেই প্রতিরোধ কোরো।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সম্বন্ধে শ্রী পীযূষ প্রতিহার মহাশয়ও আর একটি শিক্ষনীয় বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরেছেন। এখনকার 'বেঙ্গল কেমিক্যালস' গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে তাঁরই অবদান ছিলো, তা তো জানতে পারলে। শ্রীপর্ণা প্রফুল্লচন্দ্রের ছবিটা এঁকে তাঁর উদ্দেশ্যে যোগ্য সম্মান দিয়েছে। 

ফুলকুসুমপুরের ত্রিপাঠী বাড়িতে এখন চারটি পোষ্য নিয়ে মাতামাতির অন্ত নেই। আর সেইজন্য তিন্নি, বিন্নি, বুম্বারও সময় কাটানো বেশ মজারই লাগছে। সাথে আবার ছড়াপিসির আগমন তাদের কাছে বাড়তি উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু...হ্যাঁ ... একটা 'কিন্তু' বিষয় ইচ্ছেদাদুর কাছ থেকে শুনে তো তাদের একেবারে মুখ ব্যাজার। পিসি দুমকা চলে গেলেই নাকি গৃহশিক্ষক হয়ে আসছেন বিপদভঞ্জনবাবু! বাড়ির সবার সামনে মিটিং করে তাঁর এমন ঘোষণা শুনে পোষ্যদের নিয়ে সারাদিন কাটানোটা যে কিছুটা কমবে, বলাই বাহুল্য। বাড়ির গৃহকর্তা হিসাবে দাদু, দিদা, কাকা, কাকিমা ... এঁদের সবাইকে সম্মান করা এবং তাঁদের নিজেদের মধ্যেও সম্মান দেখানোর এই শিক্ষা তো এখন বড়ো একটা দেখা যায় না। কারণ সে পরিবেশও বদলেছে। একটা বাঁধনের মধ্যে ত্রিপাঠী বাড়ির সকলের এমন বেঁধে বেঁধে থাকা যেকোন সুস্থ পরিবারের জন্য শিক্ষনীয় বটে। মূল্যবোধ তো এইভাবেই আসে। এই ধারাবাহিক শুধু তোমাদেরকে নয়, আমাদের মনকেও নাড়ায়, ভাবায়। সেই উপলব্ধিতে বড়ো সুখ। তাই রতনতনুবাবুর ওপর আমি শ্রদ্ধাশীল। সায়নী কুণ্ডুর ছবিটাও কি ভীষণ ভালো লাগলো। 

আর রাজীব বাবুর ভূমিকা জ্বলদর্চিতে আর নতুন করে কি বলবো। তবে একটা কথা বলতেই পারি, আমি আমার ছোটবেলার স্কুলের একজন শিক্ষককে পেয়ে গেছি। লজ্জা নেই স্বীকার করতে যে আমি পড়তে পড়তে কেমন যেন সম্মোহিত হয়েই পড়ি। প্রতিটি লাইনই মনে হয় আদর্শ পথের দিশারী। রাগ নিয়ে তাঁর লেখা খুবই শিক্ষনীয় হয়েছে। সাথে অজানা আরও জ্ঞানলাভ। কুইজ যে এরকম গল্পের আকারে সবার মনকে জয় করতে পারে, তা সত্যিই অভিনব। আগামী সংখ্যায় আমরা তাঁর কাছ থেকে আরও নতুন কিছু শিখবো, সেই আশায় আমিও রইলাম।

আশাকরি তোমরা ১৫ই আগষ্ট নিয়ে তোমাদের সৃজনে উঠে পড়ে লেগেছো। আগামী সংখ্যাগুলোয় হয়তো তোমাদের সেই ভাবনাগুলো জ্বলদর্চির পাতায় জ্বল জ্বল করবে। আর যখন তোমাদের মৌসুমী আন্টি রয়েছেই, তোমাদের কাছে পৌঁছে যেতেও সময় লাগবে না। নিয়ম করে তাঁর সম্পাদনায় আজ পত্রিকাটি সব বয়সীদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। চলো, তোমরা সবাই ফিনিশিং টাচ দিয়ে সুন্দর করে তাঁর কাছে পৌঁছে দাও তোমাদের সৃষ্টিগুলোকে। জীবন্ত হয়ে উঠুক আরও।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 







Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া