রাজা রামমোহন রায় / রাজর্ষি রায়


রা জ র্ষি  রা য়  

রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩ খ্রি)

বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণের প্রথম ও প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। প্রায় আড়াইশো বছর আগে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্ররূপে রামমোহনের জন্ম হয়। বাড়িতে তখন জমজমাট সংসার। পরিবারটি ছিল বৈষ্ণব ভক্ত। ছেলেবেলা থেকেই আশ্চর্য মেধাবী ছিলেন রামমোহন। ছেলের পড়াশোনার দিকে ঝোঁক বলেই পিতা রামাকান্ত প্রথমে তাঁকে সংস্কৃত শিখতে পাঠিয়ে দেন কাশিতে। অল্প দিনেই তিনি সংস্কৃত পণ্ডিত হয়ে উঠলেন। পরে ফার্সি শেখার জন্য তিনি পাটনায় যান। ফার্সি তিনি এত ভালো শিখলেন যে তাঁর নাম হলো 'মৌলভী রামমোহন'।

তখন ভারতে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ গভমেন্ট নয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জাঁকিয়ে ব্যবসা করছে। রামমোহন ১৪-১৫ বছর বয়সেই অসামান্য পণ্ডিত হয়ে রাধানগরে ফিরে আসেন। তাঁর এই বিদ্যা এবং জ্ঞান কাল হলো । তিনি দেবদেবীর পূজায় বিশ্বাস হারালেন। তাঁর মতে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। মাটির মূর্তিকে দেবতা হিসেবে পূজা করা তাঁর শিক্ষায় বাদ সাধল। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান- যারা নানারূপে ঈশ্বরকে দেখেন তারা হল ভ্রান্ত -এই ছিল তাঁর অভিমত। প্রথমে রামাকান্ত ছেলেকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন কিন্তু ছেলের সঙ্গে তর্কে পেরে উঠলেন না। তাঁকে নাস্তিক, বিধর্মী এবং কুলাঙ্গার বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। পনেরো বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান ভারতবর্ষকে দেখতে। সত্যের সন্ধানে করতে।
তিনি সেই বয়সেই দেখতে পেলেন ভারতের সতীদাহের মত বীভৎস ভয়ঙ্কর রূপ। ১৬ বছরের স্ত্রীকে ৯০ বছরের স্বামীর সঙ্গে চিতায় পুড়িয়ে মারতে। হিন্দু দেশ ভারতবর্ষ কিন্তু হিন্দু কোথায়, কেউ শাক্ত, কেউ বৈষ্ণব, কেউ রামায়েৎ কেউ গণপৎ। আর, পরস্পরের প্রতি  ঘৃণা। এইসবই তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। ঘরের মেয়েদের অশিক্ষা আর দুর্গতির কবলে ফেলে রেখে ধর্মচর্চা করা শত শত  হিন্দুর মত তিনি ভাবতে পারলেন না। এই অজ্ঞানতার অভিশাপ থেকে ভারতবর্ষকে বাঁচাতে এবং ভারতীয় জাতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে তিনি মরিয়া হয়ে উঠলেন। সেই মিলন মন্ত্রের সূত্র তিনি খুঁজে পেলেন দেশের 'উপনিষদ'-এ।
কিছুকাল তিনি পশ্চিমের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালেন--পাটনা থেকে কাশি। দু'বছর পর তিনি কলকাতায় এলেন ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে। এখানেই শুরু করলেন কোম্পানির কাগজের ব্যবসা। এইসময় ফোট উইলিয়াম কলেজ-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাঁদের মধ্যে জন ডিগবি নামে এক ইংরেজ সিভিলিয়ান-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের ফলেই রামমোহনের জীবন বাঁক নেয় অন্য পথে। ইতিমধ্যে পিতা রামকান্ত নানারকম দেনায় জড়িয়ে পড়েন। অসুখে ও মানসিক দুশ্চিন্তায় বর্ধমানের রাজ-সরকারের কাজে থাকাকালীন তিনি মারা যান। পিতার শ্রাদ্ধের সময় রামমোহন উপস্থিত হলে তাঁর মা তারিনি দেবী নাস্তিক ছেলেকে শ্রাদ্ধে বসার অনুমতি দেননি। একদিকে মায়ের অভিশাপ অন্যদিকে নিজের সত্য। এই সময় ডিগবির সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে তিনি তাঁর কাছে ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি ইংরেজিতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ডিগবির সঙ্গে চাকরি করে রামমোহন যথেষ্ট আর্থিক উন্নতি করেছিলেন। কিছুদিন রংপুরে কাটিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। রামমোহনের দাদা জগমোহন অকালে মারা গেলে তাঁর স্ত্রী অলকমনিকে সতীদাহের শিকার হতে হয়। রামমোহন খবর পেয়ে তা আটকানোর জন্য ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। এই বৌদিকে তিনি মায়ের মতো শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। বিধর্মী ছেলের মৃত্যু কামনা করেছিলেন মা তারিণী দেবী। রামমোহন নিজের বাড়িতে শাস্ত্র আলোচনা করতে থাকেন কিন্তু তা অন্যের কাছে বিড়াম্বনা বলে মনে হয়। শুরু হয় তাঁর উপর নানা রকম উৎপাত ও উপদ্রব। তিনি গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে অনেকগুলি বাড়ি কিনেছিলেন। তাদের মধ্যে একটি কিনেছিলেন মানিকতলায়। তিনি কলকাতায় এসে তাঁর নতুন সর্বভারতীয় ধর্মমত প্রচার করতে লাগলেন। তাতে তাঁর অনুগামী এবং বিরোধী দুই দল গড়ে ওঠে। এই সময় তিনি একের পর এক বই লিখে যেতে থাকেন। তাঁর রচিত ফার্সি বই- 'তুহাফৎ-উল-মুয়াহহিদিন' এবং 'বেদান্ত সার', 'বেদান্ত গ্রন্থ', ইংরেজিতে লেখা খ্রিষ্টান সমাজের প্রতি আবেদন প্রভৃতি গ্রন্থ চারদিকে আগুন জ্বালিয়ে তুলল। বন্ধু অ্যাডামকে নিয়ে তিনি একটি নতুন ধর্মসভা পর্যন্ত গড়ে তুললেন, নাম দিলেন 'ইউনিটেরিয়ান কমিটি'। সেই সভার উদ্দেশ্য ছিল গোঁড়া খ্রিস্টান ধর্মের সংস্কার। সেইকারণে ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেস তাঁর বই ছাপা বন্ধ করে দেয়। তিনি নিজের টাকায় নতুন প্রেস কেনেন এবং সেখান থেকেই তাঁর অভিযান চলতে থাকে। এই সময় তিনি নতুন স্কুল করার চিন্তাভাবনা করেন। নিজের হাতে তৈরি করেন 'অ্যাংলো হিন্দু স্কুল'। আরও ব্যাপক ইংরেজি শিক্ষা চাই তাই স্কটল্যান্ড -এর প্রধান  বিশপের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি আলেকজান্ডার ডাফকে এদেশে নিয়ে আসেন। নতুন উদ্যমে  শিক্ষার উদ্যোগ শুরু হয়। ডাফের সেই স্কুলই আজকের স্কটিশ চার্চ কলেজ।
দশ হাতে কাজ করে চলেছেন তিনি।ব্রাহ্মসভা, অ্যাংলো হিন্দু স্কুল, ডাফ স্কুল, ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতীয়দের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, দেশের শিল্পনৈতিক উন্নতি--সবকিছুতে তিনি একাই লড়াই করে চলেছেন। নিজের চেষ্টাতেই তিনি সাত-আটটা ভাষা শিখেছিলেন। এই সময় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, তারিণীচরণ মিত্র, রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায় প্রমুখদের সঙ্গে বাংলা গদ্যের সূচনাও করেছিলেন। এছাড়াও অসংখ্য গানও তিনি রচনা করেছিলেন। তাতে তাঁর কবিত্ব শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
যাই হোক ইংরেজদের মধ্যে ওয়ারেন হেস্টিংস, লর্ড ডালহৌসি, লর্ড কার্জন, ওয়েলিংটনের মত বড়লাটদের ভারতবর্ষের মানুষ কখনো ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু এদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন বেন্টিং। তাঁর সাহায্যেই ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর রামমোহন বহু নিন্দিত সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার আইন পাস করেন। এই কারণে ভারতের মানুষ রামমোহনকে চিরকাল একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবেও মনে রাখবে।
অবশেষে যখন দিল্লির বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর, তিনি রামমোহনকে এলচি বা দূত হিসেবে ইংল্যান্ডে পাঠাতে চাইলেন। দিল্লির বাদশা তাঁকে 'রাজা' উপাধি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকেরা তা মানতে চাইলেন না। শেষ পর্যন্ত ১৮৩০ সালের নভেম্বর মাসে 'আলবিয়ন'জাহাজে চড়ে ইউরোপের পথে যাত্রা করেন রামমোহন। জাহাজে যেতে যেতেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে তাঁর একটি পা ভেঙ্গে যায়। ১৮৩১-এর এপ্রিলে রামমোহন লিভারপুলে পৌঁছান। ইংল্যান্ডে যাবার পর তিনি বিশেষ সমাদর পান তাঁর নিজস্ব মেধা ও যুক্তির কারণে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষের যে নতুন শাসনতন্ত্র রচনার করেছিল তাতে সাক্ষী দেওয়ার জন্য রামমোহন আমন্ত্রিত ছিলেন। একসময় তিনি রিজেন্ট স্ট্রিটের বাসাবাড়ি ছেড়ে ডেভিড হেয়ারের ভাইয়ের বাড়িতে উঠে আসেন। সেই সময় তিনি ফ্রান্স দেশটিকে দেখবার ও জানবার জন্য ফ্রান্সে গিয়েছিলেন।ইউরোপের কাছে তিনিই প্রথম শান্তি ও মৈত্রীর বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের পূর্বে। ১৯৩২ সালে তিনি তাঁর স্বপ্নের দেশ ফ্রান্সে এসে পৌঁছান। পরে ইংল্যান্ডে ফিরে তাঁর কিছুটা অর্থাভাব দেখা দেয়। ব্রিস্টলে এসে তাঁর সে অর্থাভাব অনেকখানি কেটে যায়। ১৮৩৩-এ তিনি জ্বরে পড়েন এবং অবস্থা খারাপের দিকে এগোতে থাকে। সেইসময় তাঁকে ডেভিড হেয়ারের ভাইজি মিস হেয়ার এবং ডক্টর কার্পেন্টারের মেয়ে মেরিও সেবা শুশ্রূষা করেন। কিন্তু অবশেষে ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩-এ রামমোহনের ক্লান্ত চোখে ঘুম ঘনিয়ে আসে। সেখানেই স্টেপলটন গ্রোভের ছায়াবীথিতলে রামমোহনকে সমাধিস্থ করা হয়। পরে দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন বিলেত যান তাঁর সেই দেহ 'আরনসভেল' নামে একটি জায়গায় সরিয়ে এনে তাঁর উপর একটি চমৎকার মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে--যা এখন জাতীয় তীর্থ।

আজ ২২ মে এই মহামানবের জন্মদিন। 
(চিত্র - সংগৃহীত)  
-------

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯